ইসলামী আদব : মুসলিম নারীর প্রধান ভূষণ

উম্মে হাবীবা তামান্না ।।

সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ-ধনী-গরীব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকলের জন্যই ইসলাম এমন কিছু আদব উপহার দিয়েছে, যেগুলো দ্বারা একজন মুসলিম সুন্দর থেকে সুন্দরতর হয়, স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী হয়, মানুষের প্রিয়ভাজন হয়। একজন মুসলিম নারী হিসেবে আমিও চাই আমার ভিতর-বাহির সুন্দর হোক। সবার প্রিয়ভাজন হই। আমার রবের সন্তুষ্টি অর্জন করি। তাই আমাকেও পালন করতে হবে ইসলামের নির্দেশিত বিভিন্ন অবস্থা ও সময়ের উপযুক্ত আদব। তবেই আমি সুন্দর হব, আমার জীবন সুন্দর হবে। আমার ভিতর-বাহির সুন্দর হবে।

এক. ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ফযীলতপূর্ণ আদব হল সালাম দেওয়া। পরিচিত-অপরিচিত, ছোট-বড় সবাইকে আমি সালাম দিব। কেউ হয়ত আমার ছোট, কিংবা আমার খাদেমা, কিংবা আমার অধীনে আছে, তাকেও সালাম দিব। এক্ষেত্রে নিজেকে সালাম পাওয়ার হকদার আর সালাম দেওয়ার দায়িত্ব তাদের- এমন ভাবব না। কারণ আমাদের প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধনী-গরীব, ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দিতেন।

দুই. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কিংবা প্রবেশ করার সময় দরজাটা আস্তে বন্ধ করব। জোরে আওয়াজ করে বন্ধ করব না বা জোরে ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিব না, যাতে বিকট শব্দ করে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তা ঘরের লোকদের, বিশেষ করে শিশু বা বৃদ্ধদের কষ্টের কারণ হবে। তাছাড়া এটা ইসলামী আদবের পরিপন্থী। সেইসাথে অন্যের বিরক্তিরও কারণ।

তিন. কারো বাসায় গেলে তার দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ব। জোরে জোরে কড়া নেড়ে তাকে ভয় পাইয়ে বা চমকে দিব না। কলিংবেল থাকলে তা বারবার  টিপে তাকে বিরক্ত করব না। বরং তাকে ধীরে-সুস্থে এসে দরজা খুলে দেওয়ার সময় দিব। তিন বার আওয়াজ দেওয়ার পরও যদি না খুলে তাহলে আর আওয়াজ দিব না, বরং ফিরে যাব; যেমনটি নবীজী শিখিয়েছেন। মনে করব, তার কোনো ওযর আছে।

চার. তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে অহেতুক উঁকিঝুকি মারব না। এটা খুব দূষণীয় এবং মন্দ কাজ। তাই দরজার মুখোমুখি দাঁড়াব না। ডানে বা বামে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ব বা বেল বাজাব। যাতে দরজা খুললে অনিচ্ছাসত্তে¡ও ভিতরে দৃষ্টি না পড়ে। আমাদের প্রিয় নবীজীর আদব এটাই ছিল এবং এটাই তিনি সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন।

পাঁচ. দরজার সামনে জুতাগুলো এলোমেলোভাবে ফেলে রাখব না; বরং পরপুরুষের চোখে পড়ে না, এমন কোনো স্থানে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখব।

ছয়. কারো ঘরে প্রবেশের সময় খুব নম্র-ভদ্র হয়ে আওয়াজ দিব এবং নযর নীচু করে প্রবেশ করব। সে যেখানে বসতে দেয় সেখানেই বসব। যা খেতে দেয় তাই খাব। তার কোনো গ্রহণযোগ্য আদেশ-অনুরোধ উপেক্ষা করব না। তার সামনে তো নয়ই বিশেষ করে তার অনুপস্থিতিতে অহেতুক এদিক-সেদিক অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাব না। তার কোনো বন্ধ বাক্স বা থলে অথবা ঢেকে রাখা কোনো কিছুতে হাত দিব না এবং খুলব না। বা এগুলোতে কী আছে জানতে পীড়াপীড়ি করব না। ঘরওয়ালার কোনো গোপন বিষয় জানতে চেষ্টা করব না। কারণ এটা ইসলামী আদবের খেলাফ এবং একপ্রকার আমানতের খেয়ানত।

সাত. অসময়ে কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে যাব না। যেমন তার খাওয়ার  সময়, ঘুমের সময় কিংবা একান্ত ব্যক্তিগত সময়ে। এতে হয়ত সে ভদ্রতার কারণে আমাকে কিছু বলবে না বা আমার ইকরাম করবে। কিন্তু আমি তার  অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির কারণ হব।

আট. জরুরি কোনো কারণে বাধ্য হয়েই যদি অসময়ে তার কাছে যেতে হয় বারবার বিনীতভাবে ওযর পেশ করব। খুব বিনয়ের সাথে তার নিকট জরুরত ব্যক্ত করব এবং আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করব- তাকে অসময়ে বিরক্ত করার জন্য।

