বাইডেন এগিয়ে, জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ট্রাম্পের আদালতে মামলা

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: আর মাত্র ৬ ভোট দূরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। আলাস্কা বাদে ফল বাকি থাকা চার অঙ্গরাজ্যের যেকোনো একটিতে জয় পেলেই তার জন্য খুলে যাবে হোয়াইট হাউজের দরজা। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বাজিমাত করার দৌড়ে বাইডেন অনেকটাই এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্পও শ্বাস ফেলছেন তার ঘাড়ে।

ট্রাম্প শিবির এর মধ্যে বাইডেনের ঝুলিতে যাওয়া ব্যাটেলগ্রাউন্ড খ্যাত উইসকনসিন, মিশিগানসহ চার রাজ্যে ভোট গণনা বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়ে মামলা করেছে। তবে বাইডেন একটিতে জয় পেলেই চূড়ান্ত ফলাফলে বিলম্ব হওয়া ছাড়া মামলাগুলো কার্যত কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।

ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন বুধবার মিশিগান এবং উইসকনসিনে জয়ের মাধ্যমে ইলেক্টরাল ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় হোয়াইট হাউস দখলে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছেন, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ভোট গণনা বন্ধের জন্য আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।

বুধবার  ট্রাম্প তার ভাষণে এই নির্বাচনকে মার্কিন জনগণের ওপর এক জালিয়াতি বলে বর্ণনা করেন। এবং সব ভোট বন্ধ করার ডাক দেন, যদিও পরিকল্পিত জালিয়াতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।  ট্রাম্প টুইটও করেছেন: `গণনা বন্ধ করুন।’

ভোট গণনা বন্ধ করার আশায় ট্রাম্প প্রচারণা দল বেশ কয়েকটি রাজ্যে মামলা দায়ের করেছে। তবে কথিত জালিয়াতি বা কারচুপির ওপর কোনো প্রমাণ তারা দাখিল করেনি।

বার্তা সংস্থা এপির সর্বশেষ হিসাবে ওয়াশিংটন ডিসিসহ ৪৬ অঙ্গরাজ্যের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে বাইডেন পেয়েছেন ৭ কোটি ২৪ লাখ ৮২ হাজারের বেশি ভোট। আর ট্রাম্প পেয়েছেন ৬ কোটি ৮৯ লাখ ২১ হাজারের বেশি। আর ইলেকটোরাল কলেজেও বাইডেন ২৬৪ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন ২১৪ ভোট পাওয়া ট্রাম্প থেকে। তবে এখনো ফল না আসা দোদুল্যমান চার রাজ্যই নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। তবে এ জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে কমপক্ষে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত।

জনপ্রিয় ভোটে বাইডেন অনেক এগিয়ে থাকলেও প্রেসিডেন্ট হতে হলে ৫৩৮ ইলেকটোরাল ভোটের মধ্যে তার দরকার হবে কমপক্ষে ২৭০ ভোট। এখনো পরিসংখ্যান যা বলছে তাতে সুযোগ রয়েছে ট্রাম্পেরও। কারণ ফল বাকি থাকা চার অঙ্গরাজ্যের সবগুলোতে জয় পেলে হোয়াইট হাউজ ছাড়তে হবে না তাকে।

এপির হিসাবে জো বাইডেন ইতিমধ্যে জয় পেয়েছেন ওয়াশিংটন, অরিগন, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো, ইলিনয়, ভার্জিনিয়া, নিউ জার্সি, ম্যারিল্যান্ড, নিউ ইয়র্ক, ভার্মন্ট, ম্যাসাচুসেটস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, কানেকটিকাট, রোড আইল্যান্ড, ডেলাওয়্যার, ডিস্টিক অব কলম্বিয়া, মেইনি, মিশিগান, উইসকনসিন এবং অ্যারিজনায়।

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতেছেন আইডাহো, ওয়েমিং, ইউটাহ, নর্থ ডাকোটা, সাউথ ডাকোটা, নেব্রাস্কা, ক্যানসাস, ওকলাহোমা, আরকানসাস, লুইজিয়ানা, মিসিসিপি, টেনেসি, কেন্টাকি, ইন্ডিয়ানা, আলাবামা, সাউথ ক্যারোলাইনা, মিসৌরি, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, মন্টানা, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ওহাইও, আইওয়া এবং লোয়াতে।

