ইসলামী ইস্যুতে জাফরুল্লাহর মতো ‘ডানপন্থী’দের চিনে রাখুন

সাইফ নূর ।।

এখন যারা দেশে ডানপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত-বিখ্যাত, তাদের উপরের সারির অনেক রথী-মহারথীই এমন আছেন, যারা একসময় বামপাড়ার ‘আলো-বাতাসে’ বেড়ে উঠেছিলেন। যৌবনে মার্কস, লেলিন আর কথিত সাম্যবাদের মুখরোচক শ্লোগানে মুখে ফেনা তুলেছিলেন একসময়। ধর্ম, ইসলাম, পরকালীন জীবন এবং তাওহীদ ও আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি নেতিবাচক ও বিরূপ মনোভাবের মতাদর্শ ছিল তাদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। যে কমিউনিজমের হাতে পৃথিবীর হাজারো-লাখো বনি আদমের রক্ত শোষিত হয়েছে, যারা মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার দেশগুলোতে যুগের পর যুগ মুসলিমদের রক্তের হোলি খেলেছে, এই সাবেক বামপন্থীরা কিন্তু তাদেরই আদর্শে লালিত-পালিত।

প্রসঙ্গের প্রেক্ষাপটটি সূর্যসেনের শিষ্যের পুত্র, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা, বিএনপিপন্থী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরিকে নিয়ে। মাঝে-মাঝেই তিনি এবং তার মতো আরো কয়েকজন কথিত ডানপন্থী অধ্যাপক, আইনজীবী, ছাত্রনেতা, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদকে দেখা যায়, টকশোতে তারা সরকারের শোষণ-দুর্নীতির কড়া সমালোচনা করেন। ব্যানারের সামনে মাইক হাতে গণতন্ত্র ও জাতিয়তাবাদের পক্ষে জনগণের মনের কথা বলিষ্ঠ কন্ঠে উচ্চারণ করেন। এমনকি কোনো কোনো সময় সরাসরি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকার এবং আমেরিকার বিরুদ্ধেও কঠোর উক্তি করে পত্রিকায় শিরোনাম হন। শুধু তাই নয়, ইসলামি বিভিন্ন ইস্যুতেও মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিমূলক বক্তব্য তাদের মুখ দিয়ে বের হতে দেখা যাওয়ায় ইসলামপন্থী ঘরানায় তাদের প্রতি একটা ‘কোমল’ অবস্থানও প্রায় তৈরি হয়ে আছে।

হাল-আমলে তাদের এজাতীয় অবস্থান, বিবৃতি এবং ‘ফেসবুক স্ট্যাটাসে’ ইসলামপন্থীদের অনেককেই বেশ খুশি হতে দেখা গেছে। এ ‘দরদি’ নেতারা অসুস্থ হলে ইসলামি রাজনৈতিক দলের কোনো কোনো নেতা তাদের জন্য দোআ করে গণমাধ্যমে বিবৃতিও পাঠিয়েছিলেন। অনেকেই ধারণা করেন, ‘একই জোটের নেতা হওয়ার কারণে’, ‘সরকারের কঠোর সমালোচনার কারণে’ ‘ইসলামি ইস্যুতে মাঝে-মাঝে ইতিবাচক বক্তব্যের কারণে’ অথবা ‘ছাত্রলীগের হাতে মার খাওয়ার কারণে’, তারা ইসলামের পক্ষের কেউ! ফলে ইসলামী ঘরানার অনেকে আগ বেড়ে হয়ত ভেবে নিয়েছেন, তারা মাদরাসা-দরদি, আলেম-দরদি, মুসলিম উম্মাহর প্রতি সহানুভূতিশীল সজ্জন!

