ইসলাম টাইমস ডেস্ক: ‘আমি ধর্ষণ করিনি। মিলন, দুলাল, ইয়াছিন, আলামিন- এই চারজন ধর্ষণ করেছে। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরছে না। আমি গরিব দেখে আমাকে ধরেছে। আমার নাম মজনু পাগল, আমার গায়ে শক্তি নাই। আমাকে ছেড়ে দেন।’
“আমি বাড়ি যামু গা, আমি আর থাকব না। আমি রিকশা চালাই, ভ্যান চালাই। আমি দুর্বল মানুষ। আমারে বিনা দোষে ধরে এনেছে। আল্লাহ বিচার করব রে। আমার নাম মজনু। আমি পাগল মজনু। আইজকা ছাইড়া দ্যান। আমারে এক বছর বিনাদোষে আটকে রেখেছে।”
রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার একমাত্র আসামি মজনুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার (১৯ নভেম্বর) আদালত প্রাঙ্গনে চিৎকার করে এসব কথা বলেন মজনু।
আরো পড়ুন: অবশেষে সেই মজনুর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
আদালতের কাঠগড়ায় তোলার সময় মজনু অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন ।
এসময় মজনু বলেন, ‘আমারে ছাইড়া দেন। আমি মা’র কাছে যাব। আমাকে মারলে আল্লাহ বিচার করবে। আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসাই দিয়েছে। আমার শরীল খুব দুর্বল। আমাকে এক বছর ধরে অত্যাচার করছে।
মজনু বলেন, ‘আমি মারামারি করি না, নেশা-পানি করি না। আমারে ছাইড়া দেন। আমি রিশকা চালিয়ে খাব। আমার মা খুব অসুস্থ, আমার মায়ের কাছে কেউ নাই। আমারে ছেড়ে দেন। আমারে ওরা অনেক অত্যাচার করছে, মশার কামুর খাওয়াইছে।’
আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে মজনু বলেন, কারাগারে মানুষ বেচাকেনা করা হয়। আমার পক্ষে কেউ নাই। আমি এতিম। আমারে ছাইড়া দেন। আমি বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়া মইরা যামু। আমারে ছাইড়া দেন।
এসময় মজনু সাংবাদিকের সামনে চার জনের নাম উল্লেখ করে তারা এই ধর্ষণে জড়িত বলে দাবি করেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অসংলগ্ন কথাবার্তাও বলতে থাকেন।
বিকেল ৩টার কিছু আগে সাংবাদিকসহ অন্যদের আদালত করতে বলা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। বিকেল ৩টা ২ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। তিনি রায় পড়তে শুরু করেন। ওই সময়ও আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মজনু চিৎকার করেই যাচ্ছিলেন। এর মধ্যেই আদালত রায় ঘোষণা করলে মজনু কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্না সামলে আবার চিৎকার করতে থাকেন।
রায় ঘোষণা শেষ হলে মজনুকে আদালত থেকে বের করার সময় তিনি ছোটাছুটি করার চেষ্টা করছিলেন। চার-পাঁচ জন পুলিশ সদস্যের পক্ষেও তাকে আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। একপর্যায়ে তিনি পুলিশের হাত কামড়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্তে টেনে-হিঁচড়ে তাকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাজত পুলিশের এক সদস্যের ঘাড় চেপে ধরেন আসামি মজনু। এরপর কাঁদতে কাঁদতে কোর্ট হাজতের ওসির কাছে অভিযোগ জানাতে থাকেন এবং পুলিশ সদস্যদের গালাগাল শুরু করেন।
“আমার চোখের পানি শুকায়ে গেছে। আমি ধর্ষণকারী না। আমারে তাড়াতাড়ি ছাইড়া দেন। না হলে অবস্থা খারাপ হবে। হাতের হ্যান্ডকাফ একবার খুলে দে। কত পুলিশ আছে দেখে নেব।”’
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আফরোজা ফারহানা আহম্মেদ অরেঞ্জ তখন বলেন, “ক্যামেরা দেখে আসামি সিন ক্রিয়েট করছে।”
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানীর কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে নামেন ওই ঢাবি ছাত্রী। এরপর অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার মুখ চেপে ধরে সড়কের পেছনে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করে। নির্যাতনের একপর্যায়ে জ্ঞান হারান ওই ছাত্রী। ডাক্তারি পরীক্ষায় নির্যাতনের শিকার ছাত্রীর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে।
রাত ১০টার দিকে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে একটি নির্জন জায়গায় আবিষ্কার করেন ওই ছাত্রী। পরে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে যান তিনি। রাত ১২টার দিকে তাকে ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করেন সহপাঠীরা।
পরদিন সকালে অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে ওই ছাত্রীর বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি উত্তর)। ৮ জানুয়ারি মজনুকে গ্রেফতার করে র্যাব। ১৬ জানুয়ারি ধর্ষণের দায় স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন অভিযুক্ত।
এস এন
















