“তালাকের বিস্তার রোধে খতীব, ওয়ায়েজ ও সমাজের নেতৃস্থানীয়রা ভূমিকা রাখতে পারেন”

এনাম হাসান জুনাইদ ।।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ঢাকায় খুবই উদ্বেগজনকভাবে তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরটিতে বলা হয়েছে, এ বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঢাকায় বিবাহবিচ্ছেদ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই সময়ে দৈনিক ৩৯টি তালাকের ঘটনা ঘটেছে, অর্থাৎ প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি তালাক হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসাবে করোনা মহামারি থেকে সৃষ্ট আর্থিক সংকীর্ণতা ও মানসিক চাপের পাশপাশি সে সব বিষয়কেই বিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে যার কথা আলেমগণ সব সময় বলে এসেছেন।

সিটি করপোরেশনে আসা তালাকের আবেদনগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে, কারণ হিসেবে প্রায় সবই ছিল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’। স্ত্রীর করা আবেদনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভরণপোষণ না দেওয়া, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, অন্য নারীর সঙ্গে সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, পুরুষত্বহীনতা, ব্যক্তিত্বের সংঘাত। আর স্বামীদের আবেদনে স্ত্রীর বদমেজাজ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, সন্তান না হওয়া, অবাধ্য হওয়া, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী না চলাসহ বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষিত স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে তালাক বেশি হচ্ছে। এবং পুরুষের তুলনায় নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের ঘটনা ঘটছে বেশী।

এ বিষয়ে দেশের প্রখ্যাত ফকীহ আলেম ও সমাজচিন্তক মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, সংবাদে যা এসেছে তা দাপ্তরিক হিসাব। বাস্তবে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। নানা পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান, যা একটি সমাজের জন্য, বিশেষত মুসলিম সমাজের জন্য খুবই দুঃখজনক ও আশঙ্কাজনক। কারণ, বিবাহ-বিচ্ছেদের কুফল অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়।

বর্তমান সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ প্রবণতা দিন দিন কেন বাড়ছে?

বর্তমান সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ প্রবণতা দিন দিন কেন বাড়ছে? এ প্রশ্নের জবাবে সমাজবিজ্ঞানীরা সবাই যে কারণটির বিষয়ে একমত তা হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব।

এ বিষয়ে মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, হা, বাস্তবেই সমাজে  বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ার  প্রধানতম কারণ ধর্মীয় অনুশাসন মানার অভাব। এই ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, জীবন-দর্শন ও জীবনধারা, স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক, একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা, বিনয় ও ছাড়ের মানসিকতা- এই সবই ধর্মীয় অনুশাসনের অন্তর্র্ভুক্ত। এরপর পর্দা-পুশিদা রক্ষা, পরপুরুষ বা পরনারীর সাথে সম্পর্ক ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকা ইত্যাদিও বিশেষ ধর্মীয় অনুশাসন, যা পালন না করাও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবনতি ও বিবাহ বিচ্ছেদের  কারণ। পরিসংখ্যানও বিষয়টিকে সমর্থন করে। বলেন তিনি।

নারীপুরুষ উভয়ের উচিত তালাক থেকে দূরে থাকা

ইসলাম তালাকের বিষয়টি কিভাবে দেখে এ বিষয়ে মুফতি আবুল হাসান আবদুল্লাহর বলেন, ইসলামী শরীয়তে অতীব প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তালাকের অবকাশ রয়েছে, কিন্তু বিষয়টি পছন্দনীয় নয়। সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী বর্ণিত হয়েছে যে-

أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللّهِ الطّلَاقُ

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় হালাল হচ্ছে তালাক। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০১৮

সুনানে আবু দাউদে মুহারিব ইবনে দিছার রা.-এর সূত্রে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ বর্ণিত হয়েছে-

مَا أَحَلّ اللّهُ شَيْئًا أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطّلَاقِ

আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে তালাকের চেয়ে অপ্রিয় কোনো কিছু হালাল করেননি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৭৭

কাজেই তালাকের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। নারী-পুরুষ উভয়ের কর্তব্য তালাক থেকে দূরে থাকা। তালাক দেয়ার ক্ষমতা যেহেতু পুরুষের তাই পুরুষকে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারে খুবই সংযমী হতে হবে।

