উগ্র হিন্দুদের হাত থেকে ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় কাশ্মীরের শাল শিল্প চাঙ্গা করা প্রয়োজন

ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীরের শালের খ্যাতি দুনিয়াব্যাপী। কিন্তু ভারতের নানা মাত্রিক দমন-পীড়ন ও আগ্রাসনে কাশ্মীরিদের জীবন ধারণের অন্যতম মাধ্যম এই শাল শিল্প বর্তমানে সংকটের মুখে। কাশ্মীরের শাল শিল্প সংকটের মুখোমুখি পড়ার পেছনের গল্প ও দীর্ঘকাল ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার অঞ্চলটির অধিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষায় এই শিল্পকে চাঙ্গা করার প্রয়োজনীতা নিয়ে বিশেষ কলাম লিখেছেন উর্দুভাষী প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীর। ইসলাম টাইমসের পাঠকদের জন্য কলামটির বিশেষ অংশ তুলে ধরা হলো।


২০১৯-এর ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে অন্যায়ভাবে কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসংখ্যাকে সংখ্যালঘু বানানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। এছাড়াও কাশ্মীরের বাইরের লোকদের এই অঞ্চলের রাজনীতির সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। কাশ্মীরিদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নষ্ট করার পাশাপাশি তাদের অর্থনীতিও ধ্বংস করা হচ্ছে। একদিকে কাশ্মীরি শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে জোর করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অন্যদিকে কাশ্মীরের স্থানীয় শিল্পগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।

দখল করে রাখা জম্মু-কাশ্মীরে ১৯৯০ এর পর থেকে যেই অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে এতে অনেক কাশ্মীরি নারী বিধবা হয়েছেন। নিরাশ্রয়, অসহায় বিধবাদের অধিকাংশই শাল তৈরির কারখানাগুলোতে আশ্রয় পেতেন; কিন্তু বর্তমানে কাশ্মীরের শাল শিল্প মহা সংকটের মুখোমুখি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখে ( কাশ্মীর সংহতি দিবস) পাকিস্তানের সভা-সমাবেশগুলোতে কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার শ্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলা হয়; কিন্তু যেসব সমস্যার সমাধান না হওয়ার কারণে কাশ্মীরিদের জীবন প্রতি মুহূর্তে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে তা নিয়ে কোন আলোচনা হয় না। কাশ্মীররের শাল শিল্পের সাথে ৭ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে, যার বড় একটি অংশ এই অসহায় বিধবা নারী।

দুনিয়াব্যাপী খ্যাতি রয়েছে কাশ্মীরের তৈরি পাশমিনা ( কাশ্মিরী উল থেকে প্রস্তুত চাদর)ও শাহতোশ শালের।
শত বছর আগে যখন শিল্পটি শুরু হয়েছিল, তখন এটি কাশ্মীর ও লাদাখের মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছিল। কাশ্মীরের শাল তাঁতিরা লাদাখের পশমিনা ছাগলের দীর্ঘ পাতলা চুল ও কাঁচা পশম থেকে এই শাল তৈরি করেন।

কাশ্মীরের তৈরি এই শাল ইউরোপে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করলে শালের জনপ্রিয়তা দেখে তৎকালীন ডোগরা শাসকরা শালের উপর প্রচুর কর আরোপ করেছিলেন। সর্বপ্রথম মহারাজা গুলব সিংহ এই শালের ওপর শুল্ক ধার্য করেছিলেন, তখন শাল তৈরিকারীরা লাহোর ও অমৃতসরে চলে যেতে চাইলে রাজা গুলাব সিংহ তাদের নিজেদের ঘরেই বন্দী করে রেখেছিলেন।

এরপর মহারাজা রনবীর সিং ভ্যাটের পরিমান আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রতিবাদে ১৮৬৫ সালে ২৪ এপ্রিল শ্রীনগরে শাল কারখানার শ্রমিকরা এক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ২৮ কাশ্মীরিকে শহীদ করা হয়েছিল। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অধিকার আদায়ে ভারতে এটিই ছিল প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশ, যা অন্য সব আন্দোলনের মতো শক্তি প্রয়োগে দমন করা হয়েছিল।

১৯৯০-তে  অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরে যখন স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করে, নয়া দিল্লির ধূর্ত শাসকেরা লাদাখের অধিবাসীদের শ্রীনগরের বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দিয়েছিল।

শ্রীনগরে স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান উঠলে নয়াদিল্লি লাদাখের লোকদের লাদাখকে জম্মু-কাশ্মীর থেকে আলাদা করার দাবি তোলার পরামর্শ দেয়। নয়া দিল্লির পরামর্শে লাদাখ বৌদ্ধ সমিতি লাদাখকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আলাদা করার দাবিই শুধু তোলেনি, পাশাপাশি কাশ্মীরিদের সামাজিকভাবে বয়কট করেছিল এবং তাদের উলের তৈরি শাল বিক্রিতেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।

লাদাখের ছাগলের যেই কাঁচা পশম দিয়ে কাশ্মীরিরা শাল তৈরি করতো ভারতের শাসকেরা ষড়যন্ত্র করে লাদাখবাসীকে সেই কাঁচা পশম লুধিয়ানার মিলগুলিতে বিক্রি করতে প্ররোচিত করেছিল। এর ফলে কাশ্মীরের শাল শিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।

এই শাল তৈরিতে যেই উলের প্রয়োজন হয়, তা শুধু লাদাখেই নয়, চীন, নেপাল এবং মঙ্গোলিয়াতেও পাওয়া যায়। ভারতীয় যারা কাশ্মীরের শাল শিল্প থেকে উপকৃত হচ্ছিলেন,তারা শাল তাঁতের জন্য মঙ্গোলিয়া থেকে কাঁচা উল আমদানি শুরু করে। এতে কাশ্মীরি শালের চাহিদা কমে যেতে শুরু করে।

বর্তমানে কাশ্মীরের শাল শিল্প সঙ্কটের মুখোমুখি। হাজার হাজার মানুষ কাজ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিদের সাথে সংহতি প্রকাশের সর্বোত্তম পন্থা হল, উগ্র হিন্দুদের হাত থেকে কাশ্মীরি সংস্কৃতি ও ভাষা রক্ষার জন্য পশ্মিনা ও শাহতোশ উলের উৎপাদন ও তা রক্ষার প্রকল্প হাতে নেওয়া।

জিও নিউজ ( ১ ফেব্রুয়ারি ২০২১) থেকে অনুবাদ  রায়হান মুহাম্মদ।

-এনটি