আতাউর রহমান খসরু ।।
বায়ু দূষণকে বলা হয় নীরব ঘাতক। নীরবে মানুষের জীনবশক্তিকে ক্ষয় করে বায়ু দূষণ। প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য বায়ু দূষণকে দায়ী করেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি আইকিউএয়ার, এয়ারভিস্যুয়াল ও গ্রিনপিসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্বের বায়ু দূষিত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১ম। শহর হিসেবে ঢাকার অবস্থান ১৭ তম।
দেশের পরিবেশগত এই বিপর্যয়ের পেছনে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থার অভাব, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং জন সচেতনতার অভাবকে দায়ি করেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।
হাজারীবাগ শাহি মসজিদের সাবেক ইমাম ও খতিব এবং এলাকার দীর্ঘ দিনের বাসিন্দা মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বায়ু দূষণের কারণ তুলে ধরে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রধান কারণ মনে হয় আমার কাছে। এর সাথে যোগ হয়েছে, সমন্বয়হীন উন্নয়ন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর কোথাও আপনি এভাবে একই এলাকায় শিল্প ও আবাসন দেখবেন না। একই এলাকায় শিল্প ও আবাসন হলে মানুষকে দূষণের হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করবেন?
তবে দেশের বিশিষ্ট আলেম ও জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া, আরজাবাদ, ঢাকার প্রিন্সিপাল মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া মনে করেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, উদ্যোগ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব পরিবেশ ও বায়ু দূষণের অন্যান্য কারণগুলোকে উৎসাহিত করছে।
তিনি বলেন, সরকারের প্রচেষ্টা যদি জোরদার হতো এবং পরিবেশ নীতিমালা ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হতো তবে নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হতো। তারাও আইন ও নীতি মেনে চলতে উৎসাহিত হতো। কিন্তু আমরা দেখি, শিল্পাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগ নেই, যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান বায়ু দূষণের জন্য মারাত্মকভাবে দায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিশেষ কোনো আইনি ব্যবস্থা নেই। তাহলে সাধারণ মানুষ পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব কীভাবে বুঝবে!?
একই কথা বললেন মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী। তার ভাষায়, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় নাগরিকরা সচেতন নয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আইন মানছে না। এই যে, সচেতন হয়ে না ওঠা এবং আইন মান্য না করা এই দায় কী সরকারের না? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হওয়ার পরও এভাবে অন্যকে দোষারোপ করার অর্থ হলো নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা সময় সাপেক্ষ বিষয় মেনে নিলাম। কিন্তু আইন প্রয়োগে বাধা কোথায়?
মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া অবশ্য বাধার কিছু দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রশাসন নির্বিঘ্নে কাজ করতে না পারার দুটি কারণ, এক. প্রশাসনে জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই, দুই. এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতাধরদের স্বার্থ জড়িত থাকে। আবার প্রশাসন তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন তাও নয়। যেমন, কিছুদিন আগে বুড়িগঙ্গা নদীর দুইপাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান শুরু হয়। কিন্তু দুই বা তিন দিনের মধ্যে অভিযান বন্ধ হয়ে গেলো। নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তার বদলি হয়ে গেলো। কেন হলো কেউ জানে না। এই ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরের দায়িত্বশীলদের কঠোর হতে হবে।
পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে প্রশাসন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে যেমন দোষারোপ করছে, তেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালকরাও অভিযোগ করে বলছে, সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উপযুক্ত ভূমি ও সমন্বিত পরিকল্পনা দিতে পারছে না সরকার। পারস্পরিক এই অভিযোগ কতোটা সত্য? মাওলানা আহমদ আলী বলেন, ব্যবসায়ীদের কথাও মিথ্যা না। সরকারকে সুষ্ঠু কোনো বর্জ্য ব্যবস্থা করতে দেখা যাচ্ছে না।
অবশ্য মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া এককভাবে কাউকে দায়ি করতে রাজি নন। তার ভাষায় এককভাবে কাউকে আমি দোষ দিবো না। ব্যবসায়ীরা সরকারকে দোষারোপ করছে। আবার তারাই অবৈধভাবে সরকারের কাছ থেকে সুযোগ নিচ্ছে। মূলত উভয়পক্ষের সদিচ্ছার অভাব আছে।
তার কাছেই প্রশ্ন করেছিলাম, পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ রোধে সরকারের আরও কঠোর হওয়া উচিত কী না? তার উত্তর হলো, সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে কঠোর হতে হবে। সরকারের ব্যবস্থা, জনগণের সচেতনতা ও প্রশাসনের সামর্থ্য সবকিছুর উপর নির্ভর করবে সরকার কতোটা কঠোর হবে।
আর মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী বলেন, সাধারণ নাগরিকের সচেতনতার মাধ্যমে যতোটুকু উন্নয়ন সম্ভব নাগরিক সেটা করবে। আর নাগরিক না করলে সরকার হস্তক্ষেপ করবে। সবাই সচেতন হবে এমন আশা করা যায় না। সরকারের দায়িত্ব যারা পরিবেশ নষ্ট করছে তাদেরকে প্রতিহত করা।
তবে উন্নয়নের ভিন্ন একটি নির্দেশনাও দেন এই আলেম। ‘রাসুল সা.-এর সুন্নাতের অনুসরণ আমাদেরকে পরিবেশের বিপর্যয় ও বায়ু দূষণের মতো আরও অনেক বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। রাসুলুল্লাহ সা. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ বলেছেন, নিজের বাড়ি-ঘর ও আশপাশ তথা পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মানুষের ক্ষতি হতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন, ছায়া দেয় এমন গাছের নিচে বসে প্রশ্রাব করতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, এতে মানুষের কষ্ট হতে পারে। আবার বলা হয়েছে, রাস্তা থেকে কষ্টকর জিনিস সরিয়ে দেওয়া ঈমানের দাবি বা অংশ।
মানুষ যেন সুন্নাত পরিপালন করে দুনিয়া ও আখেরাতের মুক্তি ও কল্যাণ লাভ করতে পারে সে চেষ্টা প্রধানত সমাজের আলেম-উলামা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর করতে হবে বলে মনে করেন মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া।
মাওলানা আহমদ আলী দীর্ঘদিন হাজারীবাগ শাহী মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন। তখন কী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি? আলাপ-আলোচনায় সচেতন করার চেষ্টা করেছি। দায়িত্বের পুরোটা করতে পেরেছি এমনটা দাবি করবো না। আমি রাজনীতির সাথে জড়িত বলে কাজ করারও খুব সহজ ছিলো না। স্থানীয়ভাবে যে কোনো কাজ সরকার ও সরকার বিরোধী মনোভব থেকে মূল্যায়ন করা হয়। তবে স্থানীয়ভাবে কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন গড়ে উঠেছে। আমি তাদেরকে উৎসাহিত করেছি। জানান এই আলেম।
















