কীর্তিমান মনীষী আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ.

মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম ।। 

মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ. নিকট অতীতের মুসলিম বিশ্বের এমন একজন বরেণ্য ইসলামী ইতিহাসবিদ, গবেষক, দার্শনিক, জীবনীকার, সাহিত্যিক, সমালোচক এবং শিক্ষাবিদ, যার মতামত, পাণ্ডিত্য ও গবেষণাকর্মকে বিদ্বান মহলে সনদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আল্লামা ইকবাল রহ. তাকে ‘উস্তাদুল কুল’ এবং ইসলামী জ্ঞান-গবেষণার ‘দুধের নহরের ফরহাদ’ প্রবাদে আখ্যা দিয়েছেন।

জন্ম, শিক্ষা ও কর্মজীবন 

মাওলানা সুলাইমান নদভী রহ. ২২ নভেম্বর ১৮৮৪ সালে বিহারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সাইয়েদ আবুল হাসান। প্রাথমিক শিক্ষা তিনি ঘরে সাইয়েদ মাকসুদ আলী এবং নিজ বড় ভাইয়ের কাছে অর্জন করেন। ইসলামপুর, ফুলওয়ারি শরীফ এবং মাদরাসা ইমদাদিয়া দরভাঙেও  অল্প কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন।

১৯০১ সালে তিনি দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা লখনৌতে ভর্তি হন। এখান থেকেই তার ইলমি ও সাহিত্যরুচির হাতেখড়ি। ১৯০৫ সালে যখন আল্লামা শিবলী নোমানী নদওয়ার শিক্ষাসচিব রূপে আগমন করেন, তখন মাওলানা নদভীর অসাধারণ প্রতিভা দেখে তাকে তিনি নিজের বিশেষ তত্ত্বাবধানে তরবিয়ত আরম্ভ করেন।

১৯০৭ সালে সাইয়েদ সাহেব আননদওয়াহ পত্রিকার সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯০৮ সালে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির পর নদওয়াতেই আরবি সাহিত্যের শিক্ষক নিযুক্ত হন।  ওই যুগেই তিনি ছাত্রদের জন্য আরবি ‘দুরূসুল আদব’ রচনা করেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯০৯ সালে তিনি আরবি ভাষার আধুনিক শব্দাবলির একটি অভিধান ‘লুগাতে জাদীদা’ সংকলন করেন। সীরাতুন্নবী গ্রন্থের রচনার কাজে আল্লামা শিবলী নোমানীর সহযোগিতা এসময় থেকেই শুরু হয়েছিল।

সীরাতুন্নবী, দারুল মুসান্নিফীন, মাআরিফ

১৯১২ সালে মাওলানা শিবলীর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মাওলানা আযাদ ‘আলহেলাল’ পত্রিকা বের করলে ১৯১৩ এর মে মাসে সাইয়েদ সাহেবকে এ পত্রিকাটির স্টাফ অন্তর্ভুক্ত করেন। ওই বছরই মাওলানা শিবলীর ইঙ্গিতে দাক্ষিণাত্যের কলেজে তিনি শিক্ষকতা গ্রহণ করেন। ‘তারীখে আরদুল কোরআন’ গ্রন্থটির রচনা পুনায় অবস্থানকালে শুরু এবং সমাপ্ত করেন। দ্বিতীয় খণ্ডের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহও তখনই শুরু করেছিলেন, কিন্তু মাওলানা শিবলী তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। ইন্তেকালের পূর্বে মাওলানা তার এই বিশিষ্ট শাগরিদকে তারযোগে ডেকে পাঠান এবং তার হাতে হাত রেখে বলেন, সীরাত আমার আজীবনের অর্জন। সবকাজ ছেড়ে সীরাত গ্রন্থটি প্রস্তুত করো।

