শৈশবের গ্রাম, গ্রামের শৈশব

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

এঁকেবেঁকে বহুদূর গিয়ে মিশেছে পথটি। দুধসাদা ধূলোকণা আর দুর্বাঘাসে ভরা তার বুক। কখনো লাল বরণ। যেন এক চিলতে রক্তিম আাকাশ কেটে জোড়া দেওয়া হয়েছে ওখানে। গ্রামের এই পথটি বুক উঁচিয়ে পেরিয়ে গেছে অনেক ফসলি জমি। কোথাও গিয়ে মিশেছে কোনো টিলার সাথে। কিংবা ঢুকে পড়েছে কোনো ঘন বনে। এরপর এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়েই আবার ছুটেছে তীব্র গতিতে। ছুটে গেছে যেন দূর-দিগন্তে!

ছোট বড় অসংখ্য চারাগাছ তার কোলে। প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠছে। বেড়ে উঠছে যুগ যুগ ধরে।

দিগন্ত-পিয়াসী দুটি ডাল নিয়ে একটি বটগাছ। মোটামোটা পাতা আর খসখসে চামড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে ছিল কয়েক যুগ আগেও।

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে সারি সারি তালগাছ। নীরবে চলছে তাদের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা। এপথের কোলেই তাদের স্থায়ী নিবাস।

একটি বৃদ্ধ শিমুল গাছ। ছোটবেলা দেখতাম, পুরো পথটা একাই আলোকিত করে রাখত। এখন গাছটি দেখে খুব মায়া হয়। মনে হয়, সে তার হারানো যৌবনের স্মরণে কাঁদছে। কী ভঙ্গুর তার অবস্থা। তবু প্রতি মওসুমে এক-দুটি ফুল ফোটে তার ডালে এবং আশ্চর্য! আগের চেয়ে বেশি রক্তিম থাকে তার পাপড়ি। বেদনায় নীল হয়ে যাওয়ার কথাইতো শুনে আসছি। বেদনায় লাল হওয়ার নজির দেখা যায় এখানে।

সামান্য এগিয়ে একটি মসজিদ ঘেঁষে পথটি চলে গেছে আরো উত্তরে। তারপর একটি আলিয়া মাদরাসা পেরিয়ে মিশেছে চৌরাস্তায়। সেখান থেকে ছুটেছে আরো অনেক দূরে, আমাদের গ্রাম ছাড়িয়ে..। আজও জানতে পারিনি তার শেষ কোথায়।

অসংখ্য স্মৃতি-বিজড়িত এই পথ। গরুর গাড়ি নিয়ে, লাঙল-জোয়াল নিয়ে ছুটে চলা কত পথচারী এপথের। আজ তাদের মাঝে অভাবনীয় পরিবর্তন। অকল্পনীয় ছন্দপতন। ইট পাথরের দালানে বসে আজ আমি সেই ছন্দপতন দেখতে পাই। পরিবর্তন অনুভব করি।

সন্ধ্যারাতে ‘জোনাকিহীন’ আলোকিত পথে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই দূর অতীতে। যেখানে তারাভরা আকাশ আর জোনাকিভরা গ্রাম। মিটিমিটি করে আলো জ্বলছে। আর জ্বলে-নিভে খেলা করছে পুরো পথজুড়ে। অন্ধকার রাতে সে আলো ছায়া ফেলে স্মৃতির পাতায়। ঝলমলিয়ে উঠে আরো দূর অতীত।

ঘন পৌষ। ঝিম ধরে আছে কাঁচা সকাল। সূর্যের তাপ প্রখর হতে গিয়েও পারছে না। এরপর এভাবেই ঢুকে পড়ছে দুপুরের সীমানায়। দুপুর গড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যায়। কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতে পারছে না রাতের কোলে। থেমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে রেশমী কুয়াশায়। কিছুক্ষণ পর সেই কুয়াশা ঘন হয়ে সন্ধ্যাকে রাতে পরিণত করছে।

উঠোন আঙিনায় দেখতাম ধানের ছড়াছড়ি। সম্ভবত বুরো ধান। সন্ধ্যার পর আম-কাঁঠালের লাল আগুন জ্বেলে সেদ্ধ করা হতো সেই ধান। চারপাশে বিচ্ছুরিত হতো হালকা ওম। সে ওম পেয়ে শিশুরাও বেরিয়ে আসত ঘর থেকে, ধীর পায়ে লুকিয়ে লুকিয়ে। ধানের ডেকে পুরে রাখত কাঁচা জলপাই। কেউ বা কাঁচা ডিম। আবার ডেক নামানোর আগেই এক ফাঁকে এসে তুলে নিত সেদ্ধ জলপাই, সেদ্ধ ডিম। এসব দৃশ্য এখন যেন মিশে গেছে ইট-সিমেন্টের দেয়ালে। শক্ত কংক্রিটে।

হারিয়ে গেছে ঘটা করে পিঠা তৈরির দৃশ্যও। তখন খালারা আসতেন। বাড়ি ভরা থাকত মেহমানে। বোনেরা সাহায্য করত আম্মুকে। গভীর রাত পর্যন্ত চলত গল্প আর পিঠে তৈরি। সেদিন পড়ালেখায় কিছুটা ছাড় পেতাম। অন্যদিনের মতো চোখে ঘুমও আসত না সেদিন। রূপকথার গল্প, জিন পরীর গল্প এবং ভূতের গল্প শুনতাম দীর্ঘরাত। তবে বড় জেঠি শোনাতেন নবীদের গল্প। সাহাবাদের গল্প। জেঠির গল্প শুনে বড় আপুর চোখ ভিজে উঠত। ওর জন্যে খুব মায়া হতো তখন।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙত ঘনরসের মিষ্টি সুবাসে। দুধে ভেজা পিঠের স্বাদে। কামরাঙ্গা গাছে টিয়ে পাখি সেদিনও গান করত, উল্লাস করত। ফুলেরা ফোটত ঘরের পেছনে, ছোট্ট বাগানে। তারার মতো বেলী ফুল, লাল টুকটুকে রক্তজবা, ফুলকুমারী গন্ধরাজ- সবই ফোটত। শিশিরের আশীর্বাদে জেগে উঠত ঝুমকো জবা। বারান্দার ছাদে বিছিয়ে থাকত কাগজফুল। শুধু আমার আগ্রহ থাকত না সেদিন। রসের গন্ধ আমাকে খুব টানত। তাই বাগানের কাছে যাবার কথা বেমালুম ভুলে যেতাম।

এসব কিছু আজ শুধুই স্মৃতি। বাতাসে দুলতে থাকা সরষে ক্ষেত। যেন তরঙ্গায়িত হলদে সাগর। কচি কচি মরিচের চারা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ধনিয়া গাছ ও তার সাদা ফুল। সবকিছু আজ কল্পনা। শুধুই কল্পনা। আমার গ্রাম। আমার হলদে সাগর। আমার ফুল বাগান। আজ শুধুই স্মৃতি।

-এসএন