কচুয়ার রহিমা নগর: দেখে এলাম নির্যাতনের শিকার শিক্ষকের বাবার অশ্রু

রায়হান মুহাম্মদ।।

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সাতবাড়িয়ায় তালিমুল কুরআন নামের একটি মাদরাসার একজন শিক্ষকের উপর শিশু নির্যাতনের (বলাৎকার) অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে মাদরাসার সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে নিদোর্ষ প্রমাণিত হন ওমর ফারুক নামের সেই কুরআনের হাফেজ শিক্ষক।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি তোলে একই মাদরাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র আবু বকর। সেই শিক্ষার্থীর অভিযোগের ভিত্তিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ওমর ফারুক নামের সেই কুরআনের হাফেজ শিক্ষকের উপর অমানষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের সময় ছাত্রদের সামনেই সেই শিক্ষকের বুকে আঘাত করা হয়। এছাড়া অপমানজনকভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে তার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়।

প্রতক্ষ্যদর্শীরা বলছেন, শিক্ষকের ওপর অমানষিক নির্যাতনের ভয়াবহতায় আঁতকে ওঠে সেখানে থাকা শিশু শিক্ষার্থীরা; কিন্তু উশৃঙ্খল কিছু মানুষের পৈচাশিকতার সামনে শিক্ষকের জন্য কিছু করতে পারেনি কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা।

হাফেজ ওমর ফারুকের ওপর এই অমানষিক নির্যাতন চালানোর সময় মাদরাসায় উপস্থিত ছিলেন না মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা হোসাইন আহমেদ।

ঘটনার কথা জানতে পেরে মাওলানা হোসাইন আহমেদ বারবার ফোন মারফতে অভিযোগ তোলা শিক্ষার্থীর বাবা ও আত্মীয়দের অনুরোধ করেন তিনি মাদরাসায় উপস্থিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। অভিযুক্ত শিক্ষক বাস্তবেই অপরাধী প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তির হাত থেকে কোনভাবেই বাঁচানো হবে না বলে আশ্বস্তও করেন তিনি।

কিন্তু কেউ শোনেননি মাওলানা হোসাইন আহমেদের কথা। সিনায় কুরআন ধারণকারী একজন হাফেজে কুরআনের প্রতি দেখানো হয়নি ন্যূনতম শ্রদ্ধা। করা হয়েছে অশালীন ভাষার ব্যবহার আর অকথ্য নির্যাতন। দুর্ঘটনার সময় সহকর্মীকে রক্ষা করতে গিয়ে আহত হন মাদরাসায় উপস্থিত বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

একজন শিক্ষক। যিনি আদর্শ সমাজ নিমার্ণের কারিগর- অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলেও মাদরাসার মুহতামিম ও সহকর্মীদের বারবার করা অনুরোধের পরেও তাকে আত্মপক্ষ প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। এর পেছনে মূলত ইসলাম ও কওমীপন্থী আলেমদের বিরুদ্ধে অন্তরে পোষণ করা বিদ্বেষ কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা। তার প্রমাণ হিসেবে তারা সেই শিক্ষকের ওপর নির্যাতন ও মাদরাসায় ভাঙচুরের এক পর্যায়ে হামলাকারীদের মুখে ‘ ওহাবীদের আস্তা ভেঙ্গে দাও’- জাতীয় শ্লোগানকে পেশ করেছেন।এছাড়া মাদরাসা ভাঙচুরের অপরাধে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরও জড়িত থাকার কথা জানা গেছে।

কচুয়া সাতবাড়িয়ার তালিমুল কুরআন মাদরাসায় সরেজমিন ঘুরে এসেছেন লেখক আলেম মাওলানা সাইমুম সাদী। ঘুরে এসে তিনি বলছেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং পরিকল্পিতভাবে একটা মাদ্রাসা ভাঙচুর এবং একজন হাফেজে কুরআন শিক্ষকের গায়ে হাত তুলেছে কতিপয় সন্ত্রাসী। মেরে আহত করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন এই নিরপরাধ কুরআনের শিক্ষক বিনা দোষে জেলে আছেন।

সেদিন উপস্থিত বেশ ক’জন শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে কথা বলে জানলাম তারা বারবার অনুরোধ করেছেন সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার জন্য কিন্তু পাষণ্ডদের মন গলেনি।

তাদের চোখের সম্মুখে তাদের উস্তাদকে কিছু গুন্ডাপান্ডা মেরে রক্তাক্ত করেছে, এই ভয়াবহ দৃশ্য সম্ভবত সারাজীবন তারা বয়ে বেড়াবে বুকের ভেতরে।

মাদ্রাসায় ছাত্র শিক্ষকদের সান্ত্বনা দিয়ে হাফেজ ওমর ফারুক, যাকে নির্যাতন করে জেলে দেওয়া হয়েছে তার বাড়িতে যখন যাই, রাত তখন ৯ টা। গ্রামে ৯ টা মানে গভীর রাত। ওমর ফারুকের পিতা এবং ছোটভাই বেরিয়ে এলেন ভেতর থেকে। ছোট ভাই নিজেও একজন হাফেজে কুরআন। বাবা বয়োবৃদ্ধ। ওমর ফারুক এখনো বিয়ে করেনি।