সাইয়েদ সাহেব উস্তাদের আদেশ মেনে কলেজের প্রফেসারি ছেড়ে দেন এবং মাওলানা মাসউদ আলী নদভী রহ. এর ব্যবস্থাপনায় এবং মাওলানা আবদুস সালাম নদভী রহ. এর ইলমি সহযোগিতায় ‘দারুল মুসান্নিফীন’ প্রতিষ্ঠা করেন। যার পরিকল্পনা করে গিয়েছেন মাওলানা শিবলী। মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠানটিতে ইসলামি জ্ঞান-গবেষণা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও শাস্ত্রীয় জ্ঞান চর্চার মহতি সফর আরম্ভ হয়। ইতিহাসে দারুল মুসান্নিফীনের সূচনাকাল থেকে নিয়ে উপমহাদেশসহ বিশ্বব্যাপী এই গবেষণামূলক দ্বীনী প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নতি ও খ্যাতির পেছনে সাইয়েদ সাহেবের নিরলস প্রচেষ্টার ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

১৯১৬ সালে সাইয়েদ সাহেব দারুল মুসান্নিফীনের মুখপত্র মাসিক মাআরিফ বের করেন।  সেবছর রমযানে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তখন থেকে তার প্রতিষ্ঠিত এই উর্দু পত্রিকাটি গত একশ বছর যাবত ইসলামি ইলূম ও শাস্ত্রীয় গবেষণার সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে।

রচনাবলী

আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীর রচনাবলীর তালিকার শীর্ষে রয়েছে তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘সীরাতুন্নবী’। এছাড়া তারীখে আরদুল কোরআন, সীরাতে আয়েশা, খুতুবাতে মাদরাজ, আলফারুক, আরব ও হিন্দ কে তাআল্লুকাত, হায়াতে শিবলী, ইয়াদে রফতেগাঁ, বারীদে ফিরিঙ, রহমতে আলম, মাকালাতে সুলাইমান, খৈয়ামসহ মাআরিফে লিখিত অসংখ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা

মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। হিন্দুস্তানের রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। খেলাফত কমিটি, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও কংগ্রেসের মিটিংগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। কয়েকটি সভায় সভাপতিত্বও করেন। হযরত থানবী রহ. এর খলীফা ছিলেন তিনি।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ককে সমর্থন করায় যখন ভারতীয় মুসলমানদেরকে ইংরেজ সরকার জেলে পুরছিল, তখন তাদের নেতৃত্বদানকারী ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গি মহল্লীর সঙ্গে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ.ও ছিলেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি পুরোপুরি সম্পৃক্ত থাকেন।

১৯১৯ সালে মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী খেলাফত আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯২০ সালে তিনি খেলাফতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউরোপ সফর করেন। লন্ডনে থাকাকালেই তার কিতাব সীরাতে আয়েশা প্রকাশিত হয়।  ঐবছরই লন্ডন থেকে ফেরার পর ভারতে বৃটিশ পণ্য বয়কটের তীব্র আন্দোলন চলছিল। সাইয়েদ সাহেব এতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৩ সালে বিহারে তিনি খেলাফত কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করেন।

হযরত মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ.-এর সামাজিক দ্বীনী কর্মকাণ্ডের পরিধি অনেক বিস্তৃত। একদিকে তিনি বিভিন্ন ইসলামি ইস্যুতে মাআরিফে সারগর্ভ সব রচনা লিখে গেছেন, প্রাচ্যবিদ ও ইসলামবিদ্বেষী পশ্চিমাদের ইসলামের ওপর বিভিন্ন আপত্তির চমৎকার খণ্ডন রচনা করেছেন, দিনরাত পরিশ্রম করে উম্মাহকে উপহার দিয়েছেন দ্বীনী বিষয়ের শাস্ত্রীয় ও দিকনির্দেশনামূলক অমূল্য সব গ্রন্থ, অপরদিকে তিনি জমিয়তে ওলামা, খেলাফত আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের ডাকে গোটা অবিভক্ত ভারতে সফর করে বেড়িয়েছেন। নাদির শাহের দাওয়াতে আফগানিস্তান সফর করেছেন, অলইন্ডিয়া ফিলিস্তিন কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করেছেন, করাচিতে গোটা মুসলিম বিশ্বের আলেমসমাজের কনফারেন্স ডেকেছেন, পাকিস্তান হিস্টোরিকাল কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাশরীফ এনেছেন।

হযরত মাওলানা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ. আজীবন ইসলামি জ্ঞান-গবেষণা ও লেখালেখিতে অতিবাহিত করেন। অবশেষে ২২ নভেম্বর ১৯৫৩ সালে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।