দুঃখী ফিলিস্তিনিদের ছেড়ে যাচ্ছে আরব শাসকরা!

আতাউর রহমান খসরু ।।

মধ্যপ্রাচ্যে তুর্কি শাসনের অবসানের পর দুর্ভাগ্যের সূচনা হয় ফিলিস্তিনি আরব মুসলিমদের। ফিলিস্তিন ভূমির তৎকালীন নিয়ন্ত্রক ব্রিটেন ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের হাতে তুলে দেয় পবিত্র ভূমি। অন্যায়ভাবে বিতাড়িত করে আরব মুসলিমদের। আর মধ্যপ্রাচ্যে তুর্কি খেলাফতের অবসানের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা ছিলো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাসীন পরিবারগুলোর। তারা নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে তুর্কি বিরোধী শক্তিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে। তাই বলা যায়, ফিলিস্তিনি আরবদের দুর্ভাগ্যের জন্য তারাও অনেকাংশে দায়ী।

ফিলিস্তিন সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে আরব শাসকরা প্রকাশ্যে এর নিন্দা করলেও সংকটের জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বের উষ্ণতা বাড়িয়েই চলেছে। তারা একদিকে নিজ দেশের আরব জনগণকে সন্তুষ্ট করতে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করেছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে তাদের সহযোগিতায় সংকট ঘনিভূত করেছে ইসরাইলের মিত্র আমেরিকা-ব্রিটেন ও ইউরোপ। বলা হয়, আরব শাসকদের সায় না পেয়ে এক কদমও সামনে বাড়েনি আমেরিকা-ব্রিটেন। আরব শাসকদের এমন দ্বিচারী আচরণ কথা অজানা ছিলো না কারও। কিন্তু তা আড়ালের চেষ্টা ছিলো আরব শাসকদের মধ্যে। কিন্তু সম্প্রতি তারা তাদের লুকিয়ে রাখা চেহারা প্রকাশ করতে শুরু করেছে। ইসরাইলের সঙ্গে তাদের সখ্যতা আর কোনো গোপন বিষয় নয়। জনমত ও মুসলিম বিশ্বের অনুভূতি উপেক্ষা করেই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করছে তারা।

কিন্তু তাই বলে থেমে যায়নি ফিলিস্তিনিদের লড়াই। আরব শাসকদের সহযোগিতার হাত দিনদিন ছোট হয়ে আসলেও স্বাধিকার আন্দোলন অব্যাহত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারা। তারই অংশ হিসেবে এ সপ্তাহে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইশেন (পিএলও) ইসরাইলকে দেয়া রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রত্যাহার করার ব্যাপারে ভোটগ্রহণ করেছে। ভোট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যতোদিন ইসরাইল ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিবে না ততোদিন ইসরাইলকেও রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিবে না পিএলও। প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথরিটি (পিএনএ)-এর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পিএলও-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে তিনি নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তির সমাপ্তি টানবেন।

গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের হত্যাকাণ্ড, অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল এবং এক তরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার প্রেক্ষিতে পিএলও এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তাদের মতে ইসরাইল শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছে না এবং দ্বিরাষ্ট্রিক সমাধানের পথেও হাটছে না। তবে মূল সমস্যা হলো ইসরাইল এর কোনো কিছুই ভ্রুক্ষেপ করে না। কেনই বা করবে যখন তারা আরব বিশ্বের উপর কর্তৃত্বশীল হয়ে উঠছে।

শুধু তাই নয়, তাদের সব অন্যায়ের পরও যখন আরব শাসকরা তাদের স্বীকৃতি দিতে এবং সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী তখন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের পরোয়া করার কিই বা কারণ থাকতে পারে? একদিকে যখন পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে মুসলমান প্রতিনিয়ত মরছে, অন্যদিকে তখন ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই যখন ইসরাইলের সংস্কৃতি মন্ত্রী মিরি রেগিবের মতো একজন খুনি রাজনীতিকের সম্মান নিশ্চিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

একদিকে ইসরাইলি স্নাইপাররা যখন গাজা সীমান্তে ফিলিস্তিনের বুকে-মাথায় গুলি চালাচ্ছে, অন্যদিকে ওমানের সুলতান সাইয়েদ কাবুস বিন সাঈদ আল সাঈদ তখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেন্জামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রাসাদ বাইত-আল-বারাকাহতে রাজকীয় ভোজনে ব্যস্ত। তাকে উপঢৌকনের বন্যা ভাসিয়ে দিচ্ছেন এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে গার্ড অব অনার প্রদান করছেন।

আরব রাষ্ট্রের এমন নির্বিবেক আচরণ ইসরাইলকে আরও আগ্রাসী করে তুলছে আর দুর্বল করে দিচ্ছে ফিলিস্তিনি আরব মুসলিমদের।

ইসরাইলের ইতিহাসে রেগিব একজন অতি বর্ণবাদী ইসরাইলি রাজনীতিক। গত সপ্তাহে তিনি ইসরাইলি জুডু দলের সঙ্গে সঙ্গে আবুধাবী যান। তার সম্মানে আবুধাবি শুধু ইসরাইলের জাতীয় পতাকা পরিবেশন করেনি বরং আবুধাবির আকাশে ইসরাইলের পতাকাও উত্তোলনও করে। বিনিময়ে আবুধাবি আমেরিকার তৈরি এফ-৩৫ ফাইটার জেট পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে। যে ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে ইসরাইল।

