মার্কিন কূটনীতি: ধমক দিয়ে বিচার উল্টানোর কসরত!

শরীফ মুহাম্মদ।।

পশ্চিমা দেশগুলো বড় বড় মূল্যবোধের ইজারাদারি নিজেদের হাতেই রাখে। দরকার হলে অন্যদের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়, দরকার হলে নিজেরা নিজেদের মতো ব্যবহার করে। তখন আর মূল্যবোধের দেয়াল-সীমানা কিছুই ঠিক থাকে না।

সম্প্রতি পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়ে নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আদালতের রায়, বিশেষত কোনো একটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এভাবে ক্ষুব্ধ ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ব্যাপারটি কোনো মতেই হালকা কোনো ব্যাপার নয়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী অধিকার ও সমতার স্লোগান দিয়ে এসব প্রভাবশালী দেশ যতটা সোচ্চার, আদালতের রায়ের প্রতি ‘প্রশ্নহীন শ্রদ্ধা’ নিয়েও ঠিক ততটাই উচ্চকণ্ঠ। আদালতের রায়ের প্রতি ‘শ্রদ্ধা’ জানানোর বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবেই কেবল তারা উঁচু গলায় কথা বলেন না, বরং তাদের প্রভাবিত মিডিয়া ও সুশীল মহলগুলোও এনিয়ে গলা উঁচু করেই রাখে। সেই তারাই তাদের মন মর্জির বিরুদ্ধে যাওয়ায় এখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় নিয়ে তীব্র ভাষায় কথা বলছে এবং এরায় উল্টে দেওয়ার জন্য সব রকম ‘দূতিয়ালি’ করছে।

মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চারজন পাকিস্তানীকে দেশটির আদালত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তি দেওয়ার পর নজিরবিহীন-ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে। গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিক পার্ল হত্যায় অভিযুক্ত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক আহমেদ ওমর সাঈদ শেখসহ আরও তিন জনকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারকের একটি প্যানেল।

গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন দেখলে বোঝা যায়, সেদিন থেকেই পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ হতে শুরু করে।

বৃহস্পতিবারই এমন রায়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ক্ষোভ জানায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রভাবশালী এই রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ধরনটা ছিল এমন যে, মার্কিন নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিংকেন এই রায়কে ‘পাকিস্তানসহ সবখানেই সন্ত্রাসবাদের শিকার মানুষগুলোর জন্য অপমানজনক’ বলে উল্লেখ করেন। বাইডেন সরকারের নয়া এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্য একটা অভব্য হুমকিও ছিল। সেসময় তিনি এ-ও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ওই মামলার মূল আসামি শেখের বিরুদ্ধে মামলা করতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত আছে।

না, আনুষ্ঠানিক আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া প্রকাশেই তাদের ক্ষোভ মেটেনি। কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় উল্টে দেওয়ার খায়েশও প্রকাশ পেয়েছে। পরদিন শুক্রবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশির সঙ্গে প্রথমবারের মতো ফোনে আলাপ করেন অ্যান্টনি ব্লিংকেন। কথোপকথনে আদালতের ওই রায় নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানান তিনি। তারা দুজনই অপহরণ ও হত্যার জন্য ওই চার অভিযুক্তের শাস্তি নিশ্চিতে ‘আলোচনা করেছেন’ বলে জানিয়েছে রয়টার্স। সবল ও দুর্বল দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘আলোচনা’ যে রায়টাকে প্রভাবিত করার নানা রকম আয়োজন ঘনিয়ে আনবে এটা প্রায় স্পষ্ট।

এখানে প্রসঙ্গত একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। বিষয়টি পাকিস্তানের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায়ের সঙ্গে জড়িত বলেই আমরা কথা বলছি না। একই সঙ্গে ওই দেশে একজন মার্কিন নাগরিকের ‘হত্যার অভিযোগে’ অভিযুক্ত আসামিকে উচ্চ আদালত থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু নয়। একটি স্বাধীন ও মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় নিয়ে প্রভাবশালী কোন রাষ্ট্রের এভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা এবং রায় উল্টে দেওয়ার হুমকি দেওয়া নিয়েই আমাদের মূল কথা। এখানে আমেরিকা এটাই করছে। এ ঘটনা এবং এ জাতীয় প্রবণতাকে আমরা সার্বভৌম কোনো রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার জন্য মারাত্মক অশনিসংকেত মনে করি।

সর্বোচ্চ আদালতের রায় নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চাপের নানা আলামত এখন পাকিস্তানে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। শনিবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ড্যানিয়েল পার্ল মৃত্যুতে অভিযুুক্ত পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক আহমেদ ওমর সাঈদ শেখসহ চার জনকে ছেড়ে দিতে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপিল করেছে দেশটির সরকার। শুক্রবারই নাকি এ আপিল আবেদন করা হয়েছে।

পাকিস্তানে পার্ল পরিবারের নিয়োগকৃত আইনজীবী ফয়সাল সিদ্দিকী ও এক সরকারি প্রসিকিউটর রয়টার্সকে জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায় পর্যালোচনার জন্য আপিল করেছে সিন্ধু প্রদেশের সরকার। প্রসিকিউটর ফয়েজ শাহ বলেন, ‘আমরা তিনটি রিভিউ পিটিশন দিয়েছি। যার মধ্যে চার জনকে ছেড়ে দেওয়ার রায় বাতিল এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক আহমেদ ওমর সাঈদ শেখের মৃত্যুদণ্ড বহালের আবেদন করা হয়েছে।’

দেখুন কাণ্ড। রায় ঘোষণার পর তিন দিনও পার হয়নি। আমেরিকার আক্রমনাত্মক প্রতিক্রিয়া, রায় পাল্টে দেওয়ার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দূতিয়ালি, বিচার বিভাগকে কোণঠাসা করতে ‘অর্থবহ ফোন- আলোচনা’, একদিনের মধ্যেই রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকারের আপিল, পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর হইচই-এসব কিছু দেখলে একটা বিষয় বেশ ভালভাবেই বুঝে নিতে পারবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোর মুখে উচ্চারিত মূল্যবোধের বড় বড় শব্দ ও শব্দাবলী ভেতরে যে কতটা ফাঁপা! এরা নিজেদের প্রয়োজনে স্লোগান বানায়, নিজেদের মর্জি মতো ব্যবহার করে। নিজেদের স্বার্থে প্রয়োজন উল্টে গেলে আবার এসব স্লোগানই মাটিচাপা দিয়ে রেখে দেয়।

আরো পড়ুন: পাক সুপ্রিম কোর্টে ওমর সাঈদের মুক্তির রায়: নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের

-এনটি