আজ আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস: বিশ্বব্যাপী আরবি চর্চার ব্যাপক সম্ভাবনা

মাওলানা মুহিউদ্দীন ফারুকী ।। 

আরবি ভাষা কোরআন ও হাদিসের ভাষা। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) এ ভাষায় কথা বলেছেন। আল্লাহ আরবি ভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও ভাষাবিদদের মতে আরবি ভাষা সর্বাধিক জীবন্ত ভাষা। বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও দ্রুত অগ্রসরমাণ ভাষা। এশিয়া-আফ্রিকার সেমেটিক ভাষাগোষ্ঠীর প্রাচীনতম ঐতিহ্যধারী শক্তিমান ভাষা হিসেবে আরবি চর্চিত হচ্ছে সহস্র বছর ধরে এবং পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে। ফলে অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, সংবাদ ও গণমাধ্যম সর্বক্ষেত্রে আরবির শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এসব বিবেচনায় এই ভাষার ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে তার বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক দিকও ভাবতে হবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যে শিক্ষার মান এখন বেশ উন্নত। বিশেষত ধর্মীয় বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চমূল্যের স্কলারশিপ দেয়। আরবি ভাষায় দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের ছাত্ররা অনেকেই সেখানে অংশগ্রহণ এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারছে না। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়াও কিং আবদুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়, কিং ফাহাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনারেল শিক্ষা অর্জনেরও সুযোগ আছে। আরবি ভাষায় পারদর্শী বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা চড়ামূল্য দিয়ে ইউরোপীয় ডিগ্রি অর্জনের পরিবর্তে এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্বমানের ডিগ্রি অর্জন করতে পারবে।

আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে সরকার, সম্মিলিত কওমি শিক্ষা বোর্ড হাইয়াতুল উলয়া ও মাদরাসা শিক্ষা পরিচালনা পর্ষদ (আলিয়া) বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য শ্রমিক, কর্মচারী ও ব্যবসায়ী মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছেন। সরকারি হিসাব মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ৬৩ থেকে ৬৫ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে শ্রমিক-কর্মচারীদের আরবি ভাষায় কোনো ধরনের যোগ্যতা ও দক্ষতা না থাকায় তাঁরা বিভিন্ন রকম অসুবিধার মুখোমুখি হন, নানা শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতারিত হন। ভাষাগত অদক্ষতার কারণে কখনো কখনো প্রাপ্য মজুরি বুঝে নিতে পারছেন না তাঁরা। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের আরবি ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব দেশের রেমিট্যান্স ও আর্তসামাজিক অবস্থার ওপর পড়ত। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের কর্মীরা সে সুফলটি ভোগ করছে। এ ছাড়া ভাষাগত দক্ষতা মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সামাজিক অবস্থানও উন্নত করতে পারে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য হাফেজ ও আলেম রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই সুন্দর ও মানসম্মত তিলাওয়াতের মাধ্যমে কাতারসহ বিভিন্ন আরব দেশে মুয়াজ্জিন ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাঁরাও যোগাযোগের ভাষা হিসেবে আরবি না শেখায় খুব বেশি সামনে অগ্রসর হতে পারছেন না। দু-একজন ছাড়া কেউ খতিবের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও আলেমদের জন্য আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরো ব্যাপক করতে পারে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন লেখাপড়া করার সুবাদে সরকারের প্রতি আরেকটি দাবি হলো মধ্যপ্রাচ্যে আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত ও দক্ষ কূটনীতিক নিয়োগ দেওয়া। এতে প্রবাসী সমস্যার সমাধান সহজ হবে। একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর অন্যতম বহুল প্রচলিত ও ক্রমপ্রসারমাণ আরবি ভাষার নানা অঙ্গনে বিচরণ করতে হলে আমাদের একটি সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : পরিচালক, মারকাযুল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ বাংলাদেশ

-এমএসআই