ইমাম-মুক্তাদি সম্পর্ক: দুঃখজনক কত কিছু ঘটে থাকে দুনিয়ায়!

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

শুনেছি পৃথিবীর অনেক দেশেই নাকি নির্ধারিত সময়ে সবকিছু হয়। সভা-সেমিনার, ছোট-বড় কোন অনুষ্ঠান, বিভিন্ন অধিবেশন, লঞ্চ-গাড়ি ছেড়ে যাওয়া, বিমান উড্ডয়ন করা ইত্যাদি সব নির্ধারিত সময়েই হয়। বাংলাদেশের বেলায় যা অনেকটাই ব্যতিক্রম। বাংলায় তো প্রবাদই আছে, ‘৯টার গাড়ি কয়টায় ছাড়ে!’ অর্থাৎ গাড়ির নির্ধারিত সময় নয়টায় হলেও কয়টায় ছাড়বে তা নির্ধারিত নয়!

তবে বাংলাদেশে একটি কাজ প্রায় ৯৯ ভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে হয়ে থাকে। যা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ কেউ হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবে না। দৃশ্যটি দেখার জন্য হাজির হতে হবে মুসলমানদের হৃদয়ভূমি মসজিদে। সেখানে গেলে দেখা যাবে শীত কিংবা গরমে, ব্যস্ততায় কিংবা অবসরে, উৎসবময় দিনরাত কিংবা সাধারণ সময়ে—নির্ধারিত মুহূর্তেই নামায আরম্ভ হচ্ছে।

ঠিক ভোর ৬ টা ১০ মিনিটের ফজর ছয়টা দশেই শুরু হচ্ছে। রাত ৮ টা ৪৫ মিনিটের এশা শুরু হচ্ছে ঠিক আটটা পঁয়তাল্লিশেই। আমার মনে হয় পুরো দেশে—শহরে, মফস্বলে, গ্রামে, পাঞ্জেগানা ছোট মসজিদে কিংবা সুবিশাল জামে মসজিদে, সবখানেই নির্ধারিত সময়ে নামায শুরু হয়। নামাযের এই জামাতে সময়ের যতটা গুরুত্ব বজায় রাখা হয়, পুরো দেশের অন্য কোন কাজে হয়তো ততটা বজায় রাখা হয় না। তার কারণ যাই হোক না কেন, বাস্তবতা যে এটা, তাতে আশা করি কারও দ্বিমত প্রকাশের সাহস নেই।

মসজিদের নামাযে সময় রক্ষার এই বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসার এবং আনন্দের। কিন্তু এর মাঝেও দুঃখের একটা অংশ আছে।

তার আগে বলে নেই, জামাতের নামাযে যিনি সবার সামনে থাকেন তাঁকে বলে ইমাম। ইমাম হওয়ার এই কাজটিকে সহজে বলে ইমামতি। এই ইমামতি খুবই সম্মানজনক একটি খেদমত। অত্যন্ত সওয়াবের একটি আমল। মুমিনের শ্রেষ্ঠ ইবাদত-নামাযে যিনি সবার সামনে থাকেন এবং প্রকৃত অর্থেই সবার নেতৃত্ব দেন, তার সম্মান পরিমাপ করা কী সম্ভব? তিনি তো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সকল মুসল্লিদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি। এই সম্মান দুনিয়ার আর কোন কাজে আছে? কোথাও আছে?

তবে আমাদের সমাজ সেই মর্যাদা বুঝে না, সত্য। সেই মর্যাদা দিতেও পারে না, সত্য। সেই মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির সাথে অবমাননাসুলভ কোন আচরণ যে অমার্জনীয়, সে কথাও সত্য!

মসজিদে যারা নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত আসেন, তারা এ সমাজেরই লোক। এ দেশেরই বাসিন্দা। তারা এ সমাজের হাল হাকিকত সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। এ দেশে কয়টা কাজ নির্ধারিত সময়ে হয়, তারা জানেন। এ সমাজে যথাসময়ের কী পরিমাণ গুরুত্ব, তারা বুঝেন। তবুও…

উদাহরণস্বরূপ, যোহর নামাযের নির্ধারিত সময় সোয়া ১ টা। অর্থাৎ সোয়া ১ টায় মসজিদে যোহরের জামাত শুরু হবে। এবং এ সময়ই নিয়মিত শুরু হয়ে থাকে। প্রতিদিন ঠিক সময়ে জামাত শুরু করার নেতৃত্ব যিনি দেন তিনিও একজন মানুষ। হঠাৎ কোনদিন কোনও কারণে তার এক দুই মিনিট দেরি হতে পারে। অযু করতে একটু বিলম্ব হতে পারে। সুন্নত সমাপ্ত হতে একটু দেরি হতে পারে। এটা হতেই পারে। যে কারোই তো হয়।

কিন্তু ইমাম সাহেবের একদিন বা কোনওদিন একটু দেরি হলে মুসল্লিদের কী অবস্থা হয়? অত্যুচ্চ মর্যাদার অধিকারী ইমাম সাহেবের কেমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়?! এসব দৃশ্য কি সবার চোখেই কমবেশি পড়ে?

