কার দীর্ঘশ্বাস লেগেছে বার্মায়?

রেযা আলী আবিদী ।।

প্রবাদ আছে, -সঠিক কি না ভুল আমি জানি না- সামরিক আইন হলো এমন এক আজাব, যেখানে একবার লাগে, লাগতেই থাকে বারবার।

সর্বশেষ উদাহরণ হলো বার্মা। যার আধুনিক নাম মিয়ানমার। দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং ফল সেটাই হয়েছে যা নতুন যুগের নিয়ম হতে চলেছে। নির্বাচনে যথারীতি ক্ষমতাসীন দল দাপটের সঙ্গে জিতেছে এবং তাদের বিজয় উৎসব শুরু হতে না হতেই কোথা থেকে সেই পরিচিত শ্লোগানটি উচ্চকিত হয়েছে। অর্থাৎ, “নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে”।

আমেরিকার উদাহরণের পর বিশ্বকে এখন এই শ্লোগানে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে এবং কানে বসা মৌমাছির মতো তা ঝেড়েও ফেলতে হবে।  তবে বার্মায় যেটা ঘটেছে, তা হল সেনাবাহিনী বেশ সিরিয়াস হয়ে  সংবিধানকে বাতিল করে দিয়েছে। দেশে জরুরি পরিস্থিতি জারি করেছে। রাজনীতিবিদদের নজরবন্দি করেছে। দেখতে দেখতেই বার্মায় না জানি কততম বার সামরিক আইন জারি হলো। তবে এবার একটি নতুন দৃশ্য দেখা গেছে।

আমরা অনেকবার দেখেছি, গণতন্ত্রকে এভাবে পদদলিত করা হলে দেশে অবশ্যই কোনো না কোনো পক্ষ এমন থাকে, যারা সামরিক আইনের পক্ষপাতিত্ব করে। সেনাবাহিনীর সুরে সুর মেলায়। তবে বার্মায় এখনো পর্যন্ত এমন হয়নি। বরং আমরা এ দৃশ্য প্রথম দেখলাম যে, জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে তারা। দেশটির সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা অং সান সু চি সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে আছেন এবং জনগণ তার মুক্তি দাবি করছে।

সেনাবাহিনী সেই পরিচিত ঘোষণাটি দিয়েছে, ‘এই সামরিক আইন ব্যস কিছু সময়ের জন্য আরোপ করা হয়েছে, এর পরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধুমধামের সঙ্গে ফিরে আসবে। হ্যাঁ, কোনো এক প্রান্ত থেকে ভেসে আসা একটি আওয়াজ আমরাও কান পেতে শুনেছি। যেকথা আমি প্রথম দিকে বলেছি যে, সামরিক আইনও একটি আজাব।

বার্মার লোকেরা দীর্ঘকাল ধরে সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের যেভাবে হত্যা ও ধ্বংস করেছে, তাদের সম্পত্তিকে যেই নির্মমভাবে জবরদখল করেছে,  তাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে যেরূপে অসম্মান করেছে, তারপর এই দেশটিতে যেই আজাবই আসুক, তা অত্যন্ত কম।

অবাক হতে হয়, যেই বৌদ্ধ জাতি বিশ্বাস করে, জীব হত্যা মহাপাপ। যাদের বিশ্বাস, পায়ের নীচে পোকামাকড়  চাপা পড়ে মারা যাওয়াও একটি পাপ।  এমন জাতি, যারা নাকে কাপড় বাঁধে এজন্য যে, যাতে কোনও উড়ন্ত পোকা তার নাকে প্রবেশ করে মরে না যায়, সেই জাতির চোখে যখন রক্ত উঠল তখন তারা সমস্ত ধর্ম এবং বিশ্বাসকে একপাশে রেখে দিল। মানুষের মর্যাদাকে তারা এমন জঘন্যভাবে পদদলিত করল যে, যে দেশগুলি সাধারণত মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয় তারাও এই নৃশংসতার বিষয়ে চুপ করে থাকতে পারেনি।

সেই অং সান সু চি, যিনি একসময় মানবাধিকারের সবচে বড় ধ্বজাধারী সেজেছিলেন, মুসলমানদের উপর গণহত্যাকারীদের পক্ষপাতী হয়ে যান। আন্তর্জাতিকভাবে শান্তি এওয়ার্ড পেয়েছিলেন সুচি। এমনকি এওয়ার্ড দানকারীরাও মুখ লুকিয়ে বসেছিল। এই মহিলাকে একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা দিয়েছিল, যা ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অং সান সু চি তার দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থা বদলাননি, ফলে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিও পেয়েছিল।

এদিকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া হতভাগ্য মুসলমানদের দুর্দশার পরিমাণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি তাদের সহায়তায় হাত বাড়িয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের কাছে এভাবে বন্যার স্রোতের ন্যায় আশ্রয়প্রার্থী মনপূত ছিল না। এখন তাদেরকে নৌকায় বোঝাই করে সমুদ্রের মাঝে বিচ্ছিন্ন চরে প্রেরণ করা হচ্ছে যেখানে তারা বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করবে। এখন কেউ এটাকে দুর্বল বিশ্বাস বলুক বা অন্যকিছু, মানবজাতির ওপর যখনি জুলুম-অত্যাচারের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কুদরত তার শাস্তি অবশ্যই দিয়েছে। বার্মার লোকেরা একথা মানুক, চাই না মানুক।

বাস্তুচ্যুত মজলুম পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস একদিন প্রতিশোধ নেবে এবং অবশ্যই নেবে। একটি বিশাল দেশ, চীনের সাথে যাদের দীর্ঘ সীমান্ত সংযোগ এবং যাদের প্রতি চীন বড়ই দয়াশীল, সেই দেশের পক্ষে স্থিতিশীলতা পাওয়া কঠিন বলে মনে হয়। এই ভূখণ্ডে সমাহিত ভারতবর্ষের বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের আত্মা অবশ্যই একবার দুঃখে কাতর হয়ে উঠে থাকবে। কারো না কারো তো ভাবনায় আসার কথা যে, গৌতম বুদ্ধও হয়তো বার্মা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

এখানে একটি ভাববার বিষয় রয়েছে, বিশ্বের সর্বত্র আজ উদ্বেগ-অস্থিরতা কেন? ইউরোপীয় দেশগুলিতে লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। লোকজন চাকরি হারিয়েছে, তারুণ্যের উদ্যোম নষ্ট হয়ে গেছে, ঘরে আটকা পড়ে থাকা নারী ও শিশুরা মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যায় ভুগেছে। দক্ষিণ আমেরিকায় কতগুলি সরকার অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। আফ্রিকা তো সবসময়ই অন্ধকার মহাদেশ হিসাবে অভিহিত হয়ে আসছে, সুতরাং তার অন্ধকার কখনই হ্রাস পায় না। চারদিক থেকে সেখানে গৃহযুদ্ধের সংবাদ আসছে। গোটা সিস্টেমটাই উপজাতিগুলির মধ্যে বিভক্ত এবং প্রত্যেক উপজাতি অপরের রক্ত পান করার জন্য তৃষ্ণার্ত।

ভারতে কৃষকদের ক্ষেত্রে নিপীড়ক আইনের যে কাঁটা বিঁধছে, তাতে শ্রমিক শ্রেণি বিচলিত। মনে হচ্ছে, হঠকারি সরকার এবং নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট কৃষকরা পরস্পরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। হাজার হাজার কৃষক দেশটির রাজধানীতে পৌঁছেছেন। জানা নেই, এই ফ্রন্ট কী রূপ নেবে।

এই এলোমেলো অস্থিরতার সঙ্গে ওই কেয়ামত এখনো মাথার ওপর, যাকে কোভিড-১৯ বলে। ওই প্রাণঘাতী জীবাণু আল্লাহ জানেন কোত্থেকে বিস্ফোরিত হয়েছে এবং কেন দুনিয়ার প্রতিটি কোণ থেকে জীবনের মর্ম ছিনিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে আছে।

অন্তরে একটাই প্রশ্ন জাগে, মানুষের আস্থা  কি আইনের ওপর থেকে উঠে যাচ্ছে? ন্যায়-ইনসাফের চিত্র কি ম্লান-ধূসর হয়ে পড়ছে? মানবিক দয়া-সহানুভূতি কি পৃথিবী থেকে উঠে যাবে? এর আগে তো কখনো এমন হয়নি। এখন কেন হবে? এটা কি তাহলে ভিন্ন কোনো পৃথিবী?

ভাষান্তর: সাইফ নূর