উদ্বেগজনকভাবে মদপানে বাড়ছে মৃত্যু: ‘দেশীয় মিডিয়ায় বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের কুফল’

রায়হান মুহাম্মদ।।

সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগজনকভাবে মদপানে মৃত্যু বেড়ে চলছে। এক জরিপ মতে বছরের প্রথম মাসেই মদপানে মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক নারী, পুরুষ ও কিশোরের। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও আরো নানান পেশার মানুষ রয়েছেন। মদপানে মৃত্যু ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মদপানের কারণে ছাত্রলীগ নেতাসহ অনেককে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে।

কুরআনে স্পষ্ট হারাম বর্ণিত এই পানীয় পান করে মানুষের এমন মৃত্যুতে হতবাক দেশে চিন্তাশীল আলেম সমাজ ও সাধারণ জনগণ। হঠাৎ করে তরুণ, যুব সমাজ ও বিভিন্ন পেশার মানুষের এমন মৃত্যু বেনাদায়ক বলে উল্লেখ করেছেন রাজধানীর শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা বেশ পীড়াদায়ক উল্লেখ করে তিনি ইসলাম টাইমসকে বলেন, মানুষের ব্রেন, জানমাল ও সম্মান নষ্ট করে এবং ধর্মপালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন প্রত্যেকটি জিনিসকে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, একথায় শরীয়তে ইসলামীতে মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত যত বিষয় আছে-এসবে ক্ষতি সাধন করে এমন প্রত্যেকটি বস্তুই ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।

তিনি বলছেন, মানুষের মেধাকে নষ্ট করে দেয় এমন জিনিসের মধ্যে মদ অন্যতম। মদ শুধু মস্তিকই নষ্ট করে না সাথে সাথে মানুষকে নানা মাত্রিক অপকর্মে জড়িয়ে ফেলে। বর্তমানে বিভিন্ন পরিবারে বাবা-সন্তান, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কলহ তৈরি হচ্ছে এই হারাম পানীয়কে ঘিরে।

মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদের ভাষায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আল্লাহ তায়ালা মদকে কয়েক ধাপে হারাম করেছিলেন। প্রথমে শুধু মদের খারাপ দিকগুলোর বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন, এরপর নামাজের সময় তা পান না করতে বিধান দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা মদকে পুরোপুরি হারাম ঘোষণা করেছিলেন।

হেকমতের সাথে কয়েক ধাপে আল্লাহ তায়লা যে বিষয়টিকে হারাম ঘোষণা করেছেন তার প্রতি ব্যাপক হারে মানুষের এমন ঝুঁকে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ এই হারাম নেশায় মত্ত যুব সমাজ ও সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে কুরআনের বিধান মেনে ইসলামের শীতল ছাঁয়ায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

উদ্বেগজনকভাবে মদপানে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার পেছনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের অবহেলা ও ব্যর্থতার পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটি বিষয়কে এর জন্য দায়ী মনে করেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

করোনা ও লকডাউনের অজুহাতে স্কুল-কলেজের দীর্ঘ ছুটি, অনেক ক্ষেত্রে চাকরি হারিয়ে ঘরে বসে থাকা বেকার মানুষদের সময় কাটানোর জন্য বন্ধু-বান্ধবের সাথে অকারণ আড্ডা, এসব থেকেই মানুষজন মদের প্রতি ঝুঁকছে বলে মনে করেন এই ইসলামী চিন্তাবিদ।

এছাড়া করোনাকালে বেকারত্ব বেড়েছে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। এতে জীবন-জীবিকা থেকে হতাশ হয়েও কেউ কেউ এমন পথ বেছে নিচ্ছেন বলে মত দিয়েছেন তিনি।

তবে এসবের বাইরেও দেশীয় মিডিয়াগুলোর পশ্চিমা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ দেশে মদ নামের এই মহামারী ছড়িয়েছে দিচ্ছে। মিডিয়ায় বিনোদনের নামে নানামূখী অপসাংস্কৃতির প্রচারণায় দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

আরো পড়ুন: ‘লকডাউনকালে ইসলামী অনুশাসন পালনে পরিবারে বয়ে যেতে পারে শান্তির সুবাতাস’

তিনি প্রতিবেদককে বলছেন, মিডিয়ায় বিভিন্ন ভিনদেশী কন্টেন্ট দেখে আজকাল অবুঝ শিশুরাও পানির বোতল হাতে মদ খেয়ে মাতাল হওয়ার অভিনয় করছে। শিশুদের কোমলমতি মনকে এসব হারাম ও নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে ধাবিত করার এ দায় কোনভাবে এড়াতে পারে না মিডিয়াগুলো- বলছিলেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

তিনি বলছেন, দেশীয় মিডিয়াগুলোর পশ্চিমা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ যে দেশে কখনো ভাল কোন ফল বয়ে আনে না তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।

মদপানকারীর জন্য ইসলামে ৮০ দোররা বা বেত্রাঘাত শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ শাস্তি নির্ধারণ করে এর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দেশে মদপান বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা হয় না তাই সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে দেশীয় আইনে কঠোর শাস্তি নির্ধারণ ও তার সঠিক প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এছাড়াও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোরতার পাশাপাশি দেশের আলেম সমাজ, বক্তা ও খতিবদের সাথে বসে সরকারের লোকেরা এ বিষয়ে মত-বিনিময়ের মাধ্যমে আরো ভালো কোন পন্থা বের করতে পারেন বলে মত দিচ্ছেন এই ইসলামী চিন্তাবিদ।