চূড়ান্ত ফলের জন্য পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও নেভাডার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। এপির হিসাব বলছে, চার স্যুইং স্টেটের তিনটিতেই এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। একটিতে এগিয়ে বাইডেন। ট্রাম্প যদি আলাস্কাসহ জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও পেনসিলভানিয়ায় জয় পান তাও পিছিয়ে থাকবেন তিনি। হোয়াইট হাউজে থাকতে ট্রাম্পকে জিততে হবে ফলের অপেক্ষায় থাকা বাকি সব রাজ্যই। তবে বাইডেন কেবল নেভাডায় জিতলেই হোয়াইট হাউজের দরজা খুলে যাবে তার জন্য।

তবে পরিসংখ্যান বলছে সব রাজ্যে জয় পাওয়া খুব সহজ হবে না ট্রাম্পের জন্য। উল্লিখিত রাজ্যগুলোতে এখনো যেসব ভোট গণনার বাকি তার বেশিরভাগই পোস্টাল বা ডাকযোগের ভোট। আর এবার এই ভোটগুলোর বেশির ভাগই যাচ্ছে বাইডেনের ঝুলিতে।

হিসাব করে দেখা যাচ্ছে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে রয়েছে ১৬টি ইলেকটোরাল ভোট। সেখানে ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা হয়েছে। বাকি আছে ১ শতাংশ (৫০ হাজার) ভোট। তাতে দেখা যাচ্ছে ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট নিয়ে এগিয়ে ট্রাম্প, আর বাইডেন পেয়েছেন ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ। তাদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ১২ হাজার ৮২৫। ভোট গণনার প্রথম দিন সেখানে এই ব্যবধান ছিল প্রায় লাখের বেশি।

নেভাডার ইলেকটোরাল ভোট ৬টি। সেখানে ৭৬ শতাংশ ভোট গণনায় দেখা যাচ্ছে ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়ে এগিয়ে বাইডেন। ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ে খুব কাছাকাছি রয়েছেন ট্রাম্প। রাজ্যটিতে এখনো ৩ লাখ ৮৬ হাজার ভোট গণনার বাকি। দুই প্রার্থীর ব্যবধান মাত্র ১১ হাজার ৪৩৮ ভোট।

নর্থ ক্যারোলাইনায় ইলেকটোরাল ভোট ১৫টি। সেখানে ভোট গণনা হয়েছে ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৫০ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে এগিয়ে ট্রাম্প; বাইডেন পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। রাজ্যটিতে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৭৬ হাজার ৭০১। এখনও গণনার বাকি ৩ লাখ ৪৮ হাজার ভোট।

গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য পেনসিলভানিয়ায় ইলেকটোরাল ভোট ২০টি। সেখানে ৮৮ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট নিয়ে এগিয়ে ট্রাম্প, বাইডেন পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। সেখানে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৮ হাজার ৬৯৭। ভোট গণনার বাকি আছে ৮ লাখ ৭৭ হাজার। রাজ্যটিতে বুধবারও দুই প্রার্থীর ব্যবধান ছিল প্রায় ৬ লাখ ভোটের। এখানে অবশ্য ভোটের পরে তিন দিন পর্যন্ত পোস্টাল ভোট গ্রহণ করা হয়। সে হিসাবে সেখানে গণনার বাকি থাকা ভোটের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আর তার বেশির ভাগই যেতে পারে বাইডেনের ঝুলিতে। তাই বাইডেন শিবির আশা করছে এই রাজ্যও পেতে যাচ্ছে তারা।

ট্রাম্প শিবির এরই মধ্যে বাইডেনের ঝুলিতে যাওয়া ব্যাটেলগ্রাউন্ড খ্যাত উইসকনসিন, মিশিগানসহ পেনসিলভানিয়া ও জর্জিয়ায় ভোট গণনা বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়ে মামলা করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শেষতক এ নির্বাচনের ফলাফলের বিষয়টি কি আদালতেই গড়াবে? সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প শিবিরের সেই অভিযোগের মীমাংসা করতে পারবে?

