নিকি মিনাজের নিজ উদ্যোগে কনসার্টে না আসার খবর: যে বার্তা দেয়

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ  ।।

বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে খবরটি পড়েই কবির এই বিখ্যাত পংক্তিটি মনে পড়ে গেছে। আরো মনে পড়ল, ছাত্র জামানায় বহুবার শোনা একটি লোককথা। উজানীর তৎকালীন পীর হযরত মাওলানা মোবারক করীম রহ. তার প্রায় ওয়াজেই এ কিসসাটি বলতেন, খেড়িহর মাদরাসা ও আমাদের গ্রামের এলাকায় অনেক মাহফিল হত তাঁর। আকর্ষণীয় আন্দাজে তিনি শোনাতেন কাক পাখির সোজা হয়ে হাটঁতে না পারার কারণ। তার ভাষায় “কাউয়া গেছিল কবুতরের টা শিখতে। অনেক দিন চেষ্টা করেও তা তো শিখতে পারেইনি, ফাকেঁ নিজেরটাও ভুলে গেছে। এখন সে পাতালে নাচে।

যে খবর পড়ে এত কিছু মনে পড়ল সেটির শিরোনাম হল, মার্কিন গায়িকা নিকি মিনাজ কর্তৃক সৌদি আরবে তার নির্ধারিত কনসার্ট বাতিলের ঘোষণা। এর কিছুদিন আগে থেকে বিশ্বব্যাপি মুসলমানদের ক্ষোভ ও বেদনা প্রকাশের খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছিল। তারা পবিত্র হজ্বের মৌসুমে মক্কা মুকাররমার অদূরে জেদ্দা নগরীতে অনুষ্টিতব্য কনসার্টের ব্যাপারে বিশ্বের আনাচে-কানাচে থেকে নিন্দার ঝড় তুলেছিলেন। ১৮ জুলাই ২০১৯  حفل مهرجان جدة العالمي  ‘হাফলু মেহেরজান জেদ্দা আল আলমী’ শিরোনামে জেদ্দা শহরে এ কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল। এত নিন্দা-প্রতিবাদের পরও স্থানীয় কতৃপক্ষ তা বাতিল করার তাগিদ অনুভব করেননি। এরই মধ্যে খোদ গায়িকা কতৃক উক্ত অনুষ্ঠানে হাজির  না হওয়ার ঘোষণা এল। খবরে প্রকাশ, নিকি মিনাজ একজন আমেরিকান গায়িকা, যে কিনা খোলামেলা পোশাক এবং অশ্লীল বক্তব্য সংবলিত গানের কারণে পরিচিত। উত্তেজক পারকারমেন্সই নাকি তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

ওই মহিলা জেদ্দার অনুষ্ঠানটিতে নিজের উপস্থিতি বাতিলের ঘোষণায় এর কারণও উল্লেখ করেছে। তার ভাষায় “সৌদি আরবে আমার ভক্তদের সামনে পারফর্ম করা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। কিন্তু সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমার জন্য নারীবাদী ও সমকামীদের সমর্থন আরো গুরুত্বপূর্ণ।”

গায়িকা নিকি মিনাজ জেদ্দায় উপস্থিত না হওয়ার কারণ হিসেবে এসব কথা কেন বলল? যতদূর জানা গেছে, নিকি মিনাজ নারীবাদী, কথিত মানবধিকার ও সমকামী গোষ্ঠীর সমর্থক। এসব গোষ্ঠী সৌদি আরবের জেদ্দায় কনসার্টে তার অংশ নেওয়ার নিন্দা করে আসছিল। তারা বিভিন্ন প্রতিবাদ বিবৃতিতে গায়িকাকে বলছিল, তুমি সৌদি আরবের তেলের টাকা ছুঁড়ে ফেল। কারণ তাদের ভাষায়, ‘সৌদি আরব নারীদের নির্যাতন করে, মানবধিকার লংঘন করে, সমকামীদের বিরোধিতা করে।”  অপরদিকে যেহেতু এই গায়িকা নারীবাদী ও সমকামীদের পক্ষে আগে থেকেই কাজ করে আসছে, সেজন্য সে এদের পক্ষ থেকে চাপের মধ্যেই ছিল। বিদেশি এ জাতীয় সংস্থা ও গোষ্ঠীগুলো তার কাছে আরও দাবি করেছে, সৌদি আরবে অনেক মানবধিকারকর্মী আটক। নারীরা সেখানে অধিকার পায় না। সমকামীতা সেখানে আইনত নিষিদ্ধ। তুমি সেখানে যাওয়ার অর্থ হবে তুমি সেসবকে সমর্থন করছ। তাদের কেউ কেউ এ কথাও বলেছে যে, ‘রক্ষণশীল’ সৌদি আরবের লোকজন তোমার নাচগানের ভঙ্গি,তোমার বেশভূষা ও পারফর্মেন্স কীভাবে নেবে তোমার ভেবে দেখা উচিত।

