ঐতিহ্যের নগরী বোখারা : উত্থান-পতনের গল্প

আতাউর রহমান খসরু ।।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও ঐতিহ্যের সম্পদে সমৃদ্ধ উজবেকিস্তানের প্রাচীনতম নগরী বোখারা। ইসলামের সোনালী যুগের ইতিহাসে যে কয়টি নগরীর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে এবং যে নগরগুলো ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে আলোচিত হয়েছে তার অন্যতম বোখারা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও বোখারা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো প্রাচীনকাল থেকে। মধ্যযুগে মধ্যএশিয়া জুড়ে এই নগরীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিলো অনস্বীকার্য। হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল বোখারি, আলি ইবনুল মাদানি, ইসহাক ইবনে রাহভিয়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা, প্রখ্যাত সাধক আলেম বাহাউদ্দিন নকশাবন্দি ও ওবায়দুল্লাহ আহরারের মতো বিখ্যাত মনীষীর জন্ম হয় এই নগরীতে।

মধ্য এশিয়ার প্রাচীনতম এই নগরীর গোড়াপত্তন হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ বছর পূর্বে। তবে তারও বহু বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব ২ হাজার পূর্বে (তাম্র যুগ) এই অঞ্চলে মানুষের আবাস গড়ে ওঠে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। পারস্যের মহাকবি ফেরদাউসের বর্ণনা মতে কায়কাউসের পুত্র সিয়াভাশ বোখারা নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। তবে বোখারার সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক মর্যাদা মুসলিম শাসকরাই দান করেন। ইসলামপূর্ব যুগের ইতিহাসে বোখারাকে একটি বাণিজ্যিক নগরী হিসেবেই পাওয়া যায়। কিন্তু মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার বোখারা অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও উন্নত নাগরিক জীবন সবকিছুতেই অনন্য হয়ে ওঠে।

বোখারা নগরীতে সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ রহ.। তিনি হজরত মুয়াবিয়া রা.-এর সময় খোরাসানের গভর্নর (৬৮৭-৭০৬ খ্রি.) হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি প্রথম নদী (বর্তমান নাম আমু দরিয়া ও সাইর দরিয়া) পার হয়ে মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলে (মধ্যএশিয়া) অভিযান পরিচালনা করেন। তখন তার বয়স মাত্র ২৫ বছর। সে সময় ‘খাতুন’ নামের এক নারী বোখারা শাসন করতেন। মুসলিমদের বিরুদ্ধে তিনি তুর্কিদের সাহায্যগ্রহণ করেন। ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ রহ. মাত্র ২৪ হাজার সৈনিক নিয়ে সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। খাতুনকে বাধ্য করেন নিরাপত্তা চুক্তি করতে।

বোখারার চূড়ান্ত বিজয় হয় কুতাইবা ইবনে মুসলিম রহ.-এর হাতে। খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালেকের সময় তিনি খোরাসানের শাসক (৮৬-৯৬ হি.) হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি ৯০ হিজরিতে তৎকালীন শাসক আনজাক (অর্থ খোদার বীর)-কে পরাজিত করে বোখারার চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত করেন। সেখানে তিনি একটি শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তোলেন। এরপর থেকে ৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বোখারা খোরাসানের অধীন ছিলো।

এই সময় সামানি (বা সামানিদ) শাসনের সূচনা হয়। ইসমাইল ইবনে আহমদ আস-সামানি বোখারাকে (খোরাসান ও মাওয়ারউন-নাহার অঞ্চল নিয়ে গঠিত) তার রাজ্যের রাজধানী ঘোষণা করেন। মূলত তার সময় বোখারা তার স্বর্ণযুগ পার করে। সামানিরা বোখারাকে একটি আধুনিক নগরীর পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র ভূমিতে পরিণত করে। সামানিদের প্রচেষ্টায় বোখারা জ্ঞানী-গুণীদের তীর্থে পরিণত হয়। হাদিসশাস্ত্রের কীর্তিপুরুষ ইমাম বোখারি রহ.-এর জন্ম সামানিদের যুগে।

