ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী ।।
হিজরতে নববী। মক্কা থেকে মদীনায়। সূক্ষ্ণ পরিকল্পনায় পূর্ণ। ধাপে ধাপে পরিকল্পনা। যেনো থরে থরে সাজানো। আসুন, একটু নজর দিই―
১. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে চলে যেতে বলেছেন মদীনায়, নিজে যাননি। পরিকল্পনার একটি অংশ!
২. হজরত আবু বকর রা. হিজরতের অনুমতি চেয়েছেন, পান নি। আবু বকর যখনই নবীজীর কাছে অনুমতি চাইতে যান, নবীজী বলেন— “لا تعجل لعل الله يجعل لك صاحباً” তাড়া করো না! হয়তো আল্লাহ তোমার কোনো সঙ্গী ঠিক করে দেবেন!পরিকল্পনার একটি অংশ!
৩. সবাই চলে গেছেন। আছেন শুধু আল্লাহর রাসূল। হজরত আবু বকর। এবং হজরত আলী। আলী কেনো থেকে গেলেন? পরিকল্পনার অংশ! প্রিয় আলীকে শুইতে হবে আল্লাহর রাসূলের জায়গায়, ইয়েমেনী চাদর জড়িয়ে! নিতে হবে ঝুঁকি। হতে হবে অবতীর্ণ―ইসলামের প্রথম ‘ফিদায়ী’ হওয়ার কঠিন ময়দানে!
৪. আল্লাহর রাসূল শত্রুবেষ্টিত। বরং রক্ত-ক্ষুধায় মাতাল অনেকগুলো নাঙা তলোয়ারে বেষ্টিত। তবু তিনি বের হবেন। সব ছেদ করে। রাতের আঁধারেই। আল্লাহর নির্দেশ এসে গেছে, ভয় কিসের? মানুষের? তলোয়ারের? না! কোনো ভয় নেই! এই রাতের আগের দুপুরেই তো তিনি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন―রাতেই বেরিয়ে যাবেন ঘর ছেড়ে! তাহলে এখন কেনো দ্বিধা এসে বাসা বাঁধবে মনে? পথ আটকাবে? আল্লাহর নির্দেশ বড় না তীর-তলোয়ারের বাধা বড়?! তিনি বেরিয়ে গেলেন―আকাশের ছায়ায়! স্পর্শহীন! পরিকল্পনা গ্রহণের পরে বাধা এলে―সেই বাধা পথ আটকাতে পারে না! যদি হয় পরিকল্পনাটি আকাশ-পুষ্ট!
৫. নিজের ঘর থেকে আল্লাহর রাসূল বেরিয়ে পড়েছেন―এখন কোথায় যাবেন? আগে থেকেই ঠিক করা সেই জায়গা―সিদ্দীকে আকবরের বাড়ি!
৬. কাছে চলে গেলেন সেই বাড়ির। এখন কোন দিক দিয়ে ঢুকবেন? সদর দরোজা দিয়ে? না! দুশমনের চোখ পড়ে যেতে পারে! কেউ দেখে ফেলতে পারে! ঢুকতে হবে পেছনের বিশেষ প্রবেশপথ দিয়ে! তাই করলেন আল্লাহর রাসূল!
৭. কতোক্ষণ থাকবেন এখানে আল্লাহর রাসূল? কিছু সময় না কিছুদিন? কিছু সময়! কিছুদিন থাকলে হতে পারে বিপদ! ভেস্তে যেতে পারে হিজরতের মহাযাত্রা! কেননা নবীকে নিজগৃহে না-পেলে সবাই সবার আগে খুঁজবে তাঁকে এই আবু বকরের গৃহেই! সুতরাং এ বাড়ি বেশিক্ষণ থাকার জায়গা না!
৮. আল্লাহর রাসূল এখানে এসেছিলেন পরিকল্পনার সিঁড়ি ডিঙিয়ে, বেরও হয়ে গেলেন প্রিয় সঙ্গীকে নিয়ে পরিকল্পনার সিঁড়ি বেয়ে! পরিকল্পনা আর পরিকল্পনা! ধাপে ধাপে। স্তরে স্তরে। …
৯. কিন্তু এখন যাবেন কোথায়? কোথাও থামবেন কি? না সোজা রওয়ানা হয়ে যাবেন মদীনায়? না না, সোজা মদীনায় যাওয়া যাবে না! থামতে হবে। কিন্তু কোথায় থামবেন? পূর্ব -পরিকল্পিত কোনো জায়গায়? অবশ্যই! বরং এই জায়গাটি ঠিক করা―পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো! এখন পরিকল্পিত সেই দুর্গেই তাঁরা আশ্রয় নেবেন―গারে সওরে!
