ইসলাম টাইমস ডেস্ক: জলবায়ুজনিত ঝুকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অন্যতম। করোনা মহামারি ও মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর বায়ুর কারণে বিপর্যস্ত জনজীবন। বায়ু দূষণ রোধে নেয়া প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিশেষজ্ঞরা। আর প্রকল্প ঘিরে নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন।
শীতের তীব্রতা, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহে বোঝা না গেলেও মাপযন্ত্রে প্রমাণ মিলছে বায়ুদূষণের ভয়াবহতার। নাসার তথ্য অনুযায়ী গেল ১০ বছরে ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। আর এয়ার ভিজ্যুয়ালের বায়ুমান সূচক (একিউআই) তথ্য: ঢাকায় ২০১৯ সালে গড়ে বায়ুদূষণের সূচক ৮৩.৩; ২০১৮ সালে বায়ুদূষণের সূচক ৯৭.১ এবং ২০১৭ সালে গড় বায়ুদূষণের সূচক ৭৯.৭।
১০ বছরের তথ্য উপাত্তে নজর দিলেই বোঝা যায় ঢাকার বাতাসে দূষণের সূচক কেবলই উর্দ্ধমূখি। গেল চার বছরে ডিসেম্বর মাসের প্রথম ৮ দিনে, এ বছর রয়েছে দুর্যোগপূর্ণ বায়ু ও বেড়েছে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর দিনের সংখ্যাও। অথচ এই ১০ বছরই ঢাকার বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প। নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ ( কেইস ২০০৯-২০১৯) প্রকল্পের মোট ব্যয় ৮০২ কোটি টাকা; যার ৫০ ভাগ ব্যয় করা হয়েছে নন-মেটেলিয়ালস খাতে; ২৫ ভাগ ব্যয় হয়েছেকর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও অভিজ্ঞতার নামে বিদেশ ভ্রমণে। মোট ব্যয়ের ১৮২ কোটি কর্মচারীর বেতন-ভাতা; মিডিয়া ক্যাম্পেইন ৩৪ কোটি টাকা; বিদেশ ভ্রমণে ৩৩ কোটি; মেলা ১০ লাখ; কালচারাল প্রোগ্রাম ৯ লাখ; কনসালটেন্সি ৩৩ কোটি; কর্মকর্তাদের কাপড় ধোয়ায় গেছে ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৮০২ কোটি টাকার মধ্যে ৫০ ভাগ ব্যয় করা হয়েছে নন-মেটেরিয়ালস খাতে আর ২৫ ভাগ খরচ হয়েছে বেতন-ভাতা ও বিদেশ ভ্রমণে। প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পটি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি??
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি নির্মল বায়ু নিশ্চিতের জন্য নেয়া হয়েছিল, কিন্তু নির্মল বায়ুতো দূরের কথা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ু সেবন করছে ঢাকার বায়ু। প্রকল্পের সুফল কিভাবে আসছে তা নিয়ে সঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রকল্পের আগে পরে কখনই বায়ু দূষণের মাত্রা কমেনি বরং বেড়েছে। বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি ক্রয় আর ভবন নির্মাণেই আটকে থাকায় দূষণরোধে নেই দক্ষ জনবল।
প্রকল্প ব্যয় নিয়ে নানা অসামঞ্জস্যতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে মহামান্য হাইকোর্ট দূষণজনিত জরুরী অবস্থা জারি করে কিনা তা এখন ভাবনার বিষয়। তাই বায়ু দূষণ রোধে, যা আছে তা নিয়েই পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আয়-ব্যয়ের হিসাব এড়িয়ে এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) পরিচালক মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, কেইস প্রকল্পে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ ছিলো দুই সিটি কর্পরেশনে। তুলে ধরেন নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ের চিত্র। কিন্তু প্রকল্পে ছয়নয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিবেশ দূষণরোধে কার্যকরি উদ্যোগের অংশ হিসেবে অচিরেই আসছে নতুন প্রকল্প। ৩০০ মিলিয়ন বাজেটের নতুন এই প্রকল্পে অর্থায়নের প্রাথমিক সম্মতি জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর
আওতায় পানি, বায়ু থেকে শুরু করে সব ধরনের দূষণরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দাবি করেন, কেইস প্রকল্পে অসামঞ্জস্যতা থাকলে নতুন এই বরাদ্দের সম্মতি পেতো না বাংলাদেশ। বায়ু দূষণের ভয়াবহ অবস্থার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সিটি কর্পরেশনসহ সব সংস্থা এক সাথে কাজ করলে দূষণ কমিয়া আনা সম্ভব হবে।
ক্ষমতার রদবদলের অজুহাতে প্রকল্পে নয়ছয়ের বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে গেলেও পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো.শাহাব উদ্দিন। তার ভাষ্য ‘কাজ হয়নি তা নয়, কাজ ঠিকই হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কতটা দৃশ্যমান এমন প্রশ্নে তিনি তুলে ধরেন, বিভিন্ন জেলায় বায়ু পরীক্ষা কেন্দ্রী স্থাপনের বিষয়টি। ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘অনেক কাজই হয়েছে, যদিও আমার সময় না। তবে প্রকল্পের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূর্নীতি কিংবা অস্বচ্ছতা যাই হোকনা কেনো, ক্রমেই বাড়ছে বায়ুদূষণ জনিত রোগীর সংখ্যা। প্রকল্প ঘিরে ফের অভিযোগ সাথে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘিরেও। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস শাকুর খান জানিয়েছেন, গেল কয়েকদিনে বায়ু দূষণের পরিমান খুব আশঙ্কাজনক। চলতি মাসে দূষণের চিত্র বিগত বারগুলোর তুলনায় ভয়াবহ। আর এই দূষিত বায়ুর কারণে ফুসফুস জনিত নানা জটিলতার দেখা দেয়। আর যাদের পূর্বেই এমন জটিলতা রয়েছে তারা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পরে। বর্তমানে দূষিত বায়ু সাথে করোনাভাইরাস সংক্রমণ রূপ নিয়েছে নতুন আতঙ্কে। এখনই ব্যবস্থা গ্রহন না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিবে।
-আরএম
