শরীয়তের নির্দেশনা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষায় প্রয়াসী হওয়া। তালাক ও বিবাহ-বিচ্ছেদের পর্যায়টি হচ্ছে সর্বশেষ পর্যায়, যা একান্ত অনিবার্য প্রয়োজনের স্বার্থেই বৈধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হতে পারে, ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে, তা নিজেরাই মিটমাট করে নেয়া চাই, যদি তা বড় আকার ধারণ করার আশংঙ্কা হয় তখন দুই পরিবার আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে।

নারীদের তালাক প্রবণতাটাকে ইসলাম কিভাবে দেখে?

বর্তমান জরিপে নারীদের মাঝে তালাকের প্রবণতা অধিক হওয়ার যে কথা উঠে এসেছে। এ থেকে একথা আবারও প্রমাণিত হয় যে, কুরআনে তালাকের অধিকার পুরুষের হাতে ন্যস্ত করার যথার্থতাও স্পষ্ট হচ্ছে।  ইসলাম স্ত্রীদেরকে ‘খোলা‘আ’র অধিকার দিয়েছে এবং স্বামী থেকে পাওয়া অধিকার বলে তালাকেরও ক্ষমতা দিয়েছে, যা আমাদের দেশের কাবিননামার ১৮ নং ধারায় উল্লেখ থাকে। সে ধারার গলদ ব্যবহার করেই নারীগণ পুরুষের চেয়ে ৩ গুণ বেশি তালাকের পথে হাঁটছে। এর থেকেই অনুমান করা যায় যে, যদি তারা সরাসরি তালাকের ক্ষমতা পেত তবে পরিস্থিতি আরো কত ভয়াবহ হত।

নারীদের মাঝে তালাক প্রবণতা বাড়ার কারণ হিসাবে মুফতি আবুল হাসান আবদুল্লাহ বলেন, ইসলামে যে সুসংহত জীবন-ব্যবস্থা রয়েছে, তার প্রতিটি অংশই অতি প্রয়োজনীয়। যে অংশই বাদ দেয়া হবে তার কুফল ভুগতে হবে। ইসলামে আয়-উপার্জন, জীবনমান ও জীবনধারার ক্ষেত্রে অল্পেতুষ্টির শিক্ষা দেয়া হয়েছে। জীবনের বাস্তব প্রয়োজন আর অবাস্তব প্রয়োজনের মাঝেও রেখা টেনে দেয়া হয়েছে। অল্পেতুষ্টির পরিবর্তে যদি সম্পদ ও প্রাচুর্যের মোহ তৈরি হয়, বাস্তব প্রয়োজন ছাড়াও নানা অবাস্তব প্রয়োজনের ভার কাঁধে তুলে নেওয়া হয় তখন অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তদ্রুপ ইসলামী শিক্ষায় পারস্পরিক হক রক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একে অপরকে কোনোভাবে-ই কষ্ট না দেওয়া, প্রত্যেকে অন্যের হক রক্ষায় সচেষ্ট থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। ইসলাম শুধু অধিকারের কথা বলে না, কর্তব্যের কথাও বলে। স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেরই রয়েছে কর্তব্য এবং অধিকার। নিজের কর্তব্য পালন আর অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হলেই সবার শান্তি আসতে পারে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, নারীর যেমন কর্তব্য আছে তেমনি অধিকারও আছে। একই কথা পুরুষের ক্ষেত্রেও। তাই পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়কে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং একে অপরের হক ও অধিকারের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

পারিবারিক শান্তির জন্য শুধু পরিবারকেন্দ্রিক ইসলামী অনুশাসনগুলোই নয়, সাধারণ অনুশাসনগুলো মেনে চলারও গুরুত্ব আছে। যেমন ধরুন, মাদকাসক্তিও অনেক পরিবারের ভাঙ্গনের কারণ। মাদক ইসলামী বিধানে হারাম। এটি দাম্পত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, সাধারণ বিষয়। কিন্তু এর প্রভাব পারিবারিক জীবনেও পড়ে এবং প্রকটভাবেই পড়ে।

