আসামে দ্বীনি মাদরাসা ধ্বংসের আইন: এখনই সময় জেগে ওঠার

মাসুম ‍মুরাদাবাদী ।।

এটা দিনের আলোর ন্যায় উজ্জ্বল বাস্তবতা যে, দ্বীনী মাদরাসাসমূহ ভারতবর্ষে ইসলামের অস্তিত্ব এবং ধারাবাহিকতা রক্ষার একমাত্র মাধ্যম। এ মাদরাসাগুলো হতে দ্বীনী শিক্ষার যেসব মশাল প্রজ্জলিত হয়েছে, গোটা উপমহাদেশকে তা আলোকিত করেছে। ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে বিদ্যমান এসকল মাদরাসা হতে ফারেগ ওলামায়ে কেরাম এবং সম্মানিত মুফতীগণ শুধু যে দ্বীনি রাহনুমায়ী ও দিকনির্দেশনার দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন তা নয়; বরং ইসলামের সুমহান পতাকা সমুন্নত রাখার খেদমতও করে যাচ্ছেন অবিরত।

একথা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না যে, এ দেশে ইসলাম প্রসারে এসব মাদরাসা মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। আর সে কারণেই ইসলামের প্রচার-প্রসারে ভীত সাম্প্রদায়িক এবং ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলো বহুদিন ধরে মাদরাসা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে মেতে আছে। যেদিন থেকে ভারতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার ভারতের ক্ষমতায় এসেছে তখন থেকে এধরনের অপপ্রয়াসের গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নিজেদের এজেণ্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত ফাণ্ড এবং চাঁদার ওপর নির্ভরশীল মাদরাসাসমূহের ওপর জোর খাটাতে না পেরে এখন সরকার ওইসব মাদরাসা এবং মক্তব ধ্বংসের কার্যক্রম আরম্ভ করেছে যেগুলো সরকারি সহায়তায় পরিচালিত হয়।

এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ সর্বাধিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য আসামে নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে আসাম অ্যাসেম্বলিতে এমন একটি বিল পাস করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি সহায়তায় পরিচালিত মাদরাসাসমূহকে এক ধাক্কায় বন্ধ করে দিয়ে সেগুলোকে স্কুলে পরিবর্তন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (৩০ ডিসেম্বর) একটি আইন পাশ করে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ৭০০ মাদরাসা বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

আসাম রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা মাদরাসা বন্ধের এ বিলটি সংসদে উপস্থাপন করে যেকথা বলেছেন তা তাদের এজেন্ডা এবং মানসিকতার পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেছেন, সমস্ত মাদরাসাকে হাইস্কুল এবং মডেল স্কুলে রূপান্তরিত করা হবে। তিনি বলেছেন, আমাদের ভোটের প্রয়োজন নেই। এ গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের কোনো স্বার্থ সম্পৃক্ত নয়। আমরা রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে এ গোষ্ঠীকে ‘আধুনিক’ করতে চাই। যখন শিশুরা এই স্কুলগুলো থেকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হবে তখন আপনারা বুঝতে পারবেন।’

আসামের শিক্ষামন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্পর্কে বলার প্রয়োজন নেই যে, তিনি অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক মানসিকতার অধিকারী। পাঠকের স্মরণে থাকবে, ইতিপূর্বে যখন বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন এবং এনআরসির বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন চলছিল, তখন তিনি আসামে তথাকথিত (বাংলাদেশ থেকে) অনুপ্রবেশকারীদের নির্বাসন বা ডিটেনশন সেন্টারে প্রেরণের বিষয়ে সবচেয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতেন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি যদি মুসলমানদেরকে ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চান তাহলে তাদের জন্য মুসলিম বসতিতে নতুন স্কুল-কলেজ কেন খোলেন না? এই মাদরাসাগুলোকে ধ্বংস করতে কেন উঠে পড়ে লেগেছেন, যা মুসলমানদের দ্বীনী প্রয়োজনসমূহকে পূরণ করছে? যেসময় বিলটি সংসদে পেশ করা হয় তখন এর প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস এবং এআইইউডিএফ-এর সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। তারা এ বিলকে সিলেকশন কমিটির নিকট প্রেরণের দাবি জানান। কিন্তু সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া হয়। স্পিকার ভয়েস ভোট দিয়ে বিলটি পাসের সিদ্ধান্ত নেন। প্রচুর হট্টোগোলের মধ্যে বিলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা পাস করে দেওয়া হয়। বিজেপির জোট, আসাম গণ পরিষদ এবং বোডোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে।

আসামের শিক্ষামন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা আরো বলেছেন, তিনি কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নন। মৌলবাদের বিরোধিতা করা ইসলামের বিরোধিতা করা নয়। তিনি বলেছেন, কিছু মুসলিম সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানো কখনো ইসলামের প্রতি শত্রুতা হতে পারে না। ওইসময় তিনি ভারতের সংবিধানের স্থপতি ডঃ আম্বেদকরকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে, পাঠ্যক্রম ও সিলেবাসে ধর্মীয় নির্দেশনার কোনও স্থান নেই। তিনি একথাও বলেছেন, সরকারের খরচে কুরআনের শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই বিলটি কোনও সম্প্রদায়ের শত্রুতার ভিত্তিতে আনা হয়নি বরং তার উদ্দেশ্য, সমাজের একটি পশ্চাৎপদ ও শোষিত অংশকে উন্নীত করা এবং তাদের পশ্চাৎপদতা দূর করা।’

