মেহমানদারী তো অনেকেই করে, মেহমানদারি জানে কয়জন!

মাওলানা তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।। 

কোথায় যেন পড়েছিলাম “খাওয়াতে পারে তো অনেকেই। খাওয়াতো জানে কয়জন?” অর্থাৎ খাওয়ানোর সাধ্য-সামর্থ তো অনেকেরই আছে। কিন্তু সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে, আন্তরিকতাপূর্ণ উপস্থাপনে, মনভোলানো কথা ও আচরণে আপ্যায়ন করতে জানে কয়জন? সত্যিকারের মেহমানদারী তো সেটাই!

মেহমানদারীর মৌলিক একটি বিষয় হলো, মেহমানের মন খুশি করা। তার স্বস্তি, স্বচ্ছন্দ ও আরামের ব্যবস্থা করা। তাকে কোনো সংকোচ ও সংকটের মধ্যে না ফেলা। আসলে সেই দিকটা যথাযথ খেয়াল করেন কতজন মেজবান?

গতকাল সকালে একজন আলেমের বাসায় মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। কথা ছিল ফজরের পর পর তাঁর সঙ্গে দেখা করব। সেমতে নামাজ পড়েই রওনা হলাম। বাসার সামনে গিয়ে দেখি তিনি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছেন। সঙ্গে তাঁর ছোট ছেলে। একেবারে ছোট্ট একজন মেহমানের জন্য অভ্যর্থনার কী বিনয়পূর্ণ আয়োজন। অথচ  আমি তাঁর ছাত্রের ছাত্র পর্যায়ের একজন তালিবুল ইলম।

ভেতরে প্রবেশ করতেই এত আন্তরিকভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, যার বর্ণনা শব্দ বাক্যের ভাষায় তুলে ধরা অসম্ভব।

আমি গিয়েছি মূলত ছোট্ট একটি জিনিস পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে। সেটা পেশ করলাম। সংক্ষিপ্ত সময়ের কাজ। বরং সেটা গেইটের সামনে থেকেই হয়ে যেতে পারত। এদিকে তিনি অনেক ব্যস্ত মানুষ। উপরন্তু ফজরের পর তাঁর নির্দিষ্ট রুটিন আছে। কিন্তু তিনি এত স্বাভাবিকভাবে আমাকে সময় দিলেন, এত আন্তরিকভাবে কথা বললেন যে, বারবার আমার মনে হচ্ছিল—বড়রা বড় হন হয়তো এসব গুণের উসিলায়ই। আমরা আমাদের অবস্থায় থেকে যাই এসব বিষয়ের অভাবেই।

চা ও সংক্ষিপ্ত নাস্তার পর তিনি আমাকে তাঁর বাসা ঘুরে দেখালেন। যা একান্তই ঘনিষ্ঠজনদের ক্ষেত্রে হবার মতো। কিন্তু ছোট্ট একজন তালিবুল ইলমকেও তিনি মেহমানের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে থাকলেন। অত্যাশ্চর্য বিষয়টি হলো, তাঁর মাকতাবা দেখাতে দেখাতে বললেন—এখান থেকে আপনার সংগ্রহে নেই এমন যেকোন দুই-একটি কিতাব হাদিয়া হিসাবে নিতে পারেন। আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না। তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিতাব দেখাতে লাগলেন এবং আমাকে নির্বাচন করার সময় দিলেন। মনে হলো আমি কিতাব নেওয়ার আগ পর্যন্ত হয়তো তিনি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবেন। তাই একটি কিতাবের কথা বললাম। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেটি হাতে নিয়ে সামান্য মুছে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি এখনো লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ছি সে সময়ের কথা ভাবলে। আমার বেকুবিও ভেসে উঠছে কল্পনায়। কারণ অপ্রস্তুতভাবে আমি একটি বড় কিতাবের কথা বলে ফেলেছি। আসলে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কোন কিতাব নির্বাচন করতে পারছিলাম না। তাছাড়া এই কিতাবটি আমার প্রয়োজনও ছিল।