কিন্তু আমরা বারবার একটি কথা ভুলে যাই যে, বাম রাজনীতির গোড়াটা তৈরিই হয়েছে ইসলাম বিরোধিতার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। একজন আদর্শ বামপন্থী হতে হলে তাকে অবশ্যই  বিশ্বাস ও চেতনায় ইসলাম বিরোধী হতে হবে। যৌবনে বামপাড়ায় বিচরণ করে এখন হয়ত তারা ডানপন্থী দলে পক্ককেশ নিয়ে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু গোড়া কি এত সহজে বদলায়!

বিজ্ঞজনদের মতে, এধরনের লোকদের আসল চেহারা প্রকাশ পায় তখন, যখন ইসলামের স্পর্শকাতর কোনো ইস্যু সামনে আসে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ যখন কোনো গভীর সংকটের সম্মুখীন হয় তখনই তাদেরকে চেনা যায়।

কী বলেছিলেন তিনি?

সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদের শহর ঢাকায় ভাস্কর্য নির্মাণকে ইসলামবিরোধী বলার পর থেকে ওলামায়ে কেরাম ও ক্ষমতাসীন মহলে টানটান উত্তেজনার বিষয়টি আমরা সকলেই অবগত। এ পরিস্থিতিতে সেই কথিত ইসলামদরদি শ্রেণিটির অবস্থান বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

ভাস্কর্য ইস্যুতে ডা. জাফরুল্লাহ গত কয়েকদিনে ওলামায়ে কেরামের বিষোদগার করে এমন কিছু বক্তব্য দিয়েছেন যা খুব সহজে তার ‘গোড়া’ চিনিয়ে দিতে সাহায্য করবে।

ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলনে হেফাজত নেতৃবৃন্দ

যদিও প্রথমদিকে তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘অকারণে আলেম সমাজকে নিয়ে কটূকথা বলবেন না। কথা বলার অধিকার সবার আছে, তাদের কথা বলতে দিন।’ কিন্তু শুরু থেকেই তিনি কিন্তু ‘অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে’ আলেমদের কাজ করার পরামর্শ দিয়ে এসেছেন!

এর কয়েকদিন পর ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের হুংকারমূলক বক্তব্য, আলেম ও তৌহিদী জনতার প্রতিবাদী অবস্থানের প্রেক্ষিতে যখন চিহ্নিত গণমাধ্যম আচরণ ও উপস্থাপনায় হঠাৎ বিভিন্ন জায়গায় মাদরাসায় ঘটিত অনৈতিক ঘটনাকে সামনে এনে গোটা ইসলামী সমাজকে কোনঠাসা করার অপচেষ্টা করেছিল তখন ডা. জাফরুল্লাহ কী বলেছিলেন শুনুন, ‘‘আলেমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তাদের এসব বিতর্কে জড়ানো উচিত নয়। মাদ্রাসার লোকেরা কেন বলাৎকারে জড়িত? কেন যৌন নিপীড়ন করে? এর থেকে কীভাবে জাতিকে রক্ষা করা যায়, এসব ব্যাপারে হেদায়েত করতে যাওয়া উচিত।’

অর্থাৎ তার ভাবখানা এমন যে, মাদরাসার লোক মানেই বলাৎকারে জড়িত। তিনি তো পেশায় একজন চিকিৎসক। এখন কেউ যদি তাকে দেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিভাগের বিশাল বিশাল কেলেংকারি ও দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে তার চিকিৎসা পেশাকে কলংকিত করতে চায় তাহলে সেটা কতটা সততা হবে? একজন শিক্ষিত মানুষের পক্ষে এ ধরনের বক্তব্য কি তার সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষ মানসিকতার প্রকাশ নয়?

শুধু তাই নয়, শেষদিকে এসে তিনি আরো নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ওলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আলেমদের বলি,সরকারের কিছু পয়সা পেয়ে তাদের কথায় নাইচেন না, তাদের কথায় নাচলে আপনাদেরই ক্ষতি হবে।’ একজন বয়োবৃদ্ধ ভদ্রলোক কিভাবে এমন কথা উচ্চারণ করতে পারে? এসবই কি তার আলেমবিদ্বেষের উগ্র প্রকাশ নয়?