বাবা জানালেন, নিজেদের ঘর নেই, ওমর ফারুকের মামাদের পক্ষ থেকে একটা ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে অস্থায়ী ভিত্তিতে। বৃদ্ধ বাবা কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে। বললেন, আমি মনে করেছিলাম আমাদের আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই। আপনাদেরকে দেখে মনে হলো আমাদেরও খোঁজ নেওয়ার কেউ আছে।

তিনি বলছেন, আমরা যখন কচুয়ার রহিমা নগর মাদ্রাসায় ঢুকলাম ছাত্রদের চোখে মুখে ভীতির ছাপ লক্ষ করলাম। আমরা তাদের বললাম, তোমাদেরকে দেখতে এসেছি। নিস্পাপ চেহারার কুরআনের এই শিশুদের চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো নি:শব্দে। উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম । বুঝতে অসুবিধা হল না কতটুকু ট্রমার ভেতর দিয়ে এই শিশুদের সময় পাড়ি দিতে হয়েছে।

মাওলানা সাইমুম সাদীর সাথে রহিমা নগরে গিয়েছিলেন ক্বারি নাজমুল হাসান, মাওলানা আবদুল গাফফার, মাওলানা হাসান চৌধুরী, হক নেওয়াজ মুরশেদ সহ কয়েকজন উলামায়ে কেরাম।

মাওলানা সাইমুম সাদী বলেছেন, এখন হাফেজ ওমর ফারুককে জেল থেকে বের করা জরুরি।

লেখক এই আলেমের ভাষায়, বিচ্ছিন্ন কিছু দুর্ঘটনা সব জায়গায় ঘটে; কিন্তু শতকরা আশি ভাগ বলাৎকারের অভিযোগ মিথ্যা হয়ে থাকে। কচুয়ার ওই মাদ্রাসায় যদি সিসিটিভি ফুটেজ না থাকত তাহলে ওই একটি ঘটনা দিয়ে কওমি অঙ্গন নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠতো একটি মহল ও মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো। হাফেজ ওমর ফারুকের ঘটনায় যার প্রমাণ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে বলছেন তিনি। কারণ, প্রাথমিকভাবে হাফেজ ওমর ফারুক দোষী অভিযুক্ত হলে সে খবর ফলাও করে প্রচার করে মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলো। কিন্তু সিসি টিভি ফুটেজ দেখে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর আর কেউ এটা নিয়ে সংবাদ প্রচার করছেনা।

তিনি বলছেন, মাদরাসাসহ যেখানেই শিশু নির্যাতনের (বলাৎকার) ঘটনা ঘটবে তার তীব্র নিন্দা জানাই আমরা এবং এর সঠিক বিচার দাবি করি; কিন্তু মাদরাসাগুলো নিয়ে মিথ্যা ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করা মাদরাসা বিরোধী বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ। কারণ এই প্রজন্মের আলেম-সমাজের বিরুদ্ধে রাজাকারের অভিযোগ ধোপে টিকবে না, তাই দ্বীনের অতন্দ্রপ্রহরী মাদরাসাগুলোকে বিতর্কিত ও ধর্মপ্রাণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে এ এক নতুন ফন্দি।

তিনি বলছেন, কচুয়ার সেই মাদরাসায় সিসিটিভি থাকার কারণে আমরা জোর গলায় প্রতিবাদ করতে পারছি; কিন্তু যেসব জায়গায় সিসি ক্যামেরা নেই সেখানে এমন অভিযোগ তুললে ঘটনা মিথ্যা হলেও আমাদের কিছু করার থাকবে না। তাই মাদরাসাগুলোতে সিসি ক্যামেরার ব্যবহার অনেকটাই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে বলে মত দিচ্ছেন তিনি।

তবে লেখক আলেম মাওলানা সাইমুম সাদী বলছেন, ষড়যন্ত্র যত গভীরই হোক না কেনো, সবাই সক্রিয় ও সতর্ক থাকলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কচুয়ার সেই ঘটনায় প্রাথমিকভাবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শিক্ষক ওমর ফারুক নির্দোষ প্রমাণিত হলেও অধিকতর নিশ্চিত হবার জন্য অভিযোগ তোলা ছাত্র এবং এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের ডিএনএ টেস্ট করাতে দেওয়া হয়েছে ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এলেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে নেয়া হবে। মামলা তুলে নেয়ার ব্যয়ভার বহন করতে রাজি আছে অভিযোগ তোলা ছাত্রের বাবা তৌহিদুল ইসলাম।

নির্দোষ একজন হাফেজে কুরআন। অমানষিক নির্যাতন ও অপমান করা হয়েছিল যাকে আত্মপক্ষ প্রমাণের কোন সুযোগ দেওয়া ছাড়াই। তার বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা মামলা তুলে নিলেই কি ফিরিয়ে দিতে পারবেন দুবৃত্তরা তার সম্মান, সেই দুঃসহ স্মৃতি কি কখনো ভুলতে পারবেন হাফেজ ওমর ফারুক!-এমন প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে  অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীকে।

-এনটি