এরপর তিনি আরেকটি কামরায় নিয়ে গেলেন। সেখানে আরো অনেকগুলো আলমারি। সেখানেও দুয়েকটি কিতাব হাতে নিয়ে খুলে খুলে দেখালেন। কিতাবসংশ্লিষ্ট কিছু কথা বলতে থাকলেন। আমি অনেকটা নীরবে শুধু তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করতে থাকলাম। এক পর্যায়ে সেখান থেকেও দুটি কিতাব আমাকে পড়তে দিলেন। আর বললেন, আজকে তো কম সময় নিয়ে এসেছেন। সামনে কোনদিন লম্বা সময় নিয়ে আসলে এখানে বসে বসে কিতাব দেখতে পারবেন। তাঁর আচরণ মুগ্ধতায় অভিভূত আমি নীরবে শুধু তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

বিদায়ের আগে তিনি নিজেই লিফট ডেকে আমার ওঠার ব্যবস্থা করলেন। এবং দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। আবারও বলি, আমি তাঁর ছাত্রের ছাত্র পর্যায়ের একজন ছোট্ট তালিবুল ইলম। অথচ তাঁর আচরণ ছিল বড় কোনো ব্যক্তির শান উপযোগী ইকরাম।

ফিরতে ফিরতে কতকিছু যে ভাবলাম! কৃতজ্ঞতায় আমার আপাদমস্তক যেন ডুবে গেল। হৃদয়ের গভীর থেকে অসীম মুগ্ধতায় তাঁর সম্মান ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করলাম। আর সেই বাক্যটার মতো করে ভাবলাম—দুআ চাইতে তো অনেকেই পারে। দুআ নিতে জানে কয়জন?

মনে পড়ল হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস।

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন মেহমানের ইকরাম করে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৬০১৮; সহীহ মুসলিম, হদীস : ৭৪

খেয়াল করার বিষয় হলো, মেহমানের ইকরাম বাহ্যত খুব উচ্চপর্যায়ের কোনকিছু মনে হয় না। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টিকে আল্লাহ ও আখেরাতের বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করে বলেছেন। সেখান থেকে এ কথাও বুঝা যায় যে, ঈমানের মৌলিক বিশ্বাসের সঙ্গে যে বিষয়টাকে নবীজি সম্পৃক্ত করেছেন সে বিষয়টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে, ছোট বড় সকল দিক রক্ষা করে আমল করা উচিত।

ভাবলাম, নবীজি এই হাদীস অনুযায়ী আমল করার নিয়ত ছাড়া মেহমানদারীর এত সূক্ষ্ম বিষয়গুলো খেয়াল রাখা ও সেগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ বিষয় নয়। সেইসঙ্গে মেহমানের হৃদয় নিংড়ানো দোয়া লাভ করাও যে কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

আরও মনে হলো, দ্বীনী পরিবারের লোকদের ক্ষেত্রে কিতাব হাদিয়ার এই ফিকিরটা অনুসরণীয়। আমরা যদি সব সময় ঘরে কিছু কিতাব রাখি মেহমানকে হাদিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেটা বহুদিক বিবেচনায় মহৎ কাজ হবে। মেহমানের ইকরাম, হাদিয়া দেওয়ার সওয়াব এবং দ্বীনী ইলমের প্রচার ও প্রসার। সেইসঙ্গে এই কিতাব পড়ে যতজন যতকিছু শিখবে এবং সে অনুযায়ী আমল করবে তার সওয়াব। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমীন।

-এমএসআই

পূর্ববর্তি সংবাদবিশ্বজুড়ে হঠাৎ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার সেবায় বিভ্রাট
পরবর্তি সংবাদকরোনায় আক্রান্ত হয়ে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সহসভাপতির মৃত্যু