কবিতার আঙিনায় : বিদায় শীত

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

বর্তমান বয়সের এক দেড় ধাপ আগে পরিচিত অনেককেই কবিতা লিখতে দেখেছি। তাদের একটা শ্রেণি আমার ধারণায় কবিতা লিখেছে ছড়া পড়ার আনন্দকে সামলাতে না পেরে। শৈশবের কিছু ছড়ার মতো তারাও ছন্দময় করতে চেয়েছে নিজেকে। নিজের একান্ত কিছু অনুভূতিকে। তারপর আনন্দের দিক ও ধারার পরিবর্তনে তাদের চাওয়াতেও পরিবর্তন এসেছে। এবং ছড়া কবিতার জগত থেকে অনায়াসেই বেরিয়ে পড়েছে তারা। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি তারা ভাগ্যবান।

আরেকটা শ্রেণিকে দেখেছি -ঠিক সেই বয়সে নয়, আরো কিছু সময় পরে- তারাও প্রবেশ করেছে কাব্যজগতে। তাদের অবলম্বন ছিলো কিছুটা বয়সের দোলা। আর কিছুটা আবেগের উদাসী টান। কাব্যজগতে প্রবেশটা ছিল তাদের ঘোরলাগা অবস্থায়। এরপর বলতে গেলে তারাও প্রায় সবাই বেরিয়ে যেতে পেরেছে এই জগত থেকে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে যাদেরকে কবিতা লিখতে দেখেছি লাগাতার। অনেক। তাদের প্রায় সবাইকে মনে হয়েছে প্রেম সূর্যের অসহ্য তাপ আর অসীম প্রখরতায় কাতর। তাদের জন্য খুব মায়া হয়েছে।

আমার বয়স খুবই কম। এইভাবে মন্তব্য করা মানায় কি না জানি না। আসলে যা দেখেছি এবং যেটুকু বুঝেছি কেবল সেটুকুই প্রকাশ করছি এখানে। এই শ্রেণির পরিচিত কয়েকজন এখনো কবিতা লিখে। তবে সেই সূর্য-তাপ আমার জানামতে এখন আর নেই।

আরেকটু বড় হয়ে বেশ কয়েকজন কবির জীবনীও পড়েছি। জেনেছি তাদের কবি হবার গল্প, এবং কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট। তাতে আমার দেখা-অনুভূতির সঙ্গে অনেকের অনেক কিছুই মিলেছে।

কিন্তু হঠাৎ একদিন ময়ূখ চৌধুরীর একটা কবিতা পড়ে খুব অবাক হয়েছি। তিনি তাঁর একটি কবিতায় কবিতা লেখার কারণ উল্লেখ করেছেন এভাবে-

“আসলে, কবিতা-লেখার তেমন কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না,

তবু লিখি।

লিখি একটু নিশ্চিন্তভাবে ঘুমোবার জন্যে!

না- লেখা কবিতা এমন এক ধরণের মশা

যা নিখুঁত মশারির মধ্যেও ঢুকে পড়ে,

ঘুমকে বিছানা থেকে আলগা করে

সারারাত রেলিঙে ঝুলিয়ে রাখে। …   …   …

আসলে, কবিতা ছাপানোরও তেমন কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না,

তবু ছাপি।

ছাপি জমিদখলের অবদমিত প্রবণতাকে চরিতার্থ করার জন্যে।”

তাহলে কবিতা লেখার, কবিতা ছাপার এমন কারণও থাকতে পারে!

কোনো একটি কবিতা থেকে কবির হৃদয়ের সত্যিকারের আকুতি বুঝা একসময় খুবই দুষ্কর মনে হতো। মনে হতো কবি তার হৃদয়ের ভাবকে ছন্দের ছাঁচে ফেলতে গিয়ে অনেক কাটছাট করছেন। কৃত্রিম অনেক অভিনয়ের আশ্রয়ও গ্রহণ করছেন কোথাও কোথাও। সেজন্যে সব কবিতায় প্রাণ খুঁজে পেতাম না। কবিতাকে তখন মনে হতো কাগজের নৌকা। কিংবা কৃত্রিম ফুল।

