সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়

এহসান আকতাস ।।

গত পাঁচ বছরে তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিজ এন্ড ডেভেলাপমেন্ট পার্টি (একেপি) সরকার দেশকে নানামূখী সঙ্কটের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করেছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত উদীয়মান অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতির জন্য তুরস্ককে এই অঞ্চলের “জ্যোতির্ময় নক্ষত্র” হিসেবে আখ্যা দেয়া হতো।

তুরস্কের ক্রান্তিকালে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করে জাতীয় স্বার্থকেই প্রধান্য দিয়েছেন। ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার শক্তিশালী করার জন্য তুরস্কের বহুমূখী পররাষ্ট্রনীতি তার পশ্চিমা সহযোগীদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। 

ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার দুইশত বছরের মাথায়, স্নায়ুযুদ্ধত্তোর বিশ্বে বহুমূখী ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যবস্থায় পশ্চিমা শক্তিগুলো এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। পশ্চিমা শক্তিগুলো রাজনৈতিক, জুডিশিয়ারি ও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে একে পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। প্রেসিডেন্ট এরদোগান তার দেশের জনগনের ব্যপক সমর্থন নিয়ে এখনো রাজনীতিতে টিকে আছেন। 

অরাজকতাপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পাশাপাশি তুরস্ক শক্তিশালী তিনটি সন্ত্রাসী সংঠনকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। ১৫ জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুর্থান ঠেকিয়ে গুলেনপন্থী সন্ত্রাসী গ্রুপকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে পরিপূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সেনাবাহীনির সম্মুখ আক্রমণে সিরিয়া এবং ইরাকে ডায়েশ এবং পিকেকে গ্রুপ দুটিকে পরাস্থ করে। 

তুরস্কই প্রথম যুদ্ধ করে ডায়েশকে পরাজিত করে। সিরিয়া, লিবিয়া এবং আজারবাইজানে রাজনৈতিক এবং সামরিক বিজয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুরস্কের শক্তি সুসংহত করে। 

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো। ফলে তেহরান এই অঞ্চলে তার রাজত্ব কায়েম করার সুযোগ পেয়ে যায়। তখন ইরানী সম্প্রসারণবাদ ঠেকাতে তুরস্ক সৌদি আরবকে সহায়তা করে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপুত্র মুহাম্মদ বিন জায়েদ  যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও ক্ষমতার দালাল জারেদ কুশনারকে সাথে নিয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করে গালফ রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে থাকে। সৌদি জনগণের ফিলিস্তিনীদের প্রতি জোরালো সমর্থন থাকায় সৌদি সরকারের এই নীতি দেশের রাজনীতিতে এক বিপর্যয় নিয়ে আসে। 

তুরস্ক সামরিক শক্তি দিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব অর্জন করে এখন কুটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এই দৃষ্টিকোন থেকে, সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। 

এটা স্পষ্ট যে,  সাম্প্রতিক দুই দেশের মাঝে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক উভয়েরই অর্থনৈতিক উন্নয়ণ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে তুরস্ক তার পন্য রফতানির জন্য বৃহৎ বাজার পাবে, আর সৌদি পাবে বিনিয়োগের সুযোগ।

যদিও সাংবাদিক খাশোগী হত্যাকাণ্ড সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি করেছে, কিন্তু উভয় দেশেরই উচিত হবে বিষয়টিকে বৃহৎ দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচনা করা। এই হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে, যারা সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কে অবনতির ফলে লাভবান হয়েছে। 

যেহেতু ইরানের বিপক্ষে সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট কোন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে না, তাই বিবাদমান দেশগুলোকে তুরস্কে মধ্যস্থতার প্রয়োজন হবে। সৌদি-তুরস্ক সম্পর্কে অবনতি হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া হয়তো মুশকিল হবে, কিন্তু উভয় দেশের মাঝে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার অনেক প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান। 

সৌদি-তুরস্কের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তুরস্ক-মিশর সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সুন্নি আফ্রিকায় নতুন জোট তৈরির পথ সুগম করবে। 

আমরা বিশ্বাস করি যে, সৌদি ও তুরস্কের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ –  মুহাম্মদ আলাউদ্দিন রফিক

ইজে