ঐতিহাসিক আবু মনসুর সআলাবি এই যুগকে বোখারার ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সামানিদের শেষ সময়ে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির সাথে সাথে বোখারার জৌলুসও কমতে থাকে। ৬০৪ হিজরিতে (১২০৭ খি.) খাওয়ারিজমদের হাতে সামানিদের পতন হলে বোখারা নতুন করে জেগে ওঠে। খাওয়ারিজমিদের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে তারা বোখারা বহুমুখী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু ৬১২ হিজরিতে মোঙ্গলীয় শাসক চেঙ্গিস খান বোখারাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে।

৯০৫ হিজরিতে উজবেক মুসলিম শাসকরা বোখারা উদ্ধার করেন। উজবেক শাসক ওবায়দুল্লাহ বিন মাহমুদ ও আবদুল্লাহ বিন ইসকান্দারের সময় বোখারা আবারও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়।

ইমাম গাজালি রহ. লেখেন, এই সময় বোখারার শাসকরা আরব ও আজমের (হিন্দের) জ্ঞান ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের বোখারায় বসবাসের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখেন। মোঙ্গলীয় দুঃশাসনে সেসব মুসলিম মনীষী এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যান তাদের ও তাদের পরিবারকে ফিরিয়ে এনে নিজ নিজ পুনর্বহাল করা হয়।

উজবেকীয় এই শাসনকালকে বলা হয় দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ। মুসলিম শাসন আমলের স্মৃতিধারণ করে আছে বোখারার ১৪০টি ঐতিহাসিক নিদর্শন। যার মধ্যে রয়েছে, মাদরাসা মসজিদ ও প্রাচীন দুর্গ ও রাজভবন। ইউনোস্কো বোখারাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেইজ সাইটের মর্যাদা দিয়েছে।

বোখারার এই স্বর্ণ যুগ ও স্বস্তিকর নাগরিক জীবনের পতন ঘটে রুশদের হাতে। নাদের শাহ-এর হাতে উজবেকদের পতন হয় ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পারিবারিক দ্বন্ধে শাহ বংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতা সুযোগ নেয় রুশ বাহিনী। তারা ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়া বোখারার উপর প্রথম আগ্রাসন চালায় এবং এর উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নেয়। ১৯২৪ সালে রুশ আগ্রাসনের মুখে বোখারার শেষ শাসক আলিম খান বিন আবদুল আহামদ খানের পতন হয়।

রুশদের হাতে ২৪ মার্চ ১৯২৪ সালে রুশদের হাতে বোখারার পতন হলে সেখানে মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়। রুশ বলশেভিকরা পুরো অঞ্চলে আজান, নামাজ ও ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। তারা মুসলমানের মসজিদ-মাদরাসাকে সিনেমা হল ও পানশালায় পরিণত করে। শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকি উসমানি তার বোখারা সফরে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠার পরবর্তী চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, এই যে তুর্কিস্থান, যা ইতিহাসে তুর্কিস্থান, তুরান আবার কখনো ফারেহান নামে প্রসিদ্ধ, তার আয়তন এত বড় ছিল যে, সমগ্র হিন্দুস্থান, পাকিস্থান, বাংলাদেশ ও সাউদী আরব মিলেও তার সমান হওয়া কঠিন। কিন্তু রুশরা একে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলেছে।

তিনি আরও বলেন, আর জুলুম-নির্যাতনের এমন দাস্তান কায়েম করেছে যে, দুনিয়ার আর কোথাও এর নজির পাওয়া মুশকিল হবে। সেখানে আজান নিষিদ্ধ করা হলো। মসজিদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। নামাজ পড়ার অনুমতি ছিলো না। কালিমা পড়ার অনুমতি ছিলো না। মসজিদগুলোকে কোথাও সিনেমা হলে পরিবর্তন করা হলো, কোথাও গুদাম, কোথাও ওয়ার্কশপ, আবার কোথাও অফিস বানানো হলো। কেউ নামাজ পড়তে চাইলে তার উপর এমন পাশবিক ও ভয়ানক শাস্তি নেমে আসত, যার দৃষ্টান্ত পাওয়া না।