বাহ্যিকভাবে মুসলিম ছাত্রদের ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার বানানোর কথাটি এতই মনোমুগ্ধকর এবং আকর্ষণীয় যে, কেউ এর গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারে না। তবে এখানে মূল প্রশ্নটি হচ্ছে, কেন ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সরকার মুসলমানদেরকে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চায়? এ কাজের জন্য কথিত পশ্চাদপদ মুসলিম জনবসতিগুলিতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার স্কুল চালু করে এই প্রয়োজনীয়তা পূরণ করা যেতে পারে। আসলে, আধুনিক শিক্ষার আড়ালে এই মাদ্রাসাগুলি বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্য হ’ল, দেশের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং মুসলমানদের তাদের ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করা, যা সরকারী মাদ্রাসা দিয়ে শুরু হয়েছে। এর সমূহ আশঙ্কা রয়েছে যে সরকারী অনুদান প্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলি এখন লক্ষ্যবস্তু হবে।

ভারতজুড়ে এ জাতীয় মাদ্রাসার সংখ্যাও কম নয়। ভারতের প্রতিটি প্রদেশে এমন মাদ্রাসা রয়েছে যারা শিক্ষকদের বেতন সরকারের কাছ থেকে নিয়ে থাকে। এবং এই বেতনগুলি দেওয়া হয় কারণ, এই ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলি সীমিত সাধ্যের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণের সরকারী লক্ষ্য পূরণ করছে। ভারতে নিরক্ষরতার হার খুব বেশি এবং যদি কেউ এটিকে নির্মূল করার চেষ্টা করে তবে তারা সরকারি সহায়তা পাওয়ার হকদার। এক্ষেত্রে মাদ্রাসার ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক। কোন সরকারী অবকাঠামো ছাড়াই বেসিক শিক্ষা সর্বজনীন করা এক বিশাল কাজ, যা সারা ভারতে দ্বীনী মাদরাসাসমূহ আঞ্জাম দিচ্ছে। দেশের অন্য কোনও সম্প্রদায়ের নিকট এ জাতীয় কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নেই। এজন্যই অনেক সরকারী রিপোর্ট মাদ্রাসাগুলির এই দুর্দান্ত সেবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

আসামের নতুন আইন বিদ্যমান দুটি আইন বাতিল করার জন্য আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৫ এর আসাম মাদ্রাসা শিক্ষা আইন এবং ২০১৮ সালের মাদ্রাসা চাকরি সংক্রান্ত আইন। আসামে বর্তমানে দুই ধরণের সরকারী মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৮৯ টি মাদ্রাসা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়াও, ৫৪২টি মাদ্রাসা রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রয়েছে। যাকে প্রি-সিনিয়র, সিনিয়র এবং আরবি কলেজ বলে। প্রদেশ সরকার নতুন আইনের আওতায় রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডকে বিলুপ্ত করতে চলেছে। এই মাদ্রাসাগুলিতে যে সকল শিক্ষক দ্বীনি শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তাদের অন্যান্য বিষয় পড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং এখন তারা কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকবে। এই ক্ষেত্রে ‘ভারসাম্য বজায় রাখতে’ সরকার এটুকু কাজ অবশ্যই করেছে যে, প্রদেশে চলমান সংস্কৃত পাঠশালাগুলিকে এখন স্টাডি সেন্টার, গবেষণা কেন্দ্র বলা হবে। তবে তাদের পাঠ্যক্রম এবং উদ্দেশ্য একই থাকবে।

মাদ্রাসা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির চিন্তাভাবনা কারও কাছ থেকে গোপন নয়। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা এই মাদ্রাসাগুলিকে সন্ত্রাস প্রচারের ঘাঁটি এবং মুসলমানদেরকে উগ্রপন্থীকরণ কেন্দ্র বলে অভিহিত করে আসছে। এই অযৌক্তিক প্রচারের একমাত্র উদ্দেশ্য মাদ্রাসাগুলিকে বদনাম করে তার অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। এর পিছনে যে বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রটি চলছে তা হল, কোনওভাবে এই ভারত থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে ফেলা। মাদ্রাসাগুলি যেহেতু ইসলামের দুর্গ বলে অভিহিত করা হয়, তাই এগুলি ধ্বংস করে আধুনিক শিক্ষার বিদ্যালয়ে পরিণত করার কাজ শুরু হয়েছে।

এটা খুব কম মানুষই জানে যে, আরএসএসের উপ-সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় মুসলিম মঞ্চের’ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড নামে একটি মাদ্রাসা তদারকিকারী একটি শাখা রয়েছে।  শাখাটি যে সকল মাদ্রাসা যে কোনও ধরণের সরকারী তহবিল গ্রহণ করে তার উপর গভীর নজর রাখে। রাষ্ট্রীয় মুসলিম মঞ্চের কাছে সারাদেশে মাদ্রাসাগুলির একটি তালিকা রয়েছে এবং এ সংগঠন খুব নিবিড়ভাবে এ মিশনে কাজ করছে। আসামে সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলি ধ্বংস করে ফেলার কাজ এই সংস্থার নির্দেশেই করা হয়েছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের জাগ্রত হওয়ার সবচে উপযুক্ত সময় এখন। কারণ বর্তমানে দ্বীনি মাদ্রাসাগুলিকে বিদ্যমান পাঠ্যক্রমের সাথে তাল মিলিয়ে কায়েম রাখা অত্যন্ত জরুরি।

ভাষান্তর: সাইফ নূর