১০. কয়দিন থাকবেন এখানে? একদিন? দুইদিন? না তিনদিন? তিনদিন থাকবেন! কেননা আল্লাহর রাসূলকে না-পেয়ে কুরাইশ বাহিনী―মক্কার আশপাশে এবং মদীনার পথে তাঁকে খুঁজতে থাকবে―রাগে ক্ষোভে জ্বলতে জ্বলতে। প্রথম দিন। দ্বিতীয় দিনও। তুতীয় দিন উত্তেজনা কমে আসবে! হতাশচিত্তে ঘরে ফিরে যাবে! বসে বসে রাগ ঝাড়তে থাকবে! বড় বড় নিঃশ্বাসে হতাশা ছড়াতে থাকবে! রাস্তায় খোঁজাখুঁজি প্রায় বন্ধ হয়ে আসবে! বিশেষজ্ঞরা বলেন―যেকোনো উত্তেজনার স্থিতিকাল মোটামুটি তিনদিন। প্রথমদিন সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় দিন আরেকটু কম। তৃতীয় দিন ঝিমিয়েই পড়ে। এ বিবেচনাতেই গারে সওরের অবস্থানকাল ছিলো তিনদিন।
১১. যে খাবার ও পানীয় সঙ্গে ছিলো, তা তিনদিনের জন্যে যথেষ্ট ছিলো না। তাই খাদ্যসঙ্কট সমাধানে দায়িত্ব পালন করেছেন আমের ইবনে ফোহায়রা। পানি এবং পাথর-গরম দুধ। এ-ও ছিলো পূর্ব-পরিকল্পনার অংশ।
১২. অশান্ত মক্কায় কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে? কুরাইশ নেতাদের কার মুখে কী উচ্চারিত হচ্ছে? এইসব খবরাখবর সংগ্রহ করে গারে সওরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর রা.! একজন দক্ষ দূরদর্শী গোয়েন্দার মতো! থেকেছেন রাতে গারে সওরে―মক্কার লোকেরা ভেবেছে, থেকেছেন মক্কায়―তাদের মাঝে!
১৩. তিনদিন পেরিয়ে গেলেও সন্ধানী দৃষ্টি ছিলো ছড়ানো। মদীনায় যেতে হবে তুলনামূলক নিরাপদ পথে। কে দেখাবে এই পথ? তা-ও ঠিক করা ছিলো আগে থেকেই! অমুসলিম মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও এ কাজের জন্যে নিয়োগ করা হযেছিলো পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে! শেষ দিন রাতের মধ্যপ্রহরের একটু পরেই তিনি গারে সওরে হাজির হয়ে গেলেন!
১৪. কীভাবে যাবেন আল্লাহর রাসূল মদীনায়? বাহন কোথায়? আগে থেকেই ঠিক রা ছিলো! ঠিক করে রেখেছেন হিজরতের মহাসঙ্গী আবু বকর! চার মাস আগ থেকেই! বাহন ছিলো দুটি। একটি নবীজীর। আরেকটি আবু বকরের। এই বাহন তুলে দেয়া হয়েছিলো পথপ্রদর্শকের দায়িত্বে―আবু বকরের ঘর থেকে বের হওয়ার আগে।
১৫. চার সওয়ার। বিন সওয়ারী। একটিতে আল্লাহর রাসূল। একটিতে আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত। অপরটিতে সিদ্দীকে আকবর ও তাঁর স্বাধীন গোলাম―আমের ইবনে ফোহায়রা। রাতের আঁধার কেটে কেটে চলতে লাগলেন তাঁরা মদীনার দিকে! …
১৬. গারে সওরে আবার ফিরে যাই। পরের দিন খুঁজতে খুঁজতে আ্বু জেহেল দলবল নিয়ে চলে এসেছিলো গারে সওরে। এ ইতিহাস আমরা জানি। কিন্তু যে কথাটা স্পষ্ট করে বলতে চাই তা হলো―
আবু বকর তখন ভয় পেয়েছিলেন কেনো? কেনো ছিলো তাঁর কণ্ঠে বিচলন?
‘আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ, ওদের কেউ নিচের দিক দিয়ে তাকালেই-যে আমাদেরকে দেখে ফেলবে! প্রিয় আবু বকরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন আর বললেন আস্থাভরা কণ্ঠে .. নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে―
‘আবু বকর, আমরা মাত্র দু’জন আছি মনে করে এতো বিচলিত কেনো তুমি?! আমাদের সঙ্গে তো আল্লাহও আছেন!’
কেনো এই পার্থক্য? কেননা প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন নবী! আর আবু বকর ছিলেন শুধুই একজন উম্মতী! আল্লাহর রাসূল সব পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন একে একে! তারপরও যেহেতু শত্রু কাছে চলে এসেছে, তখন তাদের ঠেকানো মোটেই তাঁর চিন্তার বিষয় না―ঠেকাবেন আল্লাহ! শুধু আল্লাহ! বান্দার পরিকল্পনা যেখানে সমাপ্ত, আল্লাহর পরিকল্পনা সেখানে শুরু! আল্লাহই সেখানে প্রতিরোধকারী! আল্লাহই ব্যবস্থাগ্রহণকারী!
একই চিত্র আমরা দেখতে পাই সামনে! সুরাকা পিছু নিয়েছে! সব সতর্কতার পরেও! আল্লাহর রাসূল ভয় পেলেন না! সিদ্দীকে আকবর বিচলিত হলেন সীমাহীন! পেছনে তাকাতে লাগলেন ঘনঘন!
শেষকথা― পরিকল্পনা করে কাজ করা অপরিহার্য। সুন্নতে নববী। পরিকল্পনা গ্রহণের পর দৃঢ়চিত্তে বাস্তবায়নে মাঠে নেমে যেতে হবে―তখন আর দ্বিধা থাকতে পারবে না! তারপরও বাধা এলে টিকবে না! আল্লাহ দূর করে দেবেন! সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা না-সাজিয়ে মাঠে হইচই করা―ঠিক না! বোকামী! অস্থায়ী চাদরে মোড়ানো ব্যর্থতা!
