আল্লামা তাকি উসমানি সেই সময়ের ইসলাম চর্চার চিত্রও তুলে ধরেন তার সফরনামায়। তিনি বলেন, আজ মোল্লাদের নিন্দা করার লোক অনেক আছে। কিন্তু তারা জানে না যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের মাধ্যমেই তার কালিমাকে হেফাজত করেছেন। সেখানে অনেক আলিমের সাথে আমাদের দেখা হয়েছে। তারা খুব ভালো আরবি বলেন। তো যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি, ভাই আপনি আরবি কোথায় শিখেছেন তিনিই উত্তরে বলেছেন, ‘হুজরাতে শিখেছি’। হুজরা মানে কক্ষ। প্রত্যেক মোল্লার বাড়িতে গোপন ঘরে ইলম চর্চার যে ব্যবস্থা ছিল -এরই নাম হুজরা। সাধারণ মানুষ সুখ-নিদ্রায় বিভোর হত আর তারা দ্বীনের চর্চায় মশগুল হতেন। এভাবে আল্লাহ তাদের ঈমান হেফাজত করেছেন।

destroed mosque of bukhara in the soviet era এর ছবির ফলাফল

তবে ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সেখানে নতুন করে ইসলামি শিক্ষা ও মুসলিম জীবনাচারের প্রসার ঘটছে। আল্লামা তাকি উসমানি তার বর্ণনাও দিয়েছেন, শেষ দিকে রুশ সরকারও কিছু মসজিদ-মাদরাসা খুলে দিয়েছিল। মানুষ গেলে দেখাত যে, আমাদের এখানে মসজিদ-মাদরাসা আছে। কিন্তু এর সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। রুশদের সময় সবচেয়ে বড় মাদরাসা ছিল তাশখন্দে, তাতে সর্বোচ্চ চল্লিশ জন ছাত্রের পড়ার অনুমতি ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর এখন ছোট ছোট মাদরাসায় গিয়ে দেখুন, কোথাও ছাত্রসংখ্যা দুই শত, কোথাও পাঁচশত আবার কোথাও হাজার। আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে তালিবে ইলমের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রুশ অপশাসনের কিছু প্রভাবও থেকে গেছে। যেমন, ইসলামি পঠনসামগ্রির তীব্র অভাব রয়েছে সেখানে। আল্লামা তাকি উসমানির বর্ণনা মতে কুরআন মাজিদের নুসখা তাদের কাছে নেই। মসজিদ মুসল্লি দ্বারা পরিপূর্ণ। কিন্তু কুরআনের নুসখা নেই।

বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য নুরানি কায়দা নেই। যে কপিটি পড়ানো হচ্ছিলো তা দেখলাম ১৯১৭ সনের ছাপা। অর্থাৎ রুশ বিপ্লবের সময়কার। তা-ই ফটোকপি করে পড়ানো হচ্ছে। এই রকম উপায়-উপকরণহীন অবস্থায় সময় কেটেছে। এরপরে আল্লাহ তাআলা এই ঈমানের মূল্য বোঝার তাওফিক দান করেছেন।

সম্পর্কিত ছবি

পক্ষান্তরে এমনও অনেক ছিল যারা সেই স্রোতে ভেসে গিয়েছে। যারা মোল্লার অধীন ছিলো না। মোল্লার সঙ্গে যাদের সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিলো। তারা এমনভাবে ভেসে গিয়েছে যে, কালিমা জানে না। কালিমা কী জিনিস চিনে না। নাম তো মুসলমান, কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে কিছুই সে জানে না। এই হচ্ছে অবস্থা যা আমরা সেসব এলাকায় প্রত্যক্ষ করেছি।

সূত্র : প্রবন্ধ, বোখারা : ইতিহাস ও সংস্কৃতি; হিস্টোরি অব বোখারা; প্রবন্ধ, আর্লি বোখারা; উইকিপিডিয়া; মাসিক আল কাউসার ও রোর বাংলা

পূর্ববর্তি সংবাদগোলান মালভূমির ওপর ইসরাইলের কোনো অধিকার নেই : এরদোগান
পরবর্তি সংবাদকুষ্টিয়ায় জাসদের হামলায় আ.লীগ কর্মী নিহত