রেগিবের প্রতি আরব শাসকদের এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ মুসলিম বিশ্বকে আহত করেছে। কারণ, তিনি বার বার তার বক্তব্যে বর্ণবাদী মনোভব প্রকাশ করেছেন। যেমন রেগিব বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের অভ্যন্তরে কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শনের অধিকার রাখে না এবং তা করতে তিনি সরকারি অনুমতি প্রদানে অস্বীকার করেন।

রেগিব আরও বলেছিলেন, সে ইসরাইলি সৈন্য শারীরিকভাবে আক্রান্ত হবে সে ফিলিস্তিনিদের গুলি করার অধিকার রাখে। তার এ মানসিকতার বিস্তৃতিই ঘটছে ইসরাইলের রাষ্ট্রযন্ত্রে। আহমদ তামিমিকে একজন ইসরাইলি সৈন্যকে আঘাত করার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাকে আট মাসের জেল দেয়া হয়। অন্যদিকে হেবরনে একজন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যার অপরাধে অপর ইসরাইলি সৈন্য ইলোর আজারিয়াকে এক মাসের জেল দেয়া হয়। এমন একজন কট্টর বর্ণবাদী ইহুদি মন্ত্রীর আবুধাবির আন্তরিকতা অনেক কিছু ইঙ্গিত করে।

মিশর ও জর্ডান ইসরাইল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সবচেয়ে পুরাতন। রাষ্ট্র দুটি ইসরাইলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। যদিও ইসরাইল অন্যায়ভাবে পবিত্র ভূমি দখল ও রক্তপাত অব্যাহত রাখার পরও নিয়মিত তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখায় নির্লজ্জ প্রতীকে পরিণত হয়েছে দেশ দুটি।

আরব শাসকরা ফিলিস্তিনে ইসরাইলের অন্যায়-অবিচারের প্রতি দিনদিন অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। অথচ আরবদের কাছেও জেরুজালেম পবিত্র ভূমি। এ পবিত্র ভূমিকে ইহুদি রাষ্ট্র তার রাজধানী ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে দূতাবাস স্থানান্তরের চেষ্টা করছে।

আরবদের ইসরাইলমুখী কূটনৈতিক তৎপড়তার মুখে কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করছেন, সম্ভবত ফিলিস্তিনিরা তাদের আসল শত্রুদের চিনতে পারবে। যারা হেলায় হেলায় ফিলিস্তিন সমস্যাকে এতো দীর্ঘায়িত করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন সংকট তৈরির পেছনে তাদের ‍ভূমিকা ছিলো প্রকাশ্য দিবালোকের মতো।

কয়েক বছর যাবত আরব বিশ্ব কিভাবে ইসরাইলের সব অন্যায় আবদারের কাছে কিভাবে নতি স্বীকার করছে। গতকালও আরব মিডিয়াগুলো বলেছে, ইহুদিদের সমুদ্রে সাতার কাটতে দেয়া উচিৎ। কারণ, ইসরাইল এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ও পানির উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। সুতরাং কোনো ইহুদি যদি আরব বিশ্বের কোনো সমুদ্রে সাতার কাটতে যায় তবে তা প্রকৃতার্থে ইসরাইলের সমুদ্রেই সাতার কাটা হবে। ইসরাইল ক্রমেই কর্তৃত্ব প্রসারিত করছে দৃঢ়তার সাথে নির্দয়ভাবে।

আরব শাসকদের ভালোবাসায় আরও হিংস্র হয়ে উঠছে ইসরাইল। প্রতিদিন মুসলিমদের জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। এবং তারা সেই দিনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে যেদিন হারাম শরিফকে ইহুদি তীর্থে পরিণত করবে।

ইতোমধ্যে মসজিদুল আকসার যে স্থান থেকে মুহাম্মদ সা. আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য উর্ধ্বগমনে যান এবং ইসলাম ধর্ম যে ঘটনায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।

শুধু আরব বিশ্ব না মুসলিম বিশ্বই এখন ইসরাইলে সঙ্গে একই আচরণ করছে। তার নির্দয় আচরণ, তার নৈরাজ্য, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং সভ্যতা ও নৈতিকতাকে উপেক্ষা সবকিছু জেনে-বুঝে। তারা দেখছে ইসরাইল পূর্বে সব চুক্তি লঙ্ঘন করছে, ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক ভূমির অধিকার উপেক্ষা তার সীমানা বাড়িয়ে চলেছে এমনকি ইসরাইল আরব সীমান্তে প্রবেশ করছে।

আরব শাসকদের স্বার্থের বলি হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বলা যায় তারা আজ পরিত্যাক্ত। আরব বিশ্ব তাদের পরিত্যাগ করেছে। অথচ একটি সুন্দর সময়ের জন্য ফিলিস্তিনি কতো দীর্ঘ সময় এবং সংকটকাল পার করে এসেছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য তারা ১০০ বছর ধরে লড়াই করছে।

তাদের স্বপ্ন ও সংগ্রাম টিকিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা ও ন্যূনতম কূটনৈতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। যা না পেলে তাদের আশার আলো নিভে যাবে খুব দ্রুত। আর কার্যকর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারে আরব দেশগুলো। কিন্তু তাদের আচরণে মনে হচ্ছে আরবরা ক্লান্ত। তারা পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত। তারা সেই দিনের অপেক্ষা করছে যেদিন এই পবিত্র ভূমির নাম হবে ইসরাইল। যে ভূমি আরব জনগোষ্ঠিকে গলায় শেকল লাগিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে গৃহপালিত পশুর মতো।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে

পূর্ববর্তি সংবাদইরানের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
পরবর্তি সংবাদতাজমহলের মসজিদে শুক্রবার ছাড়া নামাজ পড়া যাবে না, অজুখানায় তালা