প্রফেসর নূরুল হক মিয়া : ‘আমরা হারালাম আরেকজন পারিবারিক অভিভাবক’

মাওলানা সাঈদ আহমদ ।।

গত শনিবার দীর্ঘ রোগ-শোক ভোগার পর খালু আমাদের ছেড়ে চলে যান। মাকবারায়ে আযীয এর বাসিন্দাদের তালিকা আরো দীর্ঘ হয়ে যায়। আল্লাহ তাঁদের সবাইকে জান্নাত নসীব করুন, আমাদের প্রতি রহম করুন, শাইখের আদর্শের উপর থাকার তৌফিক দান করুন।

খালু রসায়নের নামকরা শিক্ষক-অধ্যাপক-লেখক ছিলেন। দীর্ঘ জীবনে তিনি শিক্ষকতা-অধ্যাপনা করেছেন দেশের প্রসিদ্ধ অনেক কলেজে। তার মধ্যে সিলেট এমসি কলেজ,ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ,টাঙ্গাইল করটোয়া কলেজ,ঢাকা বিজ্ঞান কলেজ ও ঢাকা কলেজ অন্নতম। ঢাকা কলেজে কাটিয়েছেন দীর্ঘ এক যুগের বেশি। ছিলেন রসায়ন বিভাগের প্রধান। সর্বশেষে কিছুদিন (ভারপ্রাপ্ত) প্রিন্সিপালের পদও অলংকৃত করেছেন।সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি,যিনি আপাদমস্তক দীনি বেশভূষাধারী হয়েও ঢাকা কলেজের মত সুপ্রসিদ্ধ আধুনিক উচ্চ বিদ্যাপীঠের ওই পদে আসীন হয়েছেন।

অধ্যাপনা ছাড়াও খালু রসায়ন বিষয়ের একজন প্রসিদ্ধ লেখক ছিলেন। ডিগ্রি ও ইন্টারের ক্লাসের জন্য তিনি রচনা করেছিলেন সাত-আটটি বই। যা একসময় বিপুল পঠিত ছিল এবং বইগুলোর কারণেই রসায়নের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল।

এমন একজন আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত, একজন নামকরা প্রফেসর-অধ্যাপক-লেখক, একজন রসায়নবিদের দীনি ও ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল? তাঁর পরিবারের দীনি অবস্থাই বা কেমন? এসব বিষয়েই কয়েকটি কথা বলার জন্য এই লেখার অবতারণা।

০১ —

খালু ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত দীনদার,পরহেযগার। খুবই সাদাসিধে জীবনের অধিকারী একজন অমায়িক,নিরহংকার মানুষ। কোরআনুল কারীম ও ইলমে দীনের প্রতি পোষন করতেন অস্বাভাবিক মহব্বত।এজন্যই নিজে উচ্চ আধুনিক শিক্ষিত হয়েও আপন সন্তানদের কোরআন ও দীনি শিক্ষা দান করেছেন।তাঁর মোট আট সন্তান ( দুই ছেলে ও ছয় মেয়ে )। মাশাআল্লাহ তারা সকলে হাফেজে কোরআন-হাফেজা।উভয় ছেলে আলেমে দীন ও মাদরাসার শিক্ষক। মাও এনামুল হক ও মাও এহসানুল হক। শুধু সন্তানেরাই নয়, তাদের ছেলে-মেয়রাও ওই পথেরই পথিক, কোরআন ও ইলমে দীনই তাদের মানযিলে মাকসূদ। এভাবে খালুর জীবদ্দশাতেই তার সন্তান-সন্ততির মধ্যে হাফেজ-হাফেজার সংখ্যা পৌঁছে যায় ২৫-এ!! তাদের মধ্যে আছে কয়েকজন আলেম। তাছাড়া হিফজুল কোরআন করছে আরো কয়েকজন। নিঃসন্দেহে—

ذلك فضل الله يؤتيه من يشاء

ایں قوت بزور بازو نیست تا نہ بخشد خدائے بخشندہ

একবার খালু খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর বাঁচবেন কি না এতে শঙ্কা দেখা দিল। তখন তিনি একটি ওসীয়ত করলেন। তাতে আন্দাজ করা যায় তাঁর ইমানী অবস্থা,দীনি অনুভব-অনুভূতি,চিন্তা-চেতনা। বোঝা যায় তাঁর আল্লাহ-নির্ভরতা কেমন ছিল। পাওয়া যায় এ প্রশ্নেরও উত্তর যে, শাইখুল হাদীস রহ কীভবে একজন প্রফেসরকে গ্রহণ করলেন আমন জামাতা হিসেবে? খালুজান ওসীয়ত করলেন— ‘আমার সন্তানেরা প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবে,তবু তারা স্কুল-কলেজের আঙ্গিনায় কখনই প্রবেশ করবে না। তারা কোরআন ও ইলমে দীনই হাসিল করবে এবং কোরআন ও দীনের পথেই থাকবে’।