দ্বিতীয়ত পরিবারের ভরণ-পোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুরুষের। কাজেই পুরুষ বাইরে উপার্জন করবে আর নারী ঘরে সংসার ও সন্তানদের আদব-তরবিয়ত ও প্রাথমিক লেখা পড়ায় সময়  দেবে- মৌলিকভাবে এটাই স্বাভাবিক পদ্ধতি। এর বিপরীতে নারী-স্বাধীনতা বা নারীর স্বাবলম্বিতার নামে নারীকে উপার্জনে বের করার যে সংস্কৃতি এর কুফল ইতোমধ্যে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। খোদ সমাজ-চিন্তকেরাই এখন স্বীকার করছেন যে, বিবাহ-বিচ্ছেদের এক বড় কারণ, নারী বাইরে বের হওয়া এবং পর-পুরুষের সাথে মেলামেশা। অথচ অন্য ক্ষেত্রে নারীর স্বাবলম্বিতার তথা বাইরের জগতে বিচরণের বর্তমান ধারার পক্ষে নারী-নির্যাতনের বিষয়টিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, এর দ্বারা নারী নির্যাতন তো কমছেই না, বরং বাড়ছে, একইসাথে সংসারও ভাঙছে। কাজেই গোড়া থেকেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একান্ত আর্থিক সমস্যা ছাড়া নারীদেরকে রোজগারের জন্য ঘরের বাইরে বের করবে না, বরং স্বামীরাই স্ত্রী-সন্তানের খরচাদির ব্যবস্থা করবে।

পরকীয়ার চোরাপথ রোধ করার উপায় কী?

এ সম্পর্কে এই বিদগ্ধ আলেম বলেন, বর্তমানে মহামারির মত ছড়িয়ে পড়া পরকীয়ার চোরাপথ রোধ করার প্রধানতম উপায়  নারী-পুরুষ উভয়ের পর্দার বিধান মেনে চলা। তাহলে পরকীয়া জাতীয় কিছু ঘটার কোনই আশংকা থাকবে না। যারা শরীয়তের এ গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি নিয়ে কটাক্ষ করে অথবা একে জটিল মনে করে তা পালনে বিরত থাকে, তাদের বিষয়টি ভাবা উচিত।

পর্দা বলতে শুধু সামনের মানুষটির সাথেই পর্দা নয়; বরং এ ডিজিটাল যুগে টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে পর্দা লংঘিত হয় এবং তাও এক সময় সংসার ভাঙার কারণ হয়ে থাকে। বিশেষতঃ ফেসবুক ইত্যাদির মত তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যে, বিশ্বব্যাপী কত সংসার ভাঙার কারণ ঘটেছে, কত শিশুকে তাদের মা-বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে তার সঠিক হিসাব হয়ত কোনো দিনই প্রকাশিত হবে না। মুসলমানরা এসব বিজাতীয় পথে হেঁটে আর কত নিজেদেরকে ধ্বংস করবে?

মনে রাখা দরকার, সমাজের আগে পরিবারের স্থান, তাই তথাকথিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটিয়ে পারিবারিক বন্ধনকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। যোগ করেন এই বিদগ্ধ আলেম।

তালাকের আগে অন্ততঃ দশবার ভেবে নিন

মুসলিম নর-নারীদের অনুরোধ করে এই বিদগ্ধ আলেম বলেন, যদি একান্ত সিদ্ধান্ত নিতেই হয় তবে ঠাণ্ডা মাথায় যথেষ্ট সময় নিয়ে তালাকের আগে অন্ততঃ দশবার ভেবে নেন। শালিশ-সমঝোতাসহ যাবতীয় পূর্ব-পদক্ষেপ বিফল হয়ে গেলে যদি তালাকের পথে যেতেই হয় তবে কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে তা করবে এবং কোনোক্রমেই এক তালাকে বায়েনের বেশি দিবে না; যেন পরে সংসার পুনর্বহালের সুযোগ থাকে।

পারিবারিক মর্যাদা, মূল্যবোধ, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নিজেদের দ্বীন ও ঈমানের হেফাজতের জন্য তালাকের বিষয়ে সংযমী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মসজিদের সম্মানিত খতীবগণ, ওয়ায়েযগণ এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞ লোকজন গণ-মানুষকে এসব বিষয়ে বোঝাতে এগিয়ে আসলে তা অধিক কার্যকরি হবে বলে আশা করা যায়।

সূত্র: মাসিক আলকাউসার

-এসএন