এশিয়া, আরব ও আফ্রিকায় গত দশ বছরের ১০টি সামরিক অভ্যুত্থান

মিয়ানমারে ক্ষমতা দখলের পর রাজধানীতে সেনাদের টহল

ইয়াহইয়া বিন আবু বকর নদভী ।।

আরব অঞ্চল, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় পৌঁছার একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে৷ যা সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক এমনকি অর্থনৈতিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম করে।

নীচে এমন কিছু অভ্যুত্থান উল্লেখ করছি, যা ১০টি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে:

এক. মায়ানমারের সেমা অভ্যুত্থান

২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারির সন্ধ্যায় হঠাৎ খবর পাওয়া যায় যে, সেনাবাহিনী মিয়ানমারে ক্ষমতা দখল করেছে এবং নির্বাচিত সরকার অং সান সূচীকে গ্রেপ্তার করেছে।

পরের দিন ভোরের দিকে, দেশটির সেনাবাহিনী স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয় যে, চিফ অফ স্টাফ দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে এবং এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

তিনি তার ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি ন্যায়সঙ্গত বুঝাতে গিয়ে বলেন যে, কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনগুলিতে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে ব্যাপক জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।

আচমকাই দেশটিতে অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটানো হয়। দেশটির রাজধানীতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এবং যোগাযোগও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়৷

দুই. মালির সেনা অভ্যুত্থান

২০১৯ সালে রাজনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, অপশাসন, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দেশটির শাসক ইব্রাহিম কেইতার বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল।

এই গণবিক্ষোভের জের ধরে গত ১৮ আগস্ট ২০১৯ এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। আন্তর্জাতিক সমাজ এই অভ্যুত্থানের নিন্দা জানায়৷

আফ্রিকান ইউনিয়ন মালির উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করে৷ তবে সামরিক জান্তা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনীতিবীদদের সাথে বৈঠক করে ১৮ মাসের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে, অতঃপর অক্টোবরের পাঁচ তারিখে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

১৮ই আগস্টের এই অভ্যুত্থান দ্বিতীয় অভ্যুত্থান ছিল৷ এর আট বছর পূর্বে ২০১২ সালেও একটা অভ্যুত্থান ঘটেছিলো৷

২০১২ সালে ক্যাপ্টেন আমাদো সানোগোর নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রপতি ‘আমাদু টুমানি টুরকে’ ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাকে গ্রেপ্তার করে৷ যার ফলশ্রুতিতে দেশের উত্তর অঞ্চলটিতে আল কায়েদার কর্তত্ব স্থাপন হয়৷

তিন. সুদানের সেনা বিদ্রোহ

২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে রুটির দাম তিনগুন বেড়ে গেলে সেখানে ব্যাপক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয়৷ ফলে এর জের ধরে এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের ক্ষমতার অবসান ঘটে৷

বিরোধীদের মতে এই বিক্ষোভে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলো।

অতঃপর আগস্টে সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক সমন্বিত একটি ‘ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ গঠন করা হয়৷ এবং পরের মাসে একজন বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

আল-বশির বর্তমানে ‘খারতুমের’ কারাগারে রয়েছেন এবং সময় সময় তিনি বিচার বিভাগের সামনে হাজির হন, যেখানে তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগে বিচার করা হয়।

চার. জিম্বাবুয়ে অকল্পনীয় এক সেনাবিদ্রোহ

২০১৭ সালে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবেকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়৷ স্বাধীনতার পরে ৩৭বছর ধরে তিনি লৌহমুষ্টিতে দেশটি নেতৃত্ব দিয়ে চলেছিলেন৷

এরপর সেনাবাহিনী এবং তার দল “জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল ইউনিয়ন-প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট” (জ্যানু-পিএফ) এর সদস্যরা তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে তার পরিবর্তে প্রাক্তন সহ-রাষ্ট্রপতি এমারসন এমনাগাগাভা ক্ষমতায় বসানো হয়৷

দুই বছর পর ৯৫ বছর বয়সে সিঙ্গাপুরে মুগাবে মারা যান৷৷

পাঁচ. বুর্কিনা ফাসোর অভ্যুত্থান

আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ বুরকিনা ফাসোতে একটি গণবিদ্রোহের পরে রাষ্ট্রপতি ব্লেইস কমপোরের পতনের এক বছরেরও কম সময় পরে তারই উত্তরসূরী ‘মিশেল কাভান্দোকে’ ২০১৫ সালে সরকারী গার্ডের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

কিন্তু এক সপ্তাহেরও কম সময় পরে বিদ্রোহী নেতারা তাদের পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থন জোগাতে ব্যর্থ হলে মিশেলকাভান্দো পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন৷

ছয়. থাইল্যান্ডে সেনা অভ্যুত্থান

ইংলাক শিনাওয়াত্রার নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক মাস বিক্ষোভের পর ২০১৪ সালে দেশটির সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নেয়৷

আর ইংলাক শেনাওয়াত্রা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শেনাওয়াত্রার বোন, যাকে ২০০৬ সালের এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছিল।

সাত. মিশরে সেনাবিদ্রোহ, এবং গণতন্ত্র হত্যা

দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র এক বছরের মাথায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ২০১৩ সালে ক্ষমতা থেকে  সরিয়ে জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ সিসি ক্ষমতা গ্রহণ করে৷ জেনারেল সিসি তার বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকান্ড চালায়৷ যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

গণতন্ত্রকে হত্যা করে এখনো তিনি ক্ষমতায় টিকে আছে৷ তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সমাজ তাকে কোনো নিন্দা জানায়নি৷

আট. নাইজেরিয়ায় একটি অভ্যুত্থান এবং একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া

ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পরেই ২০১০ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি মামাদৌ টাঙ্গাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী৷

তবে পরবর্তীতে সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যেমে বেসামরিক সরকার গঠন করার সম্ভাবনা রয়েছে৷

নয়. লিবিয়ায় সেনাবিদ্রোহ

২০১১ সালে পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়।

দশ. ইয়েমেনে সেনা বিপ্লব

২০১৪ সালে শিয়া মতাবলম্বী হুথি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের তখনকার নতুন প্রেসিডেন্ট আব্দরাব্বি মনসুর হাদি’র দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উত্তরাঞ্চলের প্রদেশ ‘সাদা’ এবং আশেপাশের কয়েকটি এলাকার দখল নেয়।

পরবর্তীতে বিদ্রোহীরা রাজধানী ‘সানা’ ও দখল করে’ ফেলে৷ এবং প্রেসিডেন্ট হাদিকে দেশত্যাগে বাধ্য করে।

অতঃপর ২০১৫ সালের মার্চ মাসে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব সহ আটটি সুন্নি মুসলিম আরব দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সেনাবাহিনী জোট গঠন করে আক্রমণ শুরু করলে যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যায়। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে৷

সূত্র: আল-জাজিরা

-এসএন

পূর্ববর্তি সংবাদনাটোরে শিশু ধর্ষণের মামলায় আসামির যাবজ্জীবন
পরবর্তি সংবাদইস্তাম্বুলে অবমাননাকর চিত্র প্রদর্শন, সমাজ মাধ্যমে ‘কাবা আমাদের কাছে পবিত্র’ হ্যাশট্যাগ