ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার দেশ মালয়েশিয়া। দেশটিতে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত আছেন, যাদের বড় অংশই শ্রমিক। তবে বিভিন্ন কারণে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করছেন। এবার শর্তসাপেক্ষে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার। গতকাল এক বিশেষ বৈঠক শেষে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হামজাহ বিন জায়নুদ্দিন।
বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণ প্রক্রিয়া ১৬ নভেম্বর শুরু হবে। বৈধকরণের এ প্রক্রিয়া চলবে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। বৈধকরণের প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করবে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ, শ্রম বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা।
এই সময়ের মধ্যে শর্তসাপেক্ষে দেশটিতে অবস্থান করা অবৈধ অভিবাসীরা বৈধ হতে পারবেন। কন্সট্রাকশন, ফ্যাক্টরি, পাম অয়েল ও কৃষি—এই চার সেক্টরে অবৈধরা বৈধতার সুযোগ পাবেন।
মূলত থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, নেপাল, মিয়ানমার ও বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের অবৈধ অভিবাসী শ্রমিকরা এর আওতাভুক্ত। এক্ষেত্রে কোনো এজেন্ট গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানান দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মালয়েশিয়ায় করোনা মহামারির কারণে অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। সম্প্র্রতি তাদের কাজের সুযোগ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়।
সম্প্র্রতি দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, করোনাকালীন যারা চাকরি হারিয়েছেন তারা ‘মাই ফিউচার জবস’ অনলাইনে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রেও এ প্রক্রিয়া প্রযোজ্য।
অভিবাসন খাত নিয়ে কাজ করা এশিয়ার ২০টি দেশের আঞ্চলিক সংগঠন ‘ক্যারাম এশিয়া’ ধারণা করছে এই ঘোষণার ফলে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের ২০ থেকে ৩০ লাখ অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ-‘বায়রা’ বলছে, বাংলাদেশের কর্মীদের দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ায় থাকা অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা দেড় লাখ থেকে ২ লাখের কম হবে না। তারাও এই সুযোগ পাবেন।
এদিকে, অবৈধ যারা নিজ দেশে ফিরতে চান তাদের সে সুযোগ দেওয়া হবে। এই মুহূর্তে অবৈধ অভিবাসীদের আটকে বড় কোনো অভিযান পরিচালনা না করার আহ্বান জানিয়েছে মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন সুহাকাম। সরকারি-বেসরকারি হিসেবে মালয়েশিয়ায় ২০ লাখেরও বেশি বিদেশি কর্মী বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করছেন।
সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, দেশটিতে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার, ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ নেপালের, ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাংলাদেশের, ৬ দশমিক ৯ শতাংশ মিয়ানমারের, ৫ দশমিক ১ শতাংশ ভারতের, ৩ দশমিক ১ শতাংশ ফিলিপাইনের, ২ দশমিক ৫ শতাংশ পাকিস্তানের, শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থাইল্যান্ডের এবং ৪ শতাংশ শ্রমিক অন্যান্য দেশের।
এদিকে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, সরকারের বৈধতা দেওয়ার ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে দালাল চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ অবৈধকর্মীদের বৈধতা দেওয়ার ঘোষণার পর দালালরা কর্মীদের বৈধ করার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। ব্যাপক অভিযোগ জমা হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বৈধ হওয়ার কর্মসূচি স্থগিত করে। এবার যাতে এমন ঘটনা না ঘটে তার জন্য সরকার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ অক্টোবর শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নতুন করে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে দুই মন্ত্রীর মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ও কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সমঝোতা সইয়ের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
করোনাকোলে দেশে এসে আটকে পড়া শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে দেওয়ার আহ্বান জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। তবে মালয়েশিয়া ঘোষণা দিয়েছে তারা করোনা পরিস্থিতির কারণে শ্রম বাজার খোলার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে।
