মেরাজ থেকে শিক্ষা ও ধর্মদ্রোহিতার উৎস সন্ধান

মাওলানা আবরারুল হক ।।

ইসরা ও মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপযপূর্ণ একটি ঘটনা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার প্রিয় বান্দা মুহাম্মাদকে এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করান। এ অংশের নাম হলো ইসরা। এরপর তিনি মসজিদুল আকসা থেকে সপ্তাকাশ পাড়ি দিয়ে জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন। এ অংশের নাম হলো মেরাজ। সবশেষে সে রাতেই মক্কায় ফিরে আসেন। তবে সাধারণভাবে আমরা সম্পূর্ণ  ঘটনাকেই মেরাজ বলে থাকি।

 

মেরাজের পরদিন নবীজী মক্কার লোকজনের কাছে ঘটনার বিবরণ দেন। তখন মক্কার কুরাইশরা এই অলৌকিক বিষয় বিশ্বাস করতে পারেনি। পরবর্তীতে প্রাচীন দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও মেরাজের সম্ভাব্যতার ওপর প্রশ্ন হতে থাকে। যেমন:

  • পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে সবকিছু ভূপৃষ্ঠে অবস্থান করে। এই আকর্ষণ কাটিয়ে মহাশূণ্যে যাওয়া অসম্ভব।
  • একমাত্র পৃথিবীর বায়ুমন্ডলই মানবজাতির জীবনধারণের উপযোগী। এর বাইরে গেলে মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
  • প্রাচীন বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বাইরে যে শৈত্যমন্ডল ও উষ্ণমন্ডল রয়েছে, তা অতিক্রম করে যাওয়া-আসা কোনোটাই সম্ভব নয়।

 

এসব তত্ত্বের কারণে যুগে যুগে অনেক বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীশ্রেণীর মানুষ মেরাজের বিষয় নিয়ে সংশয়ে ছিল। এমনকি অনেক মুসলিম গবেষক মেরাজ অস্বীকারও করে বসে। এ ধরনের চিন্তাভাবনা ও সন্দেহ-সংশয় থেকেই স্যার সৈয়দ আহমদের মত মুজিযা অস্বীকারকারী দল সৃষ্টি হয়। তারা না আল্লাহর অসীম কুদরতে বিশ্বাস করতে পেরেছে আর না মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর কথায় আস্থা রেখেছে।

 

বর্তমানে বিজ্ঞানের উন্নতি আমাদের জন্য মেরাজের বিষয়টি বোঝা ও মেনে নেওয়া সহজ করেছে।  যানবাহন অনেক দ্রুতগামী হয়েছে, প্রতিনিয়ত আরও হচ্ছে। আর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে হার মানিয়ে বহুদিন আগেই মানুষ চাঁদের দেশে পা রেখেছে। নভোচারীরা মহাকাশ স্টেশনে দিনের পর দিন অবস্থান করছে। তাই বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আজ যেটা অসম্ভব, কাল সেটাই সম্ভব।

 

দুঃখজনক বিষয় হলো, অনেক মুসলিমকে দেখা যায় যে, তারা নিজেকে অবশ্যই ঈমানদার মনে করেন; কিন্তু ঈমান-ইসলামের কোনো কোনো বিষয় গ্রহণ করতে অস্বীকার বা ইতস্তত বোধ করেন। বিভিন্ন মতবাদ বা বিজ্ঞানের কোনো থিওরীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তারা এমনটি করে থাকেন। অথচ, ধর্মীয় কোনো বিধান বা ঘটনা নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, মতবাদ-আদর্শ বা যুক্তি-বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রাখলে গ্রহণ করা আর সামঞ্জস্য না রাখলে গ্রহণ না করার মানসিকতা ঈমানের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

 

এখানে দুইটি বিষয় লক্ষণীয় :

১. কোনো মতবাদ-আদর্শ ও যুক্তি-বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও তথ্যগুলোর কোনো স্থিরতা নেই। এগুলো সদা পরিবর্তনশীল। তাই এগুলোর ওপর নির্ভর করে কোনো চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছা যায় না।

২. যে সব বিষয় কুরআন-হাদীস দ্বারা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত সেগুলো বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়াটাই ঈমানের দাবী। মুমিনের সবচেয়ে দামী সম্পদ ঈমান সুরক্ষার এটাই একমাত্র পথ।

 

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া মদীনাতুল উলুম, খাড়াকান্দি, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা

-ইজে