এরপর যখন গদ্য কবিতা পড়া শুরু হলো তখন পড়লাম ভিন্ন সমস্যায়।  অধিকাংশ কবিতাকেই মনে হলো মনের অর্থহীন আজেবাজে কথা। হিজিবিজি ভাব ভাবনা।

কিন্তু তবুও কবিতার নেশা বন্ধ হলো না।

একদিন মনে হলো, কবিতার মর্ম বলতে কেবলই একটা দুলুনি। ভাবে অনুভবে যেই দুলুনি প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করতে জানে। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা-

“অনেকদিন থেকেই

আমার একটা পাহাড় কেনার শখ।

কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না।

যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না।

আমার নিজস্ব একটা নদী আছে;

সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে।

কে না জানে, পাহাড়ের চেয়ে নদীর দামই বেশি।

পাহাড় স্থাণু, নদী বহমান।

তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই কিনতাম।

কারণ, আমি ঠকতে চাই।

নদীটাও অবশ্য কিনেছিলাম একটা দ্বীপের বদলে।

ছেলেবেলায় আমার বেশ ছোট্টোখাট্টো ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিল।

সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি।

শৈশবে দ্বীপটি ছিল বড় প্রিয়।…..

এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই।

সেই পাহাড়ের পায়ের কাছে থাকবে গহীন অরণ্য,

আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাব,

তারপর শুধু রুক্ষ কঠিন পাহাড়।

একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী, চরাচরে তীব্র নির্জনতা। আমার কণ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না। ……

আমি দশ দিককে উদ্দেশ্য করে বলব, প্রত্যেক মানুষই অহংকারী,

এখানে আমি একা- এখানে আমার কোনো অহংকার নেই।

এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে।”

এখানে কী আছে? ছন্দ? গদ্য? অর্থ? কী?!! কেবলই একটা দুলুনি। ভাবে অনুভবে সেই দুলুনির শক্ত প্রভাব।

এক সময় আমারও কিছু কবিতা লেখা হয়েছে। এবং খুব সম্ভব ছড়া পড়ার আনন্দকে সামলাতে না পেরেই। ফলে কবিতা লেখার ‘লাভ ক্ষতি’ আমাকেও স্পর্শ করেছে, আলতোভাবে। সেই বর্ণনা আজ থাক।

বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের শীতকাল একটু দীর্ঘ হয়েছে বোধহয়। শীতের জামা কাপড় পরে সারাদিন গুটিয়ে থাকা। সন্ধ্যা হতেই কুয়াশার স্পর্শ অনুভব করা। ফজরের নামাযে যাওয়ার সময় শীতের আলিঙ্গন গ্রহণ করা। এজাতীয় অনেক বিষয় শুধু শীতকালেই থাকে। শীতের বিদায়ে এসব অবস্থাও বিদায় নেয়।

এই কয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে, শীত আমাদের থেকে বিদায় নিতে চায়। প্রকৃতিজুড়ে দেখা যায় ফাল্গুনী হাওয়া। গাছে গাছে পাতা গজানোর প্রস্তুতি। বসন্তের আগমন। ফাল্গুন আর বসন্ত যত সুন্দরই হোক, শীতের আনন্দ বেদনা সে কোথায় পাবে? তাই শীতকে বিদায় জানিয়ে লেখা একটি কবিতা খুব মনে পড়ছিল। আমার কবিতাময় অতীতের সম্পদ।

বিদায় শীত!

বিদায় শীতার্ত অনুভূতি!

ঘন কুয়াশার চির নিবিড়তায়

আবার এসো তুমি

আবার এসো দোলা দিতে

উত্তপ্ত হৃদয়ে মেখে দিতে

শীতল আদর।

শিশির নিয়ে এসো।

নিয়ে এসো রাতজাগা পাখিদের

শান্ত কলরব।

আমরা এখন প্রবেশ করছি ফাল্গুনে।

আসছে চৈত্র। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহ।

তোমাকে বড্ড মনে পড়বে তখন

সেসময় আমাদের সান্ত্বনা দিও

মেঘে মেঘে, বৃষ্টির ঝাপ্টায়।

-এসএন