মুফতি রফি উসমানি ।।
আমি আমার আব্বাজান (মুফতি শফি রহ.) ঘটনা শোনাচ্ছি। আমার দাদার ইন্তেকালের পরে আমার দাদী আরও ৩০ বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আমার দাদা মাওলানা মোহাম্মদ ইয়াসিন। দেওবন্দে বাবে ইয়াসিনে ওনার কবর আছে। দাদিজান হিজরত করে আব্বার সাথে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন।
আমার আব্বা আমার দাদিজানের অনেক খেদমত করতেন। তার জন্য ভিন্ন এক কামরা ছিল যাতে কেউ তাকে বিরক্ত করতে না পারে। রাতে অনেক সময় জেগে দেখতাম দাদির কামরায় বাতি জ্বলছে। গিয়ে দেখতাম, আব্বাজান তার আম্মার পা টিপে দিচ্ছেন। তখন রাত দুটা। আমার আব্বাজান নিজেও বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাতে উঠে তিনি পা টিপে দিতেন। মাথায় তেল দিয়ে দিতেন।
দাদিজান রশিদ আহমদ গাংগুহী এর মুরিদ ছিলেন। অনেক বেশি শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু তার জবানে সবসময় আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ জিকির জারি থাকত। যদি ঘুমিয়েও থাকতেন তাঁর জিহ্বায় নড়তে থাকতো। তখনও আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ জিকির করতেন।
আমার দাদিজান যখন মৃত্যু রোগে আক্রান্ত তখন আমার আব্বা চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি কোনকিছুতেই কম করেননি। কিন্তু নিজের বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে সারক্ষণ দাদিজানের কাছে থাকতে পারতেন না। কিছুক্ষণ পরপর তার কাছে যেতেন। সালাম করতেন। বাহির থেকে আসলে সর্বপ্রথম মায়ের খবর নিতেন। চিকিৎসার খবর নিতেন। আব্বাজান চাইতেন, দাদিজান যেন একা না থাকেন। সেজন্য আমার ছোটবোনকে লাহোর থেকে নিয়ে এসেছিলেন দাদিজানের সাথে থাকার জন্যে। দাদিজানের কাছে বড় হয়েছেন এবং দাদিজানের সাথে খাস সম্পর্ক ছিল এমন আরো একজন আত্মীয়কে আব্বাজান নিয়ে এসেছেন সারাক্ষণ তার পাশে থাকার জন্যে।
ইন্তেকালের আগে আব্বাজান একদিন বললেন, -আমরা ভাই-বোনেরা সবাই উপস্থিত ছিলাম- আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি। আমার মনে কোনো আফসোস নেই। আল্লাহ আমাকে নেক সন্তান দান করেছেন। তাফসীর মাআরেফুল কুরআনের কাজ সমাপ্ত করার তৌফিক দিয়েছেন। দারুল উলুম বানানোর তৌফিক দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। সব কাজ সুন্দর ভাবে হয়েছে। কিন্তু একটি আফসোস আমার সাথে সারাক্ষণ লেগেই আছে। এই আফসোস আমার সাথে কবরে যাবে। এরপর আব্বাজান কাঁদতে শুরু করলেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন, ইন্তিকালের আগে যখন আমার আম্মা অসুস্থ ছিলেন আমি তার আরামের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। কিন্তু আমার আম্মার ইচ্ছা ছিল, শেষ সময়টায় আমি যেন সারক্ষাণ তার চৌকির উপরে বসে থাকি। হায় আফসোস! ইন্তিকালে আগে আমি যদি আম্মার এই ইচ্ছাটাও পূরণ করে দিতাম। কিছুদিনের জন্য আমার সকল ব্যস্ততায় আমি আগুন লাগিয়ে দিতাম। তখন আমার মাথায় চেপেছিল আমার দায়িত্বে দ্বীনী অনেক দায়িত্ব রয়েছে। পাকিস্তানে ইসলামী আইন প্রণয়নের চেষ্টা চেষ্টা চলছে। দারুল উলুম নির্মাণের কাজ চলছে। আমি তখন ভাবতাম, এগুলো তো অনেক বড় বড় দ্বীনী কাজ। আমি তো আম্মার জন্য সব কিছু ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমার এইসব কাজ চলতে থাকুক। আবার আম্মার সেবা-যত্নও চলতে থাকুক। কিন্তু আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল, শফি ২৪ঘন্টা এই চৌকির সাথে লেগে থাকুক। হায়! আমি তার মনের এ আশাটা পূরণ করে দিতাম এবং সকল ব্যস্ততায় কিছুদিনের জন্য আগুন লাগিয়ে দিতাম।
এই হল মা-বাবার সাথে বুজুর্গদের অবস্থা। বাবা মার সাথে যত সুন্দর আচরণ করবে তাতে নিজেরই উপকার। আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন।
অনুবাদ: এনাম হাসান জুনাইদ
