আল্লাহ মেহেরবান খালুর এই নেক নিয়ত কবুল করেছেন। তারা সকলে কোরআন ও ইলমে দীন লাভ করেছে ও করছে এবং সকলে ভালভাবেই ‘খেয়ে পরে’ আছে।

০২ —

খালু সর্বদা আযীমতের উপর থাকার চেষ্টা করেছেন।পরহেযগারির জীবন যাপন করেছেন। এরই একটি দিক হলো, সারাজীবন তিনি ছিলেন নামাজের জামাতের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান। সকল নামাজ সর্বাবস্থায় মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতেন। যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলেন,শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল,তখনও ছিল একই অবস্থা। শেষ জীবনে অনেক দিন পর্যন্ত দেখেছি, বহু কষ্টে সিঁড়ি বেয়ে, খুব ধীর গতিতে পা ফেলে ফেলে মসজিদে যেতে। পাঁচ মিনিটের পথ পাড়ি দিতেন ২৫/৩০ মিনিটে। তাও জামাত ছাড়তেন না। এমন কি এক সময় নিজে নিজে হেটে যাবেন সেই শক্তি পর্যন্ত থাকল না। তখন এক তাবলীগি ভাই এসে তাঁকে মসজিদে নিয়ে যেত। রইল জুমার নামাজ, তাতে হুইল চেয়ারে বসে মসজিদে গিয়ে যোগ দিতেন!

আমার যেহেতু ফতোয়া বিভাগে পড়ার সুযোগ হয়েছে,তাই আমাকে পেলেই, আবার অনেক সময় ডেকে নিয়ে মাসআলা-মাসায়েল জিজ্ঞাসা করতেন।কখোনা মারকাযের দারুল ইফতাতে লিখিত ইস্তেফতা পাঠাতেন।এবং পূর্ণরূপে মাসআলা অনুযায়ী আমল করতেন। আযীমতকে নিজের আদর্শ বানাতেন।ছাত্র বয়স থেকেই দীনের সাথে গভীর সম্পর্ক, তাবলীগ জামাতের সংশ্লিষ্টতা ও মুহতারাম নানাজানের দীর্ঘ সোহবতের বদৌলতে এমনই ছিল একজন প্রফেসরের দীনি জীবনের অবস্থা।

০৩ —

ছাত্রকাল থেকেই খালুর সম্পর্ক কায়েম হয় দীন চর্চা ও দীনি মেহনতের বরকতময় দল তাবলীগ জামাতের সাথে। অতঃপর সারাজীবন নিজেকে জুড়ে রেখেছিলেন এই জামাতের সাথে এবং সর্বতোভাবে আদায় করেছেন এই সম্পর্কের হক।ছিলেন শেখ সাহেব বাজার এলাকার আমীর।জীবনভর করেছেন দেশ-বিদেশে তাবলীগি সফর।

শিক্ষকতার কারণে অন্য সময় যেহেতু সুযাগ হত না তাই রমজানকে বেছে নিয়েছিলেন চিল্লার মাস হিসেবে।রমজানে এ কাজ কতটা কষ্টের তা সহজেই অনুমেয়।শুধু তাই নয়, অধিকাংশ সময় সফরেই ঈদ করতেন।রমজানের শুরুতে বের হয়ে ঈদ সফরে করে অতঃপর আসতেন।দীর্ঘদিন দেখেছি,আনন্দের ঈদে সবাই আছে।শুধু খালু নেই।তিনি আজকের দিনেও তাঁর অতি প্রিয় কাজে, প্রিয় জামাতের সাথে আছেন।

তাঁর মৃত্যুতে এলাকার তাবলীগি ভাইরা সত্যিই এতীম হয়ে গেছেন। তারা হারিয়েছেন তাদের রাহবারকে, তাদের অতি প্রিয়,অতি শ্রদ্ধেয় নূরুল হক স্যারকে।