নয়. সে যদি আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে না চায় এবং কোনো ওযর পেশ করে, তাহলে উদারমনে তার ওযর কবুল করে ফিরে যাব। সত্যিই তার হয়ত কোনো ওযর আছে, যা সে আমাকে বলতে পারছে না। মানুষ তো তার সব কথা সবাইকে বলতে পারে না।

দশ. ঘরে মেহমান আসলে তার কদর করব। বড়লোক হলে খুব অতিরঞ্জনের সাথে আর দরিদ্র হলে গুরুত্বহীনভাবে- এমন যেন না হয়। খালেস নিয়তে গুরুত্বের সাথে মেহমানদারি করব।

এগার. মেহমানের থাকার কামরা, ঘুমানোর স্থান, বিশ্রামের স্থান পরিচ্ছন্ন এবং গুছিয়ে রাখব। তার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যেমন, কিবলা কোন্ দিকে দেখিয়ে দিব, হাম্মাম, ওযূ করার স্থান দেখিয়ে দিব। যাতে তার অহেতুক পেরেশানি না হয়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তার হাতের কাছে রাখব। যাতে প্রয়োজনের সময় তার কষ্ট না হয়। হাম্মাম, গোসলখানা, ওযুখানা পরিষ্কার করে রাখব। হাম্মাম থেকে অসুন্দর, অপ্রয়োজনীয় এবং পর্দার যোগ্য বস্তুসমূহ সরিয়ে রাখব। যাতে তার নযর সেদিকে না পড়ে এবং আমিও পরে লজ্জায় পতিত না হই। তার হাত মোছা বা গোসলের জন্য নতুন বা পরিষ্কার তোয়ালে বা গামছা দিব। যা ঘরে ব্যবহার হয় বা বাচ্চারা ব্যবহার করে এমন অপরিষ্কার গামছা বা তোয়ালে দেওয়া উচিত নয়। ঘুমের কিংবা বিশ্রামের সময় তার আরামের প্রতি খেয়াল রাখব। সেসময় তার আশপাশ থেকে বাচ্চাদেরকে সরিয়ে রাখব। নিজেরাও এমন কোনো কাজ করব না, যার আওয়াজে তার কষ্ট হয়।  পুরুষ মেহমানের কামরা এবং তার দৃষ্টিসীমা থেকে মহিলাদের সকল কিছু সরিয়ে রাখব। গলার আওয়াজ তার কানে পৌঁছতে দিব না। আস্তে এবং সাবধানতার সাথে কাজ করব। প্লেট, বাটি, চামচের আওয়াজ, বিভিন্ন কাজকর্মের আওয়াজ যেন তার কানে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখব। মেহমানের প্রতিটা খেদমতে স্বতঃস্ফর্‚ততা এবং রুচিশীলতার পরিচয় দিব। মহিলা বা মাহরাম মেহমান এলে যথাসম্ভব নিজেকে পরিপাটি করে রাখব।

বার. আমি যদি কারো মেহমান হই, তখন আমাকেও কিছু আদব রক্ষা করতে হবে। যতক্ষণ কিংবা যতদিন মেজবানের কাছে থাকব, নম্রভদ্র, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকব। তার উপর অতিরিক্ত কোনো চাপ সৃষ্টি করব না। তার কাজের বা বিশ্রামের সময়ের প্রতি খেয়াল রাখব। এসব সময়ে তাকে বিরক্ত করবনা বা তার কাজে কিংবা আরামে কোনোরকম ব্যাঘাত ঘটাব না।

তের. পানাহারের জিনিসপত্র সর্বদা ঢেকে রাখব। কাউকে পরিবেশন করার সময়ও ঢেকে রাখব। যাতে ধুলাবালি কীটপতঙ্গ না পড়ে এবং ঘরে বাচ্চা থাকলে খাদ্য নষ্ট না করতে পারে।

চৌদ্দ. মাহরামদের সাথে পর্দা করা ফরয নয়; কিন্তু তাদের সামনে থাকতে হবে শালীনভাবে। তাদের সামনে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে বসব। অশালীন কোনো কাপড় পরব না। কথাবার্তাও শালীনতার সাথে বলব। সবসময় সতর্ক থাকব- আমার থেকে যেন অশালীন কোনো কিছু প্রকাশ না পায়।

এমন আরো অসংখ্য আদব রয়েছে, যেগুলো পালন করলে জীবন হয় পবিত্র, পরিচ্ছন্ন এবং আমি হব সুন্দর, খুলুকে হাসানার অধিকারী একজন মানুষ। আমাকে আল্লাহ ভালোবাসবেন। মানুষও ভালোবাসবে। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন- আমীন।

পূর্ববর্তি সংবাদজমি কিনলে রেজিস্ট্রির ৮ দিনেই অটো নামজারি
পরবর্তি সংবাদবাংলাদেশিদের জন্যও খোলা হচ্ছে ওমরাহর দরজা, তবে খরচ দ্বিগুণ