দেশটির আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যত তা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তারা বলছেন, ব্যালট, ভোট বা গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু তাতে চূড়ান্ত ফলাফলের কোনো হেরফের হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির নির্বাচন বিশেষজ্ঞ নেড ফলি বলেছেন, এ ব্যাপারে শীর্ষ আদালত তখনই হস্তক্ষেপ করবে যখন ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু এক্ষেত্রে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। উল্টো টুইটারে ভোট কারচুপি নিয়ে ট্রাম্পপুত্র এরিকের ছড়ানো একটি ভিডিও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বিপার্টিশান পলিসি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ম্যাথু উইল বলেন, আইন অনুসারে যদি নির্বাচনে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হয় এবং কোনো প্রার্থীর জয় বিবেচনা করার মতো না হয়, তবে ডাকযোগে আসা ভোট গণনা চালিয়ে যেতে হবে।

খোদ ট্রাম্প শিবিরের নির্বাচনী আইনজীবী বেঞ্জামিন গিনসবার্গ বলছেন, বৈধ ভোটকে অবৈধ ভোট ঘোষণা করার বিষয়টিকে শীর্ষ আদালত শুধু বিপুল ‘বঞ্চনা’ হিসাবেই দেখবে। ২০০০ সালে রিপাবলিকান প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশের পক্ষে পুনর্গণনার রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ওই সময়েও রিপাবলিকান শিবিরে ছিলেন আইনজীবী বেঞ্জামিন।

দুই আইনজ্ঞের বক্তব্য অনুসারে আদালত মামলা আমলে নিলেও ফলাফল বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদি শীর্ষ আদালত মামলা গ্রহণ করে এবং রিপাবলিকানদের পক্ষেই রায় দেয় তাহলেও তা কোনো রাজ্যেরই ফলাফলের নির্ধারক হয়ে উঠবে না। ট্রাম্পের এগিয়ে রাজ্যগুলোর ফল বাদেই নেভাডায় জিতে বাইডেন ২৭০-এর ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করে ফেললে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে যাবে।

ভোট বন্ধে ট্রাম্প শিবিরের মামলার সমালোচনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মিশন দ্য অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই) বলেছে, আইনি লড়াইয়ের অনিশ্চয়তা এবং জনগণের আস্থা ক্ষুণœ করার নজিরবিহীন চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কলঙ্কিত হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ, বিশেষ করে নির্বাচনের রাতে বর্তমান প্রেসিডেন্টের তোলা কারচুপির অভিযোগ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে জনগণের আস্থার জন্য ক্ষতিকর।

এদিকে ট্রাম্প শিবিবের ভোট গণনা বন্ধের দাবির প্রতিবাদে ডেমোক্র্যাটরাও শুরু করেছেন প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। তা নিয়ে কিছুটা সহিংসতা ছড়িয়েছে। কয়েক রাজ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে অনেকে।  ট্রাম্প নিজে ভোট গণনা বন্ধের আহ্বান জানানোর পর বাইডেনও কথা বলেছেন এই বিষয়ে। তিনি প্রতিটি রাজ্যের প্রতিটি ভোট গণনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার সেই বত্তব্য ‘কাউন্ট এভরি ভোট’ হয়ে উঠেছে বিক্ষোভকারীদের স্লোগান। দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর বলছে, বড় বিক্ষোভটা হয়েছে ওরেগন অঙ্গরাজ্যে। সেখানে বেশ কয়েক জনকে আটক করেছে পুলিশ। নিউ ইয়র্কেও আটক হয়েছে অর্ধশত ।

তবে বাইডেন নিজের জয়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করে সমর্থকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি বিজয়ের ঘোষণা দিতে আসিনি। আমি বলতে এসেছি, আমরা বিশ্বাস করি, গণনা যখন শেষ হবে, তখন আমরাই নিজেদের বিজয়ী হিসেবে দেখতে পাব। আর সে বিষয় হবে সকলের, আমেরিকানদের, যুক্তরাষ্ট্রের।

পূর্ববর্তি সংবাদদেশের শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরোধী ষড়যন্ত্রে সতর্ক থাকার আহবান মাওলানা কাসেমীর
পরবর্তি সংবাদরাজাধানীতে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ ৭০ মামলার আসামি আ.লীগ নেতা গ্রেফতার