আতাউর রহমান খসরু ।।
আজ মারকাযুদ্দাওয়াহ আলইসলামিয়া, ঢাকার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের জন্য প্রেরণামূলক আলোচনা অনুষ্ঠান ও আনন্দ-আয়োজনের। অনুষ্ঠানে ঢাকা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার পাশাপাশি ছিলো প্রশ্নোত্তর ও কুইজ পর্ব।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিজেদের মুগ্ধতা ও ভালোলাগার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। অন্যদিকে আয়োজকরা মনে করেন, সারাদেশে এই ধরনের আয়োজন ছড়িয়ে পড়লে আরও কল্যাণকর হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এমন প্রেরণামূলক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ও তার উদ্যোগ গ্রহণ কেন দরকার সেই বিষয়ে কথা হয় দেশের দুইজন বিশিষ্ট আলেমের সঙ্গে। তারা হলেন, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার প্রধান মুফতি ও সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি হিফযুর রহমান এবং মাদরাসায়ে দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সিনিয়র সহ-সম্পাদক মাওলানা লিয়াকত আলী।
এই চিন্তাশীল আলেমরা মনে করেন, দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বীনি শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে। উলামায়ে কেরাম এই বিষয়ে তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।
মাওলানা লিয়াকত আলী বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নূন্যতম দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দায়িত্ব প্রধানত রাষ্ট্রের। মুসলিম দেশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের ইসলাম শেখানো রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু রাষ্ট্র যেহেতু দায়িত্বপালন করছে না তাই উলামায়ে কেরামকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সেটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও হতে পারে আবার অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবেও হতে পারে। যেমন নৈশ মাদরাসা, কুরআন ও মাসায়েল শিক্ষার কোর্স, দ্বীনি সেমিনার, মসজিদভিত্তিক দ্বীনি তালিম, ছুটির দিনে বিশেষ কোর্স ও হক্বানি উলামায়ে কেরামের মজলিস ইত্যাদি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও তা পালিত না হওয়ার বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন মাওলানা লিয়াকত আলী, সরকারের দায়িত্ব ছিলো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। ধরুন! প্রাইমারি লেবেলে ধর্মীয় শিক্ষা নেই। অথচ এই সময়ে শিক্ষা শিশুর মানসিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা বড় একটা গ্যাপ। এরপর হাইস্কুল পর্যায়ে রয়েছে কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এরপর তো ধর্মীয় শিক্ষা ঐচ্ছিক। তাহলে, ১৭ বছরের শিক্ষা জীবনে একজন শিক্ষার্থী ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ৫ বছর। এরপর হাইস্কুল স্তরে যারা ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদান করেন –তাদের যোগ্যতা ও আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
যদি তাদের জন্য দ্বীনি শিক্ষার আয়োজন করা না যায় তাহলে কী ক্ষতি হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মুফতি হিফযুর রহমান বলেন, আলেমদের এই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। না হলে বিশাল ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। দ্বীনই মানুষের জীবনের আলো। এই আলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে তারা অন্ধকারে থেকে যাবে।
প্রবীণ আলেম ও মুহাদ্দিস আরও বলেন, আমাদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বহুজন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন দেশের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে পর্যাপ্ত পরিমাণ ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা নেই। এই শিক্ষাব্যবস্থায় যারা শিক্ষা অর্জন করছে তাদের দ্বীনি শিক্ষায় অপূর্ণতা থেকেই যায়। আর এই অপূর্ণতার কারণে দেশ, জাতি, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, ‘অসততা ও অনৈতিকতার কারণে দেশের উন্নতি হচ্ছে না।’ সেটা কেন হচ্ছে? কারণ, যারা এই অনৈতিক কাজগুলো করছে তাদেরকে সঠিক শিক্ষা দেওয়া যায়নি। তাই তাদের জন্য ইসলামি শিক্ষা ও প্রেরণার নানা রকম আয়োজন থাকা দরকার।
মাওলানা লিয়াকত আলী মুফতি হিফযুর রহমানকে সমর্থন করে বলেন, কুফল সমাজের দিকে তাকালে লক্ষ করা যাবে। নৈতিকতার দীক্ষা না থাকায় কর্মজীবনে গিয়ে তারা দুর্নীতিতে ডুবে যেতে দ্বিধা করে না। পুরো সমাজই তো দুর্নীতিতে আক্রান্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী এই আলেমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা দ্বীনি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দিলে তাদের পড়ালেখায় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কী না? ‘একজন মুসলমানের জন্য যতোটুকু শিক্ষা অর্জন করা ফরজ তা অর্জন করতে গেলে কোনো চাপ পড়ে না। সে যে বিভাগে এবং যে স্তরেই পড়ুক না কেন। হ্যা, যদি একটু গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চায় সে ক্ষেত্রে সময় একটু বেশি দিতে হয়। প্রয়োজন শুধু মনোযোগ ও সময়ের সঠিক ব্যবহার।’ –উত্তর দেন তিনি।
তিনি তার শিক্ষাজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বলেন, আমি দেখেছি, যারা উলামায়ে কেরামের সাথে সম্পর্ক রাখে এবং যারা রাখে না তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যারা উলামায়ে কেরামের সাথে সম্পর্ক রাখে তাদের ভেতর দ্বীনের যে বোধ ও চেতনা কাজ করে তা অন্যদের মধ্যে থাকে না। নীতি-নৈতিকতার বাছ-বিচার থাকে না।
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আলেমদের কাছে না এলেও তাদের নিয়ে ভাবতে হবে বলে মনে করেন মুফতি হিফযুর রহমান। তার ভাষায়, তারা না এলেও আলেমদের দায়িত্ব দ্বীনি শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া শিশুদের জন্য চিন্তা-ফিকির করা। কারণ, আলেমরা নবীর উত্তরসূরী। নবীর উম্মতদের আপন করে নেওয়া তাদের দায়িত্ব।
একই কথা বলেন মাওলানা লিয়াকত আলী। ‘আলেমদের দায়িত্ব মনে করতে হবে। দায়িত্ব মনে করে সবার জন্য ইসলামি শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য কাজ করে যেতে হবে। আর এটা সবাই করবেন এবং সামগ্রিকভাবেই করবেন।’
মুফতি হিফযুর রহমান এই ক্ষেত্রে তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। তাহলো, এক. দেশের প্রতিটি মসজিদকে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। তার মতে, এই কাজটি সবচেয়ে ভালো করতে পারবেন মসজিদের ইমামরা। কারণ, মসজিদে সর্বশ্রেণির মুসলিমরা আসে। ইমাম যদি একটু সচেতন হন তাহলে তিনি মসজিদকে একটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারেন। যেমন, তিনি সপ্তাহে একটি তাফসির করলেন, একদিন মাসায়েল শেখালেন, একদিন সমকালীন ও সামাজিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললেন, একদিন জিকিরের মজলিস করলেন। অনেক ইমাম ও খতিব তা করেনও।
দুই. মসজিদে মসজিদে হজরত শাহ আবরারুল হক রহ.-এর এক মিনিটের মাদরাসা বইটির তালিম হতে পারে।
তিন. স্কুল-কলেজের পরিচালকদের যদি দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝানো যায় তাহলে আরও ভালো হয়। ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ফয়জুর রহমান –তিনি যেমন শিশুদের জন্য টুপি ও নামাজের ব্যবস্থা করেছিলেন, বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন সেটাও অনুসরণযোগ্য। মতিঝিল আইডিয়াল আরেকটি জিনিস প্রমাণ করেছেন নূন্যতম ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করলে শিক্ষার কোনো ক্ষতি হয় না। বরং তাতে উন্নতিই হয়।
