বাংলাদেশে ছুটিতে এসে আটকে পড়া কয়েক হাজার শ্রমিকের মালয়েশিয়া ফেরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কারণ, তাদের অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে অথবা শেষ হওয়ার পথে। তাদের ভিসা নবায়ন করা নিয়েও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি সেদেশের সরকার।
সংশ্লিষ্ঠদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার কারণে ২০১৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। অবশ্য তখন সব দেশ থেকেই শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। কর্মী নিয়োগ বন্ধ হওয়ার পূর্বাব্দি মালয়েশিয়ার একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি চক্র সেখানকার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করছিল।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশি প্রবাসী ব্যবসায়ী আবদুল কাদেরের সাথে মোবাইল ফোনে আলাপ করে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে। অনেকে চাকরি করলেও পাচ্ছেন না ন্যায্য মজুরি।
রাজধানী কুয়ালালামপুর ছাড়াও কোতাবারু, পেনাং, জহুরবারু, ক্যামেরুন হাইল্যান্ড, ইপো, পেটালিং জায়া, শাহালম, মালাক্কা সিটিতে অসংখ্য বাংলাদেশি অবৈধ রয়েছে। পুলিশের ভয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন পাহাড় ও জঙ্গলে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য বলছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়া বিদেশী কর্মীর ৪১ শতাংশই বাংলাদেশী। মালয়েশিয়ার প্রায় ৩০ লাখ বিদেশী কর্মীর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জরিপে অংশ নেয়া বিদেশী কর্মীর সাড়ে ১২ লাখ অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন। সে হিসেবে মালয়েশিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশী কর্মী অবৈধভাবে রয়েছেন।
এর আগে গত বছর ১ আগস্ট থেকে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ অবৈধ প্রবাসীদের ফেরাতে ‘ব্যাক ফর গুড (বি-ফোর-জি)’ কর্মসূচির আওতায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কার্যক্রম শুরু করে। এর মেয়াদ শেষ হয় গত ৩১ ডিসেম্বর। ওই সময় সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে অবৈধ হয়ে পড়া অনেক বাংলাদেশী দেশে ফেরেন। তবে এর পরও দেশটিতে রয়ে গেছেন অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় যারা এখন অবৈধ হয়ে পড়েছেন। বেশির ভাগ অবৈধ শ্রমিক মালয়েশিয়ার বিভিন্ন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেটে কাজ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই অভিযান ও ধরপাকড় চালানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ‘ব্যাক ফর গুড’ প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর পরই বাদ পড়া ও প্রতারিত অবৈধ কর্মীদের বৈধতা প্রদানে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে প্রস্তাব দেন বাংলাদেশের তত্কালীন হাইকমিশনার মহ. শহীদুল ইসলাম। এ নিয়ে তিনি দেশটির বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন ও কুয়ালালামপুর ত্যাগের আগে দেশটির সরকারি পর্যায়ে বৈঠকও করেন। ওই সময় মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে গত আগস্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জরিমানা দিয়ে এসব অবৈধ অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ দেয় মালয়েশিয়া সরকার। জরিমানা দিয়ে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন ছাত্র, পর্যটক ও ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে অবৈধ হওয়া বিদেশীরা। তবে এ সুযোগ শুধু বাংলাদেশীদের জন্যই নয়, অন্যান্য দেশের অবৈধ হয়ে পড়া নাগরিকরাও এর আওতায় ছিলেন।
এদিকে গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে এসেছেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন প্রবাসী শ্রমিক। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যারা দীর্ঘ সময় আটকা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পরও গত সাত মাসে (১ এপ্রিল-১১ নভেম্বর) দেশে ফিরে এসেছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশী। তাদের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ফেরত এসেছেন ১২ হাজার ৩৬৮ জন। যার মধ্যে ১১ হাজার ৮৬৯ জন পুরুষ ও ৪৯৯ জন নারী কর্মী।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক বলছে, মালয়েশিয়া ফেরত কর্মীদের প্রায় সবাই কাজ না থাকায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। আর ফিরে আসা কর্মীদের মধ্যে ৮৯৫ জনের পাসপোর্ট ছিল না। দূতাবাসের সহায়তায় আউটপাসের মাধ্যমে তাদের ফেরত আনা হয়েছে।
এম এস আই
