০৪ —

খালুর জীবনে যে বিষয়টি অনেক বেশি চোখে পড়ার মত ছিল, তা হলো তাঁর অতি সাধাসিদে চালচলন, সাদেগি।তাঁর বাহ্যিক বেশভূষা দেখে বাইরের কারো জন্য কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না যে, তিনি এত বড় একজন রসায়নবিদ, রসায়নের অধ্যাপক-লেখক। তাঁকে জীবনভর দেখেছি পাঁচকুল্লি টুপি আর খুবই সাধারণ সাদা পান্জাবি-পায়জামা পরে কলেজে জেতে। এ পোষাক পরেই তিনি আধুনিক উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে অধ্যাপনা করেছেন সুনামের সাথে। বসেছেন ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপালের সীটে। এই মৌলভিয়ানা পোষাক পরে এবং দীনি বেশভূষা নিয়ে আধুনিক শিক্ষার উচ্চ থেকে উচ্চাঙ্গনে তিনি কখনো সঙ্কুচিত হননি, বরং অন্যদের করেছেন প্রভাবিত,অবনত। আপন দীনদারিতে মজবুত ব্যক্তিদের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে।তারা প্রভাবিত হয় না, প্রভাবিত করে। সঙ্কুচিত হয় না, মাথা উঁচিয়ে রাখে।

খালু এতটাই সাদামাটা ছিলেন যে, লেখালেখি করার জন্য তাঁর কখনো চেয়ার-টেবিলের প্রয়োজন হয়নি! সর্বদা খাটের উপর বসে এক হাঁটু খাড়া করে তার উপর কাগজ রেখে লিখতেন। এভাবেই তিনি রচনা করেছিলেন রসায়নের সাত-আটটি বই।বলতে গেলে তাঁর ঘরের পুরো জীবন কেটেছে এই একটি খাটের উপরেই। তিনি সাধারণত বাসাতে নিজের ঘরেই থাকতেন এবং এই খাটটির উপর যাবতীয় কাজ (পড়া,লেখালেখি,ইবাদত ইত্যাদি) করতেন।অনেক সময় বাসায় বহু মানুষ জমা হত।বাচ্চারা হৈচৈ করত,অনেক শোরগোল হত।কিন্তু এসবের প্রভাব তাঁর উপর পড়ত না, কাউকে কিছু বলতেনও না, আপন মনে নিজ কাজ করে যেতেন।

ঢাকা কলেজ তাঁর বাসা থেকে প্রায় ৪০/৫০ টাকা রিকসা ভাড়ার দূরত্বে। আশ্চর্য হলো, তিনি সেখানে হেটেই চলে যেতেন।কত দেখেছি,তিনি হেটে কলেজে যাচ্ছেন অথবা সেখান থেকে বাসায় ফিরছেন।কলেজের বিভিন্ন সুবিধাদিও (বাড়ি,গাড়ি,প্রভৃতি) তিনি গ্রহণ করেননি।নিজ বাসায় থেকেছেন।পায়ে হেটে আর বেশি দূরে হলে রিক্সা ইত্যাদিতে কলেজ করেছেন।

ঢাকা কলেজের মত উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের অধ্যাপক-প্রিন্সিপালের এমন সাদামাটা জীবন সত্যিই অসাধারণ।আমাদের মত আলেমদের জন্যও শিক্ষনীয়। দীন-দুনিয়া যে কত সহজে, কত সুন্দর রূপে একত্র হতে পারে,মিলে-মিশে চলতে পারে তারও উদাহরণ এটি।

০৫ —

খালুকে হারিয়ে আব্বা অনেকটা একা হয়ে পড়লেন।আব্বা হারিয়েছেন তাঁর সারাজীবনের সঙ্গীকে। সঙ্গী শুধু এ কারণে নয় যে, তাঁরা পরস্পর ভায়রা ভাই। বরং তাঁরা জীবন কাটিয়েছেন একই সাথে, একদম পাশাপাশি থেকে।বাড়ি একদম লাগোয়া,যেন একই ভবন।এর পেছনে কাজ করেছে নানাজানের অভিনব দীনি চিন্তা।

আমাদের বাসা ছিল মিরপুরে। খালুর বাসা সুত্রাপুরে। নানা বললেন, আসো আমরা একত্রে জায়গা কিনে একসাথে বাড়ি করি। এতে করে আমাদের সন্তারেরা একটি যৌথ দীনি পরিবেশে বড় হব। তারা বাইরের বেদীন পরিবারের সন্তানদের সাথে মেলামেশা করবে না।

