ভাষা আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী

সাঈদ হোসাইন ।।

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও সাংবাদিক। মুসলিম যুগের চট্টগ্রামের সরকারি নাম ইসলামাবাদের নামানুসারেই তিনি নিজের নাম ইসলামাবাদী রাখেন। তিনি ১৮৭৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার আড়ালিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে হুগলী মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তিনি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করলেও নিজ চেষ্টায় বাংলা শিখেন। তাছাড়া আরবী, উর্দুতেও যথেষ্ঠ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। কলকাতায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদের পিতা মাওলানা খায়ের উদ্দীন এর সান্নিধ্য লাভ করেন। মাওলানা ইসলামাবাদী উচ্চশিক্ষা জীবন শেষে প্রথমে রংপুর হারাগাছ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। তিনি মুসলিম সংস্কারমূলক সাময়িকী সোলতান (১৯০১), হাবলুল মতিন (১৯১২), মুহাম্মদী (১৯০৩), কোহিনূর (১৯১১), বাসনা (১৯০৪) ও আল-এসলাম (১৯১৩) পত্রিকার সম্পাদনা বা প্রকাশের দায়িত্ব পালন করেন।

একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে ইসলামাবাদী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সমর্থন করেন এবং বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি সক্রিয়ভাবে অসহযোগ এবং খিলাফত আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। মওলানা ইসলামাবাদী আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালার (১৯১৩) অন্যতম সংগঠক ছিলেন। এটি পরবর্তীকালে ‘জামিয়াত-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালাহ’ হিসেবে পরিচিত লাভ করে। আঞ্জুমানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বাংলা ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলা। তিনি জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং তিনি ১৯২২ ও ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠান করেন। তিনি সংগঠনটির চট্টগ্রাম শাখা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর সভাপতি নিযুক্ত হন। ইসলামাবাদী চট্টগ্রামে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে না থাকায় তা সম্ভব হয় নি।

[তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, দৈনিক সংগ্রাম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭]

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন ভাষা আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে ছিল তাঁর জোরালো সমর্থন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের নেতারাও তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে জনাব আহমদ হোসাইন প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমের ভাষা আন্দোলনে অবদানের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, স্বজাতির কল্যাণ কামনার চেতনা ও সজাত্ব্যবোধের ক্ষেত্রে তিনি মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন। এই অনুপ্রেরণাই তাকে ভাষা আন্দোলন পরিচালনা ও বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় উদ্ভুদ্ধ করছে। (মুকুল চৌধুরী সম্পাদিত, অগ্রপথিক সংকলন ভাষা আন্দোলন, প্রকাশনায়: ঢাকা ই.ফা.বা, প্রকাশকাল: ১৯৯৩, পৃ. ৮০৫)

বাংলা ১৩৫০ সালের মাসিক মোহাম্মদীর কার্তিক সংখ্যায় আবুল মনসুর আহমেদ তার ‘পূর্ব-পাকিস্তানের জবান’-এ লিখেছেন, বাংলার মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা হবে কি উর্দু হবে, এ-তর্ক খুব জোরে-শোরে একবার উঠেছিল। মুসলিম বাংলার শক্তিশালী নেতাদের বেশির ভাগ উর্দুর দিকে জোর দিয়েছিলেন। নবাব আবদুর রহমান মরহুম, স্যার আবদুর রহিম, মৌ. ফজলুল হক, ডা. আবদুল্লাহ সুহরাওয়াদী, মৌ. আবুল কাসেম মরহুম প্রমুখ প্রভাবশালী নেতা উর্দুকে বাঙালি মুসলমানের ‘মাতৃভাষা’ করবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম বাংলার সৌভাগ্য এই যে, উর্দু-প্রীতি যাদের বেশি থাকবার কথা, সেই আলেম সমাজই এই অপচেষ্টায় বাধা দিয়েছিলেন। বাংলার আলেম সমাজের মাথার মণি মওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা আবদুল্লাহেল বাকী, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, উর্দু-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব করেছিলেন। এঁদের প্রয়াসে শক্তি যুগিয়েছিলেন মরহুম নবাব আলী চৌধুরী সাহেব। সে লড়াই-এ এঁরাই জয়লাভ করেছিলেন। বাংলার ওপর উর্দু চাপাবার সে-চেষ্টা তখনকার মতো ব্যর্থ হয়।
(http://bonikbarta.net/bangla/print.php?id=28980&&date=2015-02-19)

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী রহ. বলেন, দেশময় উর্দু ভাষার প্রসার ও বিস্তৃতি একান্ত বাঞ্ছনীয় হলেও তাকে কোন প্রদেশের মাতৃভাষা করা সম্ভব হবে না। বঙ্গীয় মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা। এদেশে বাংলার স্থলে উর্দুর প্রচলন সম্ভবপর কিনা, চিন্তার বিষয়। আমাদের সেই আশা নেই। এ সম্ভবপর বলিয়া মনে করি না। তবে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের পক্ষে ন্যূনাধিক উর্দু শিক্ষা করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। (ড. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, রাজনীতিতে বঙ্গীয় উলামার ভূমিকা, প্রকাশক: ইসলামিক ফৌন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রকাশকাল: দ্বিতীয় সংস্করণ নভেম্বর ২০০২, পৃ. ৪৭)

মাতৃভাষা বাংলার জন্য মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর এই গৌরবময় ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।

পূর্ববর্তি সংবাদযাত্রী সালমান, ড্রাইভার ইমরান খান
পরবর্তি সংবাদবন্ধ হচ্ছে ১৫ হাজার পর্নো ও ২ হাজার জুয়ার সাইট, আরো ৫৬ সাইট বন্ধের নির্দেশ