কেরানীর স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ২৬৩ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক

ইসলাম টাইমস ডেস্ক:  বহুল আলোচিত স্বাস্থ্য অধিদফতরের সেই আবজাল এখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সপরিবারে পাড়ি জমিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে তার বাড়ি-গাড়িসহ কোনো কিছুরই অভাব নেই।

 

দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে  বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য গোপন করার প্রমাণ আবজালের বিরুদ্ধে মিলেছে।দালিলিক হিসেবে যার পরিমাণ প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, আবজালের স্ত্রী রুবিনা খানমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ২৬৩ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য মিলেছে।

যিনি চাকরিজীবনে মোট বেতন পেয়েছেন ১৭ লাখ টাকা, তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এত টাকা জমা হওয়ার গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ থাকতে পারে না। উপরন্তু, যা তিনি আয়কর নথিতে দেখাননি।

সূত্র বলছে, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে শিগগির আবজাল দম্পতির বিরুদ্ধে দুদক মামলা করবে। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, আবজাল সপরিবারে বিদেশে অবস্থান করতে পারলে তার টিকিটি স্পর্শ করা কঠিন হবে। মামলাটি শুধু আইনি পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

জানা যায়, চলতি বছর মার্চে দুদকের পৃথক দুটি অনুসন্ধান টিম আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাই শুরু করে। অনুসন্ধানে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে প্রকৃত অর্থ-সম্পদের ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য বেমালুম চেপে যান আবজাল দম্পতি।

আবজালের স্ত্রী রুবিনা খানমের মালিকানাধীন রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও গোপন করা হয়। অনুসন্ধানে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ব্যাংক হিসাবে ২৬৩ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পায় দুদক।

দুদকের এ সংক্রান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বামীর অবৈধ আয়কে বৈধ করার পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাবসমূহে কখনও এসওডি, কখনও মেয়াদি হিসাব আবার কখনও সঞ্চয়ী হিসাব অথবা পে-অর্ডার ইস্যু করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে তিনি অপরাধ করেছেন।

এ ছাড়া অজ্ঞাত উৎস থেকে ব্যাংক হিসাবে অপ্রদর্শিত ২৬৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা জমাকরণ এবং পরে উত্তোলন করে পাচারে জড়িত ছিলেন রুবিনা খানম।

দুদক সূত্র জানায়, আবজাল হোসেন তার সম্পদ বিবরণীতে ৬০ লাখ ৭ হাজার ৭২৫ টাকার ঘোষণা দেন। কিন্তু যাচাইকালে দেখা যায়, তিনি ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৩ হাজার ২১৫ টাকার সম্পদ গোপন করেছেন। দুদক তার ২ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার ৯৪০ টাকার সম্পদের খোঁজ পায়।

এ ছাড়া আবজালের মালিকানায় থাকা ১ কোটি ২৪ লাখ ২২ হাজার ২৯৭ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্যও পাওয়া যায়। দুদকের অনুসন্ধান টিম দেখতে পায় কয়েকটি ব্যাংক হিসাব থেকে বিভিন্ন সময় ক্লিয়ারিং ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেন আবজাল হোসেন।

ঢাকার উত্তরায় তার ও স্ত্রীর নামে বাড়ি আছে পাঁচটি। বাড়ি আছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় আছে অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট। দেশে-বিদেশে আছে বাড়ি-মার্কেটসহ অনেক সম্পদ।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন সরকারি চাকরিতে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদ উপার্জন করেছেন।

আবজালের স্ত্রী রুবিনা খানম তার সম্পদ বিবরণীতে ৪ কোটি ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩০০ টাকার সম্পদের ঘোষণা দেন। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রুবিনা খানম বিশাল অঙ্কের সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা বিবরণী উপস্থাপন করেছেন। যাচাইকালে তার নামে ৯ কোটি ৮৬ লাখ ১ হাজার ৮০১ টাকার গোপনকৃত সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে।

দুদক বলছে, আবজাল হোসেন তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বড় বড় কাজ করতেন। সরকারি চাকরি থেকে অবৈধভাবে ঠিকাদারি ব্যবসা করলেও স্বাস্থ্য অধিদফতর কোনোদিন এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। বরং আবজালের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে সব সময়ই সহায়তা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

সূত্র বলছে, দুদকের কাছে সম্পদ বিবরণী জমা দেয়ার পরপরই আবজাল দম্পতি বিদেশে পালিয়ে যান। বর্তমানে তারা অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনেক আগেই বাড়ি কেনেন আবজাল। এখন সেখানেই সপরিবারে বসবাস করছেন।

আবজালের দেশ ছাড়ার খবরের সত্যতা নিশ্চিত না করলেও দুদক বলছে, এমন খবরে তারা কিছুটা হতাশ। কারণ আবজাল হোসেন সত্যি দেশ ছেড়ে থাকলে তাতে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে শাস্তি নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে। আবজাল যাতে কোনোভাবেই বিদেশ পালাতে না পারে সে জন্য আগেই ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়া হয়েছিল।

সূত্র বলছে, আবজাল দম্পতির সব সম্পদ দেখভাল করছেন তার আত্মীয়স্বজন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরে কর্মরত তার কয়েকজন শ্যালক ও ভাতিজা আবজালের পক্ষে প্রভাবশালী মহলে তদবির শুরু করেছেন। বিদেশে বসে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রভাবশালী একজন ঠিকাদারও তার পক্ষে কাজ করছেন।

এ কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করে, যতই তদন্ত-অনুসন্ধান হোক না কেন আবজালের কিছুই হবে না। কারণ এর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোনো দুর্নীতিবাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। মামলা হলেও ফাঁকফোকর দিয়ে সে বেরিয়ে যাবে।

সূত্র বলছে, দুদকের অনুসন্ধান শুরুর পরপরই আবজাল হোসেন তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের একাধিক নম্বর ব্যবহার করেন। তবে তার ফোনালাপ বিশ্লেষণ করে দুদক জানতে পারে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি দুদকের অনুসন্ধান নিয়ে কথাবার্তা বলেন। এ ছাড়া সরকারের প্রভাবশালী মহলেও নিজেকে বাঁচাতে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন।

প্রসঙ্গত, আবজাল হোসেনের বয়স এখন ৪৫। বাড়ি ফরিদপুর সদর। ১৯৯২ সালে তিনি তৃতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেন। এরপর আর পড়ালেখা করেননি। ওই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে দৈনিক মজুরিভিত্তিক বদলি কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হলে আবজালের ভাগ্য খুলে যায়। এরপর তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ক্যাশিয়ার পদে পোস্টিং দেয়া হয়। ১৯৯৮ সালে তিনি স্বাস্থ্য অধিদফতরে বদলি হয়ে আসেন। পদোন্নতি পেয়ে হন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।

পূর্ববর্তি সংবাদমুসলমানদের প্রথম হিজরতভূমি: শত শত ইসলামী নিদর্শনে ভরপুর ইথিওপিয়ার হারার শহর
পরবর্তি সংবাদমতিঝিলে ভবন থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু