ম্যাক্র্যোঁ! ইসলাম নয়, সংকটের মুখে আপনাদের পশ্চিমা বিশ্ব

আনসার আব্বাসী।।

সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক ভাষণে ‘ফ্রান্সে বসবাসরত মুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এটা শোনামাত্র কুরআনের একটি চিরন্তন নির্দেশনা সামনে চলে আসে। যার সারকথা হল, ‘ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি যে ঘৃণা-বিদ্বেষ তাদের বক্তব্য থেকে প্রকাশ পায়, এর চেয়ে ঢের বেশি বিদ্বেষ ও শত্রুতা তারা পুষে রাখে তাদের অন্তরে।’

ম্যাক্রোঁ বলেছেন , তিনি ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে ইসলামী উগ্রবাদ থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন। যার লক্ষ্য মুসলিমদের, বিশেষত মুসলিম নারিদের বাইরে যাওয়ার সময় ইসলামী পোশাক পরিধান থেকে বিরত থাকতে হবে। হিজাব পরিধান নিষিদ্ধ করা হবে এবং মুসলিম মেয়েদের স্কুলে ইসলামী পোশাক পরতে দেওয়া হবে না। সবার জানা থাকার কথা, ফ্রান্সে ইতোপূর্বে হিজাব নিষিদ্ধ ছিল। এখন সেখানে বসবাসরত মুসলিম নারী এবং মেয়েদের জন্য মাথা ঢেকে রাখাও অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। আর এসব কিছুই করা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাঁচাতে। ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি আরও ঘোষণা করেছেন যে, মসজিদগুলো এবং তাদের তহবিল নজরদারির আওতায় আনা হবে।

ফ্রান্সের মুসলিমগণ তাদের বিশ্বাস অনুসারে জীবনযাপন করার বিষয়টি নিয়ে ম্যাক্রোঁ দুর্ভাবনা প্রকাশ করে বলেছেন, এটি ফ্রান্সের অভ্যন্তরে এমন একটি সংস্কৃতি জন্ম দিয়েছে যা একজন নাগরিককে ধর্মীয় বিশ্বাস লালন করার ক্ষেত্রে স্বাধীন মনোভাবাপন্ন করে তুলবে। অন্য কথায়, ম্যাক্রোঁ এবং তার ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য এটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে মুসলমানরা কোনও আইন লঙ্ঘন না করে কেন ইসলামী বিশ্বাস ধারণ করবে এবং তাদের ইসলামী পরিচয় জনসম্মুখে প্রকাশ করবে। ম্যাক্রোঁ আরও বলেছেন যে, ইসলাম বিশ্বজুড়ে এক সঙ্কটের মুখোমুখি।

ম্যাক্রোঁর ঘৃণাবাদী মনোভাব তো এখন বিশ্ববাসীর সামনে । তার ইসলামবিরোধী কূটচাল ও পদক্ষেপগুলোও কারও অজানা নয়। তবে আমরা জানি, ইসলামের বিরুদ্ধে যত কৌশলই করা হোক; আমাদের রবেরও রয়েছে কৌশল এবং অবশ্যই সর্বশক্তিমান আল্লাহর কৌশলের সামনে সমস্ত কৌশল ব্যর্থ।

ম্যাক্রোঁ এবং তার মত মনোভাবাপন্ন লোকেরা যা খুশি করে নিক। ইনশাল্লাহ, ইসলাম বিস্তার লাভ করবে। ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের প্রতিটি কোণে । এই বিস্তার ঠেকাবার জন্য আইনের নামে যতই বেআইনী পদক্ষেপ নেয়া হোক , কঠোরতা আরোপ করা হোক মুসলমানদের অন্তর থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ মুছে দেয়া যাবে না। বরং তা উত্তরোত্তর শক্তিশালী হতে থাকবে। চোখ রাখুন, ২০১৬ সালে পিউ(PEW)র একটি সমীক্ষায়। তাদের জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপে দ্রুত ইসলামের বিস্তার ঘটছে। ফ্রান্সের উদাহরণ টেনে সংস্থাটি বলছে যে, ফ্রান্সে প্রায় ছয় লক্ষ মুসলমান রয়েছে যা ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার আট শতাংশ। কিন্তু ২০৫০ সাল নাগাদ শুধু ফ্রান্সেই মুসলমানদের জনসংখ্যার অনুপাত আট শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছে যাবে এবং তারা আজকের চেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে।

এই প্রতিবেদনে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র উঠে এসেছে । তবে ম্যাক্রোঁ, যিনি বলেছেন, ইসলাম একটি সংকটের মুখোমুখি, তিনি জরিপের দিকে নজর দিলে বুঝতে পারবেন যে, পশ্চিমারাই মূলত একটি সঙ্কটের মুখোমুখি হতে চলেছে। যারা ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ও বৈরিতা প্রদর্শনে এতো দূর পর্যন্ত এগিয়েছে যে, এখন মুসলিমদের ব্যক্তিগত জীবনেও ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করতে দুঃসাহস করছে।

পিউ জরিপের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের জনসংখ্যা দুটি কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।একটি হল মুসলমানরা প্রচুর সংখ্যক এই দেশগুলিতে অভিবাসিত হচ্ছে। অপরটি হল, মুসলমানদের জন্মের হার তুলনামূলক বেশি। এমনকি মুসলিম অভিবাসন বন্ধ হয়ে গেলেও, মুসলিমদের উচ্চ জন্মহারের কারণে পশ্চিমে স্থানীয় জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাসের মুখোমুখি হচ্ছে এবং তাদের জনসংখ্যা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।কারণ শ্বেতাঙ্গদের সন্তান জন্মগ্রহণের হার কম । আর এর বিপরীতে মুসলিম জনসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মঁসিয়ে ম্যাক্র্যোঁ! এখন সংকটের মুখোমুখি তো আপনি এবং পশ্চিমা শক্তি। যেখানে পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিবাহের প্রচলন উঠে যাচ্ছে। বিবাহ বিচ্ছেদ অতিসাধারণ হয়ে উঠেছে। আপনার ও পশ্চিমাদের জন্য এখন আসল চ্যালেঞ্জ হল ঐ অশ্লীলতা এবং বিকারগ্রস্ত মূল্যবোধ মোকাবেলা করা, যাকে আপনারা স্বাধীনতা বলে অভিহিত করে থাকেন। যার ফলস্বরূপ সমকামিতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি সৃষ্টিগত লিঙ্গ বিভাজন উপেক্ষা করে অভিন্ন লিঙ্গে বিবাহের বিকৃত মানসিকতা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিমা দেশগুলোতে।

শুনুন মঁসিয়ে! আপনার সাথে আমাদের যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। আমরা আমাদের সৈন্যসামন্ত নিয়েও এখন আপনাদের মোকাবেলায় যেতে চাই না। নিজেদের কৌশল ও সিদ্ধান্তগুলোই আপনার বিরুদ্ধে রয়েছে। মুসলমানদের শান্তিতে বসবাস করাও আপনাদের জন্য কষ্টকর ঠেকছে। আপন কৃতকর্মের কারণে খোদ আপনি ও পশ্চিমা সমাজ আজ পতনের দ্বারপ্রান্তে, পরাজয়ের মুখোমুখি। কিন্তু হতাশা লুকাতে এখন আপনি মুসলমানদেরও ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন।

এই সঙ্কটের মুখোমুখি তো আজ আপনি এবং আপনার মতো ঐ পশ্চিমা অহমিকাগুলো, যারা 9/11 এর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে আফগানিস্তানে তালেবানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দম্ভভরে ঘোষণা দিয়েছিল তালেবানকে দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করবার।

আজ উনিশ বছর পর, যে তালেবানকে আমেরিকা সন্ত্রাসী বলেছিল, জাতিগতভাবে নির্মূল করার জন্য দুনিয়ার অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, আজ সে তালেবানের সামনে আমেরিকা পরাজয়-চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। তালেবানের সাথে কৃত এই ঐতিহাসিক চুক্তিনামায় এমন শর্তেও আমেরিকা স্বাক্ষর করেছে যে, এই শান্তি চুক্তির ফলশ্রুতিতে আফগানিস্তানে গঠিত “ইসলামী হুকুমত ” এর সাথে আমেরিকা সর্বদা সুসম্পর্ক রক্ষা করবে!

বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলাম বিশ্বজুড়ে বিজয়ীশক্তি হিসেবেই টিকে থাকবে (ইনশাআল্লাহ) । ম্যাক্রোঁ এবং এমন মনোভাবাপন্ন পশ্চিমা অহমিকাগুলো তাদের কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা সহ ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে। পরিশেষে দেশীয় উদারপন্থীদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে যে, উদারপন্থী ফরাসি প্রেসিডেন্টের এমন কট্টরপন্থী বিবৃতির পর তাদের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনও বিক্ষোভ, কোন প্রতিবাদ, অন্তত কোনও টুইটও দেখা গেল না কেন! অন্যদিকে তারাই এই কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে ইসলামী মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে থাকতে চায়। অথচ এটাই সেই ধর্মনিরপেক্ষতা যার ছদ্মাবরণে ফ্রান্স এবং ভারতে অহর্নিশি উগ্রবাদ ও পশ্চিমা বর্বরতার নগ্ন প্রদর্শনী চলছে। মার্কিন মুলুকের পতি ট্রাম্পও বারবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন উগ্র মনোভাব প্রকাশ করে আসছেন। কিন্তু এখন নেটিভ উদারপন্থীদের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নেই তাদের উদারতারও কোন হদিস!

ডেইলি জং থেকে ভাষান্তর: আহমদ বিন যহীর

আরো পড়ুন: ম্যাক্রঁ বললেন, ’চরমপন্থা’ কারণে বিশ্ব জুড়ে ইসলাম সংকটে!

ইসলাম নিয়ে ম্যাক্রঁর বিতর্কিত মন্তব্য, সমালোচনার ঝড়

পূর্ববর্তি সংবাদবেগমগঞ্জের ঘটনায় অপরাধীদের শিগগিরই আইনের মুখোমুখি করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদআজারবাইজানকে সমর্থন করায় তুরস্ককে ড্রোন বিক্রি বন্ধ ঘোষণা কানাডার