সবশেষে তিনি বোরকা নিয়ে বিষোদগার করে ইসলাম বিরোধিতার সকল সীমা অতিক্রম করলেন। তিনি বোরকা পরা কে ‘স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’ মন্তব্য করে বসলেন। যা পরিষ্কার ইসলামী বিধানের ওপর আক্রমণ।

বয়কট ফ্রান্স ইস্যু ও মির্জা ফখরুল

পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেই, এর আগে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে অবমাননার কারণে বয়কট ফ্রান্স আন্দোলনের পুরো সময় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মুখে কুলূপ এঁটে ছিল। শেষদিকে যখন আন্দোলনে তৌহিদী জনতার পাল্লা ভারি ছিল তখন এসে একটি দায়সারা গোছের বিবৃতি দিয়েছিলেন মির্জা ফখরুল।

ফ্রান্সের ইসলাম অবমাননার বিরুদ্ধে রাজধানীতে তাওহীদী জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ

তিনিও আরেকজন সাবেক বামপন্থী নেতা। তাকে যখন একটি বিদেশি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বয়কট ফ্রান্স ইস্যু নিয়ে হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল তখন তিনি বলেছিলেন, “হেফাজতে ইসলামকে সরকার এবং আওয়ামী লীগই সবসময় সাহায্য-সহযোগিতা করেছে এবং প্রশ্রয় দিয়েছে। তবে যখনই গণতন্ত্র থাকে না বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, তখনই এমন বিষয়গুলো তৎপর হয়।”

তিনি একথাও বলেছিলেন,  “ধর্ম বিশ্বাস করা আর ধর্মান্ধতা তো এক জিনিস নয়। এখানে ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। এটা সচেতনভাবে করা হচ্ছে কিনা -তা বলতে পারবো না।’

এতক্ষণে পাঠক আশা করি এ কথিত ডানপন্থী ও সাবেক বামপন্থীদের চিনে ফেলেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, এধরনের রাজনীতিবিদরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দার স্বার্থে ইসলামের পক্ষে কথা বলে। ইসলামি রাজনীতিবিদদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার বাসনাই তাদের মূল লক্ষ্য। সুযোগ বুঝে ইসলামপন্থীদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় আরোহন করা আর তারপর আলেমসমাজকে অবজ্ঞা করাই তাদের রাজনীতি। বলতে দ্বিধা নেই, এরাই প্রকৃত ধর্মব্যবসায়ী।

কিন্তু খুবই আশ্চর্য লাগে, যখন তাদের সঙ্গে শরীক ইসলামী দলগুলোর নেতৃবৃন্দ তাদের এহেন ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেন না। এমন কেন হয় যে, জেনারেল রাজনীতিবিদদের দ্বারা ইসলামপন্থীরা কেবলই পরিচালিত-ব্যবহৃত হয়ে যাবেন? কেন ইসলামী শক্তিকে ব্যবহার করে ক্ষমতার লালসা পোষণকারীদের ইসলাম ও আলেমবিদ্বেষী বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ জানানো হয় না? এ দুঃখভরা প্রশ্নটি দেশের আপামর তাওহীদী জনতার।

সবশেষে সবিনয়ে নিবেদন করব, ইসলামি ইস্যুতে ডা. জাফরুল্লাহর মতো ডানপন্থীদের চিনে রাখুন। অন্যথায় পরে পস্তাতে হবে। এসমস্ত কথিত ডানপন্থীদের ওপর ভরসা করা মোটেও সমীচীন নয়। বিপদের সময় এলে তাদের আসল স্বরূপ প্রকাশ পায়। তাদের প্রতি গদগদ ভাব থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। আত্মমর্যাদাশীল জাতির জন্য এধরনের অবস্থান বেমানান।

-এমএসআই