সেদিন এক মসজিদে এশার জামাতে অংশগ্রহণ করলাম। জামাতের নির্ধারিত সময় ছিল ৮ টা ৪৫ মিনিট। মসজিদে বেশ কয়েকটা ঘড়ি। তন্মধ্যে মেহরাবের দুই পাশে দুটি ঘড়ি ডিজিটাল। যাতে আলোর রেখা দিয়ে সময় আঁকা। তাতে সেকেন্ডের সংখ্যা দেখা না গেলেও ঘণ্টা ও মিনিটের সংখ্যা দেখা যায়।

খেয়াল করলাম, সেই ঘড়িতে যখন ৮ টা ৪৪ বাজে, তখনই অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে গেছে। কেন দাঁড়িয়েছে ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না। তাদের মাঝে কি নামায শুরু হওয়ার আগ্রহ নাকি কোনকিছুর তাড়া—অনুমান করা যাচ্ছিল না। ১ মিনিট পর ঘড়ির আলোতে বাজে ৮ টা ৪৫। এবার আরও কিছু মুসল্লি দাঁড়িয়ে গেল। এবং ইমাম সাহেবের সন্ধানে এদিক সেদিক তাকাতে লাগল। তখনও বুঝা যাচ্ছি না যে, নামাযের প্রতি তাদের তীব্র আগ্রহ না কোন তাড়াহুড়া। ঘড়ির আলোয় দেখা গেল ৮ টা ৪৬। এবার তো একটু একটু আওয়াজও শোনা গেল। বিষয় : ‘ইমাম কোথায়? দেরি করছে কেন?’

হঠাৎ আমাদের কাতার থেকেই একজন বললেন, “একটু বসেন, ইমাম সাহেব তো আসবেনই।” তাঁর মুখ থেকে আওয়াজটুকু বের হওয়া মাত্রই দেখলাম কতগুলো চোখ যেন মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে নিল। “দৃষ্টিবাণ” বোধহয় এমন দৃষ্টিকেই বলে। এই দৃষ্টিকে “ঝাঁঝাঁলো দৃষ্টি ” বললেও বোধহয় ভুল হবে না। তীব্র কড়া দৃষ্টিতে যেন সবাই তাকে শাসালো।

ঘটনার আকস্মিকতায় আমি সত্যি সত্যিই বাকরূদ্ধ এবং ”অনুভূতিরূদ্ধ” হয়ে গেলাম।  আশ্চর্য! এই মানুষগুলোই তো নামাযের অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ! মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এখন তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাযে দাঁড়াবে। ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, শ্রেণি-পেশা এবং উঁচু-নিচু সব ভেদাভেদ ভুলে তারা একাকার হয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সম্মানিত মুসল্লির হিতকামনাসুলভ আবেদনকে তারা এভাবে অসম্মান করল! এভাবে দৃষ্টিবাণে তাকে আহত করতে চাইল! মসজিদের মতো স্থানে এবং নামাযের ঠিক আগমুহূর্তে!? কষ্টে ভিতরটা কেমন যেন বোবা হয়ে গেল। ঠিক এমন সময়ই দেখলাম, সেই মুসল্লির দৃষ্টি হঠাৎ আমার দিকে ফিরছে। আমিও দ্রুত দৃষ্টি ফিরালাম তাঁর দিকে। দেখলাম, কওমের কল্যাণী মুখটি কেমন হাসি হাসি। আমিও মুচকি হাসলাম। আমার হাসি দেখে তিনি আরেকটু হাসলেন মনে হলো। তাতে এত ভালো লাগল যে, একটু আগের কষ্টটুকু যেন কোথায় উবে গেল। হৃদয় গভীরে কেমন কোমলতা ছড়িয়ে পড়ল।

নামাযের পর আবার ভাবলাম দৃশ্যটির কথা। নিজেই নিজেকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করলাম বারবার। কেন মানুষগুলো এমন আচরণ করল? কেন সবাই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল? কিসের এত তাড়া তাদের? নামাযের পর তো দেখা যায় তারাই রাস্তার ধারে খোশগল্প করছে। তারাই তো চা আড্ডায় কত ঘণ্টা মিনিট খুইয়ে থাকে। এক মিনিটের বিলম্বে কেন তারা এত অস্থির? দুনিয়ার অন্য কোনো কাজেও তো দেখা যায় না তাদের এই তাড়াহুড়া! এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়েছিল! এতগুলো মানুষ নামাযের ব্যাপারে সময় রক্ষা করতে আগ্রহী? তাহলে সময়ানুবর্তীতার এই চর্চা কেন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে না?

একজন সম্মানিত মুসল্লির উপর কেন অমন কড়া দৃষ্টি ছিল তাদের? তারা কি তাঁর অপরাধ(!) পরিমাপ করে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল? এই অপরাধের (!) মাত্রা কতটুকু তাদের বিবেচনায়? ইন্নালিল্লাহ।

-এমএসআই