ভারতবর্ষে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রপুরুষ মাওলানা শওকত আলী

সাইফ নূর ।।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানা শওকত আলী একটি উজ্জল নাম। এমন এক সময়ে তিনি ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন যখন গোটা অবিভক্ত ভারতে ইংরেজ শাসনের ভিত মজবুত ছিল এবং ভারতবাসীদের ওপর তাদের জুলুম-অত্যাচার সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের অগ্রণী নেতা মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহারের ভাই।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল এবং অমায়িক স্বভাবের মানুষ। আস্থা ও লক্ষ্যে অবিচলতা ছিল তার রক্তজাত। দেশ ও জাতির স্বাধীনতার জন্য তার ছিল বুকভরা ব্যাকুলতা।

মাওলানা শওকত আলি ১৮৭৩ সালে রামপুরে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশে) জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু ১৯১৩ সালে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য চাকরি ত্যাগ করে ‘আঞ্জুমানে খুদ্দামে কা’বা’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

মাওলানা শওকত আলী মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গি মহল্লির হাতে বাইআত গ্রহণ করে তার সান্নিধ্যে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার সবক হাসিল করেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সর্বদা সক্রিয় থাকার কারণে তাকে ইংরেজের হাতে জেলজুলুমের কষ্ট সইতে হয়েছিল।

১৯১৯ সালে তিনি আপন ছোট ভাই মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহারের সঙ্গে খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসে তারা খেলাফতের আলী ভাতৃদ্বয় হিসেবে বিখ্যাত।

স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে তারা দু’ভাই সারা ভারতের আনাচে-কানাচে ছুটে গেছেন। জ্বালাময়ী ভাষণের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে গাফলতির ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছেন। যুবসমাজকে দাসত্বের শৃংখল চূর্ণ করে স্বাধীনতা অর্জন করতে অনুপ্রাণিত করে গেছেন আজীবন।

মাওলানা শওকত আলী ও মাওলানা মুহাম্মদ আলী জাওহার বক্তৃতা ও লেখনির দ্বারা ভারতবাসীকে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, নিজেদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। তাদের এ প্রচেষ্টার ফলে মানুষের অন্তর থেকে ইংরেজের গুলির ভয় দূর হয়ে গিয়েছিল। সারা ভারতে যুবকরা তখন ব্যাপকভাবে বৃটিশের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসত। দেখা যেত, অস্থির হয়ে ইংরেজ সৈন্যরা আন্দোলনকারীদেরকে গণগ্রেফতার করে বিকালে অন্য এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দিত। ওই সময় ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে শ্লোগান-বিক্ষোভ যুব-মানসে বসিয়ে দিয়েছিলেন আলী ভাতৃদ্বয়।

মাওলানা শওকত আলী ছিলেন বক্তৃতার অঙ্গনের শাহসওয়ার। শব্দের জাদুতে শ্রোতাদের হৃদয়ের তন্ত্রীতে আঘাত করার খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতা ছিল তার। তার বয়ান মানুষের অন্তরকে দীর্ঘ সময় সম্মোহিত করে রাখত। তিনি সাধারণত কোনো ভূমিকা ছাড়াই বক্তৃতা করতে অভ্যস্ত ছিলেন। বলা হয়, তিনি ছিলেন বয়ানের ময়দানের মুজাহিদ। সাধারণ থেকে সাধারণ বিষয়কে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনে তার জুড়ি ছিল না। বয়ানের মধ্যে জালেম ইংরেজ সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে কোনো ভয় পেতেন না তিনি। এজন্য তাকে বারবার ইংরেজ সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছিল।

খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠার ওই সময়ে গান্ধীজি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ডাক দেন। আলী ভাতৃদ্বয়ও এর তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কারণ তারা লক্ষ্য করেছিলেন যে, এ দুই সম্প্রদায় ইংরেজের ইন্ধনে পরস্পরে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এজন্য তারা গান্ধীর সঙ্গে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তারা চেয়েছিলেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম করুক। কিন্তু হিন্দুদের অসহযোগিতা এবং মুসলমানদের পারস্পরিক মতপার্থক্যের কারণে তারা এ পথ ত্যাগ করেন এবং মুসলিম লীগে যোগদান করেন।

১৯২৮ সালে নেহেরু রিপোর্টসহ আরো কিছু ইস্যুতে মতানৈক্যের কারণে মাওলানা শওকত আলী মুসলিম লীগের পলিসি সমর্থন করতে শুরু করেন এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরীক হন।তিনি নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা করে মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান। খিলাফত কমিটি শেষ পর্যন্ত নেহেরু রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে।

১৯৩৭ সালে তিনি কেন্দ্রিয় আইনপ্রণয়ণকারী অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

শওকত আলি তার ভাই মুহাম্মদ আলিকে উর্দু সাপ্তাহিক হামদর্দ ও ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেড প্রকাশ করতে সাহায্য করেন। ১৯১৯ সালে রাজদ্রোহ অভিযোগ ও প্রতিবাদ সংগঠনের কারণে কারাগারে থাকার সময় তিনি খেলাফত সম্মেলনের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে সমর্থন করার কারণে ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।

তার ভক্তরা তাকে ও তার ভাইকে মাওলানা উপাধি দেয়।

তিনি লন্ডনে প্রথম ও দ্বিতীয় গোল টেবিল সম্মেলনে অংশ নেন। তার ভাই ১৯৩১ আলে মৃত্যুবরণ করলে তিনি কাজ চালু রাখেন এবং জেরুজালেমে বিশ্ব মুসলিম সম্মেলন সংগঠিত করেন।

তিনি মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন এবং ভারতীয় মুসলিমদের জন্য সমর্থন তৈরী করেন।

মাওলানা শওকত আলি ২৬ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে এ দুনিয়া ত্যাগ করেন। ২৮ নভেম্বর দিল্লি জামে মসজিদের নিকট এ মহান সংগ্রামী পুরুষের দাফন সম্পন্ন হয়।

এম এস আই