আরো পড়ুন: বিচারপতি শামসুদ্দীন মানিকের ইসলাম বিদ্বেষী বক্তব্য নিয়ে যা বললেন মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ

নানামূখী উন্নয়নের থেকেও নৈতিকতা সম্পন্ন আদর্শ জনগণ দেশের কল্যাণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই সরকার প্রধান ও দায়িত্বশীলদের এসব ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ।

এদিকে সম্প্রতি দেশে মদপানে যে কয়েকটি মর্মান্তিক মৃত্যুকাণ্ড ঘটেছে তা নানান ক্ষেত্রে সরকার ও প্রশাসনের প্ররম ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

তিনি ইসলাম টাইমসের প্রতিবেদককে বলছেন, বর্তমানে বিয়ে অনুষ্ঠানে মদপান করার যে অপসাংস্কৃতি ও প্রবণতা চালু হয়েছে সরকারই এক রকম অঘোষিতভাবে এর বৈধতা দিয়ে রেখেছে-  সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেখে অন্তত এমনটা দাবি করা যায় বলে মনে করেন এই ইসলামী রাজনীতিবিদ।

তিনি বলছেন, বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে ভেজাল মদ ও অবৈধ মদের কারখানার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায় সরকারি বাহিনীকে। কুরআনে স্পষ্ট হারাম বর্ণিত মদের ব্যবহার ও সহজলভ্যতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ভেজাল ও অবৈধ মদের বিরুদ্ধে অভিযান- ব্যাপারটা এক রকম আশ্চর্যজনক ও হাস্যকর উল্লেখ করে তিনি বলছেন, মদের মধ্যে ভেজাল, শুদ্ধ, বৈধ বলে কিছু নেই , পুরোটাই হারাম ও অবৈধ, তাই শুধু ভেজাল মদ ও অবৈধ মদের কারখানার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান কোন সুফল বয়ে আনবেনা বলছেন তিনি।

সরকারের দৃষ্টিতে অভিজাত শ্রেণী হিসেবে গণ্য এমন লোকদের জন্য বিভিন্ন বারে মদ খাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়।ইসলামে অভিজাত ও নিম্নবিত্ত- এমন শ্রেণী বিভাজন বলে কিছু নেই, তারপরো শরীয়তে ইসলামীতে হারাম বর্ণিত একটি ব্যাপার নিয়ে এমন অভিজাত শ্রেণী- নিম্নবিত্ত ভেদে আইন প্রয়োগের কোন যোক্তিকতা খুঁজে পান না বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

তিনি বলছেন, কোন ব্যাপারে যখন অভিজাত শ্রেণীরা বৈধতা পান, তখন দেশের নিম্নবিত্ত শ্রেণী তা আরো সহজে পাওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হন। তাই ভেজাল, অবৈধ, অভিজাত ও নিম্নবিত্ত এমন পার্থক্য না করে পুরো মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, চাই তা গাজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা যে নামেই হোক না কেন।

সম্প্রতি মদপানে অর্ধশতাধিক মানুষ মারা গেলেন। এরপরে সরকারের পক্ষ থেকে নামমাত্র ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা গেছে। তা আগে থেকেই নিলে বছরের শুরুটা এতোগুলো তাজা প্রাণ হারানোর বেদনায় শুরু না হয়ে আরো ভালো কোন সংবাদ দিয়ে শুরু হতে পারতো; কিন্তু জনগণের কল্যাণে অবদান রাখতে যে বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে বর্তমান সরকার, সাম্প্রতিক ঘটনা পঞ্জি তারই প্রমাণবহন করছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

আরো পড়ুন: আলেমদের তাচ্ছিল্য: ‘ভেতরে থাকা ইসলাম বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ’

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ‘ব্যাম্বু স্যুট’ রেস্টুরেন্টে মদপান করেন পাঁচ বন্ধু। এরপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারাহ চৌধুরী ও তার বন্ধু আরাফাত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এছাড়া সোমবার রাজধানীর ক্যান্টনম্যান্ট থানাধীন ডিইউএইচএস-এ আবদুল আল মামুন নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত মদপানে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী সাহান হক।

এর আগে বিজ্ঞাপনী সংস্থা ঢাকার এশিয়াটিক মার্কেটিং কোম্পানির আওতাধীন ফোর থট পিআর প্রতিষ্ঠানের ৪৩ কর্মকর্তা গাজীপুরের শ্রীপুর থানার সারাহ রিসোর্টে বেড়াতে আসেন। সেখানে মদপান করে প্রতিষ্ঠানটির ৩ কর্মী একেএম শরীফ জামান, শিহাব জহির ও মীর কায়সার অতিরিক্ত মদপান করে মারা যান।

এছাড়া বছরের শুরুতে থার্টিফার্স্ট নাইট উৎযাপন উপলক্ষে ১ জানুয়ারি রাতে রাজশাহীর হোসনীগঞ্জ এলাকায় মদ পান করে অসুস্থ হয়ে মারা যান ৫ যুবক।

উত্তরবঙ্গের বগুড়া শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মদপান করে ১৫ জন মারা গেছেন বলে বগুড়া সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবীর জিানিয়েছেন। গত ৯ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মদপানে অসুস্থ হয়ে ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে আরো ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীসহ ৪ জনের মৃত্যু হয় বলে ইসলাম টাইমসসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

-এনটি