পরাশক্তি হওয়ার পথে তুরস্ক

ড. ফুরকান হামীদ ।।

উন্নয়নের রাজপথে তুরস্কের এখন যে বিস্ময়কর জয়যাত্রা তার কৃতিত্ব অবশ্যই প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের। তিনি তার প্রথম যুগে কোনও রাজনৈতিক ইস্যুতে মাথা না ঘামিয়ে দেশের উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) ঋণে পঙ্গু হয়ে পড়া দেশীয় অর্থনীতিকে এই ভয়াল ঋণচক্রের ফাঁদ থেকে পুনরুদ্ধার করে তুরস্ককে পরিণত করেছিলেন বিশ্বের ১৬তম বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রে। শুরুর দিকে এরদোগান প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে “জিরো প্রবলেম” নীতি গ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি সদিচ্ছা নিয়েই কুর্দি-সংকট সমাধানে প্রয়াসী হয়েছেন এবং একাধিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন।

কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে তুর্কি জাতীয়তাবাদীরা তাঁর জন্য সমস্যা তৈরি করতে শুরু করে। ফলে যে বিষয়টিকে তিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু এর কারণে দলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় তা থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয়তর মনে করে সরে আসেন।

পরবর্তীতে তুর্কি জাতীয়তাবাদী দল (এমএইচপি) এর সাথে তাঁর দলসহ জোটবদ্ধ হতে বাধ্য হন। নিজ দলের নীতিও পর্যালোচনা করেন। বিশেষত, ১৫ জুলাই ২০১৬তে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট এরদোগান সেনাবাহিনীর পুরো নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নেন। এবং তাঁর জন্য হুমকির কারণ হতে পারে এমন সব অপশক্তি থেকে সেনাবাহিনীকে পরিচ্ছন্ন করেন। এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরই তিনি তুরস্ককে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে ভিন্নতর পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন।

আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে তুরস্ক ব্যাপকভাবে দূতাবাস খুলতে থাকে। এবং ঐসব দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে, ইতোপূর্বে যে দেশগুলো তুর্কী পররাষ্ট্রনীতির বাহিরে ছিল। ২০১০ সালে ফিলিস্তিনে তুরস্কের মানবিক সহায়তায় ইসরাইল বাধা দেওয়ার কারণে আমেরিকাকে তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েলি রাষ্ট্রপ্রধানকে এরদোগান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তীব্র নিন্দা জানান। এর সাথে সাথে মার্কিন দূতাবাস পূর্ব জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করারও তীব্র সমালোচনা করে জাতিসংঘের প্রস্তাবসমূহের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসাবে উল্লেখ করেন।

তিনি এমন সময় কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন যখন সমস্ত পশ্চিমা দেশ এবং বিশেষত পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বিবেচিত ইসলামী দেশগুলোও কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করতে নারাজ ছিল। এরদোগান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাকিস্তানের অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন এবং ভারতকে নিপীড়ক ও আগ্রাসী দেশ হিসেবে আখ্যা দেন।

সিরিয়ায় তুরস্কের গৃহীত নীতির কারণে আমেরিকার মতো দেশও কুর্দিদের সমর্থন ও সহায়তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল। উপরন্তু তুরস্ক এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে সক্ষম হয়। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সার্বভৌমত্বের ঘোষণা আরো চমকপ্রদ। তিনি বলেছেন, ‘তুরস্ক বিশ্ব মঞ্চে তার অধিকার রক্ষায় যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি সিরিয়া, লিবিয়া এবং ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে ককেশাস পর্যন্ত সকল বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ও নিপীড়িত ভাইদের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখবে।’

সাইপ্রাসের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য তুরস্ক ড্রিলিং জাহাজ পাঠালে, গ্রীস-তুরস্ক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ইতোপূর্বে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্যাসের উপস্থিতির সম্ভাবনা নিয়ে ইসরায়েল, গ্রীস, সাইপ্রাস, ইতালি এবং মিশর একটি যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। যেখানে তুরস্ককে স্পষ্টতই এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই দেশগুলো যখন তুরস্ককে এক প্রকার পাশ কাটিয়ে যায় তখন তুরস্ক পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। লিবিয়ার বৈধ সরকারের সাথে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সাইপ্রাসের সমুদ্রসীমায় গ্রীসের সামনে সংকট তৈরি করে। যদিও ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তুরস্ক লিবিয়ায় আপন অবস্থানকে মজবুত করে ম্যাক্রোঁকে পিছু হটতে বাধ্য করে।

অপরদিকে এরদোগান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর ইসলাম বিরোধী মনোভাবের কারণে তীব্র সমালোচনা করেন এবং প্রদর্শিত অবমাননাকর কার্টুনগুলিকে অসুস্থ ও কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক বলে অভিহিত করেন। ম্যাক্রোঁকেও এরদোগান মানসিকভাবে অসুস্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলশ্রুতিতে এরদোগানের বক্তব্যের পর তুরস্কে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে ফ্রান্স।

এই মুহুর্তে আরমেনিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আজারবাইজানের অব্যাহত সাফল্যকেও তুরস্ক খুব ইতিবাচকভাবে দেখছে। কেননা আজারবাইজানের সাফল্যের পেছনে তুরস্কের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। অপরদিকে রাশিয়াও এই যুদ্ধে এরদোগানের সুস্পষ্ট অনড় অবস্থানের কারণে আর্মেনিয়াকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা থেকে বিরত থেকেছে। রাশিয়ার এই পদক্ষেপ আজারবাইজানের জন্য যুদ্ধজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রাশিয়া এবং তুরস্ক এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে দু’দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে এখনও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বর্তমান।

তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার রাষ্ট্র হল রাশিয়া। তুরস্কের জ্বালানি চাহিদা পূরণকারী গুরুত্বপূর্ণ দেশও রাশিয়া। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও, আমেরিকার হুঁশিয়ারিকে তোয়াক্কা না করে যেভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে এন্টি-ক্ষেপণাস্ত্র এস ৪০০ ব্যবস্থা কিনে নিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পেন্টাগনের লাগাতার হুমকি-হুঁশিয়ারির পরও ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষাও শুরু করেছে তাতে এ সত্য দিনদিন পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, তুরস্ক এই অঞ্চলে একটি নতুন পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার পথে। এই রাষ্ট্রটি এখন অবিচ্ছিন্নভাবে এখানে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে। সম্ভবত এমন কোনও দেশ বা শক্তি নেই যা এখন তুরস্ককে আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার পথে বাধা দিতে পারে।

অনুবাদ: আহমদ ইবনে যহীর