এমনই করা হলো। নানাজান, আব্বা, খালু একসাথে বাড়ি করলেন(৩০ শেখ সাহেব বাজার)। আমরা মামা-ভাগ্নে-খালাত ভাইরা একত্রে বেড়ে উঠলাম।খেলাধূলাও একত্রে করেছি।ফলে এর জন্যও বাইরের মানুষের সাথে খুব একটা মিশতে হয়নি। আমরা নানাজানের এই চিন্তা-পরিকল্পনা দ্বারা অনেক উপকৃত হয়েছি।

এভাবে আব্বা ও খালুর জীবন একসাথে কেটেছে। এখন আব্বা একাই থেকে গেলেন।আল্লাহ তাঁর ছায়া দীর্ঘ করুন সিহ্হত-আফিয়তের সাথে।

মনে পড়ে, বাসায় রমজানে তারাবীহর জামাত হত।আমি এবং আমার আপন ও খালাত ভাইরা নামাজ পড়াতাম। আব্বা ও খালু থাকতেন। নানাজান বেঁচে থাকতে কখনো তিনিও এসে যোগ দিতেন। অন্য ঘরে থাকতেন মা-খালারা। দেখতে দেখতেই সব স্মৃতি হয়ে গেল। এই দিনগুলি দুনিয়াতে আর কখনো ফিরে আসবে না। আল্লাহ মেহেরবান আপন মেহেরবানীতে জান্নাতে সবাইকে একত্র করুন। আমাদেরকে এমন আমল করার তৌফীক দান করুন।

০৬ —

খালুজান জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দীর্ঘদিন অনেক কষ্ট করেছেন।কঠিন রোগ-শোকে ভুগেছেন।অনেকদিন নিথর-নিস্তব্দ হয়ে পড়েছিলেন বিছানায়।বোধশক্তি পুরোপুরিই ছিল।ফলে কষ্টের অনুভূতিটা ঠিকই ছিল।ইনশাআল্লাহ এসব তাঁর মাগফিরাত ও দরজাবুলন্দির ওসীলা হবে।প্রচন্ড অসুস্থতার সময় যখন কাছে যেতাম, খুব খুশী হতেন। বলতাম, খালুজি, আপনার এত চিন্তা কীসের? আমরা সবাই আপনার জন্য খুব দোয়া করছি। আর এসব অসুস্থতার কারণে আল্লাহ আপনার দরজা বুলন্দ করছেন! এসব শুনে খালুর মুখটা উজ্জল হয়ে যেত।অনেক সময় মুচকি হাসি ফুটে উঠত মুখে।

খালুর রঙ বলতে গেলে কাল মতই ছিল। কিন্তু আশ্চর্য, শয্যাশায়ী হওয়ার পর থেকে তাঁর মুখের রঙ উজ্জল হতে থাকে। মৃত্যুর পর তো এই উজ্জলতা আরো বেড়ে যায়। মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, কী যে শান্তির এক ঘুম দিয়েছেন! ইনশাআল্লাহ এসব তাঁর জন্য নেক আলামত, তাঁর মাগফিরাতের নিদর্শন।

খালুজান অনেক সুন্দর দৃষ্টান্ত কায়েম করে গেলেন। বড় প্রফেসর-অধ্যাপক হয়েও ২৫ জন হাফেজ-হাফেজার ও একাধিক আলিমের বাবা-নানা-দাদা। নামকরা অধ্যাপক-লেখক-প্রিন্সিপাল হয়েও এমন দীনি, পরহেযগারি ও আযীমতপূর্ণ জীবন। দীন ও দুনিয়া উভয় দিক থেকে উচ্চ পর্যায়ের হয়েও এতটা সাদামাটা জীবন!!

জীবনভর নানাজানের কাছাকাছি থেকেছেন।তাঁর সঙ্গ লাভ করেছেন, তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন।তাঁর আদর্শ মত পরিবার গড়েছেন। তাঁর জামাতা হওয়ার লায রেখেছেন, এর হক আদায় করেছেন।খালুর কী ভাগ্য,মৃত্যুর পরও নানাজানের পাশেই কবরস্থিত হয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁদের মাগফিরাত করুন, জান্নাতে তাঁদের দারাজাত বুলন্দ করুন। আমাদের প্রতিও আল্লাহ রহম করুন, কোরআন ও ইলমে দীনের পথে রাখুন, আমল করার তৌফীক দান করুন।

-ইজে

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনায় মারা গেলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
পরবর্তি সংবাদবেগমগঞ্জে মামলা তুলে না নেওয়ায় ঘরে ঢুকে যুবককে গুলি