এ ছিল জেদ্দায় নিকি মিনাজের কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়ার পশ্চিমারূপ। অপরদিকে জেদ্দায় এ জাতীয় কনসার্টের খবর পেয়ে বিশ্বব্যাপি মুসলমানদের হৃদয় কাদঁছিল শুরু থেকেই। মক্কা মুকাররমায় যাওয়ার পথ জেদ্দা,জেদ্দা সেই পবিত্র শহরের প্রবেশদ্বার-শহর। বাইতুল্লাহয় যখন হাজি সাহেবরা পুণ্যের প্রবল আবেগ নিয়ে  হাজির হবেন, গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য লাখো লাখো মানুষ লাব্বাইক ধ্বনিতে চারদিক আন্দোলিত করবেন, এমনই সময় প্রকাশ্যে সেখানে আল্লাহর নাফরমানির আয়োজন চলবে। ঈমানদীপ্ত মুসলমানদের জন্য এ ছিল বুকভরা কান্নার কারণ ও উপলক্ষ।

এতে শুধু হাজিদের নয়, কোটি কোটি মুসলমানদের হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছিল। দেশে দেশে নানাভাবে প্রতিবাদ ও ক্ষোভধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছিল।  সৌদি আরবের জেদ্দায় কনসার্টের আয়োজন যারা করছিল তারা এসব প্রতিবাদে কোনো পতিক্রিয়া ব্যক্ত না করলেও যাকে নিয়ে এই আয়োজন সেই নিকি মিনাজ নিজেই ওই কনসার্টে উপস্থিত না হওয়ার ঘোষণা দেয়। এতে ওই কনসার্ট বাতিল হয়ে যায়। সে কেন এই কনসার্টে হাজির হবে না এর কারণও তখন প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়।

জেদ্দায় নিকি মিনাজের কনসার্ট আয়োজন, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ এবং আয়োজকদের পক্ষ থেকে কাউকে কোনো পরোয়া না করা আর শেষ পর্যন্ত ওই গায়িকা কর্তৃক কনসার্টে হাজির না হওয়ার ঘোষণার এই সামগ্রিক চিত্রটি দুনিয়ার আত্মভোলা মুসলমানদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেছে। কী সেই বার্তা? এটা নিয়েই আমরা কয়েকটি কথা আরজ করতে চাই।

প্রথম যে প্রসঙ্গটি নিয়ে বলতে চাই,সেটি হল, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রবেশদ্বার বা একটি বড় ফটক আছে।  সে ফটকের দু পাশের স্তম্ভগুলোতে বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে…. . عزنا و فخر نا بالاسلام : عبدالعزيز.. অর্থাৎ বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আযীযের বাণী হল; ‘আমাদের সম্মান ও গৌরব ইসলামের বদৌলতেই’।  সৌদি রাজপরিবারের পূর্বপুরুষরা ক্ষমতা দখলে বিদেশিদের সহযোগিতা নিয়েছিল,উসমানি খেলাফতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সে সব ঘটনার ব্যাপারে তাদের ব্যাপক সমালচনাও ছিল ও রয়েছে, তবুও সৌদি আরব  প্রতিষ্ঠার পর সৌদি বাদশাহদের কর্তৃক কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলামী অনুশাসনের প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন মুবারক স্থাপনার সংস্কার ও সেবামূলক কাজ করায় বিশ্বব্যাপি মুসলমানদের এক ধরণের মৌন সমর্থন তারা পেয়ে আসছিলেন। কিছু কিছু বিষয়ে অতি বাড়াবাড়ি, ইখতিলাফি বিষয় ও মাসআলার ক্ষেত্রে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাশ করা কিছু কিছু ছাত্রের নানান দেশে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অব্যাহত চেষ্টা সত্ত্বেও সৌদি সরকারগুলোকে তুলনামূলকভাবে ইসলামবান্ধব, মুসলিমবান্ধব সরকার হিসেবে বিশ্বের  মুসলমানরা দেখে আসছিলেন।  ধারণা করা যায়,  সৌদি বাদশাদের ইসলামবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও তাদের প্রতি বিশ্বমুসলিমের অনুচ্চারিত সমর্থনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাতা বাদশা আব্দুল আযীযের স্লোগান বা বাণীর কিছু প্রতিফলন ঘটেছিল।

প্রসঙ্গ খাদেমুল হারামাইন

ইসলামবান্ধব কর্মসূচি ও পবিত্র ভূমির সেবার এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তি সময়ে সৌদি বাদশারা নিজেদের খেতাব হিসেবে ‘খাদেমুল হারামাইন আশশারীফাইন’ (যার অর্থ: দুই হারাম (মক্কা-মদীনা) -এর সেবক) ব্যবহার শুরু করেছেন। এই খেতাবটি স্থলাভিষিক্ত হয় ‘জালালাতুল মালিক’ (মহামান্য সম্রাট) উপাধির। আগে সৌদি বাদশারা ‘জালালাতুল মালিক’ উপাধিটি ব্যবহার করতেন।   সম্ভবত বাদশাহ ফাহাদ সর্বপ্রথম এই খেতাবটি গ্রহণ করেছেন। খেতাবটি সুন্দর ছিল। মুসলিম বিশ্বের মানুষ সুন্দরভাবে সেটি গ্রহণও করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশ্বের মুসলমানরা তাদের প্রতি  আন্তরিকতা পোষণ করে এসেছেন। সৌদিআরবে যদিও রাজতন্ত্র প্রচলিত, পরিপূর্ণ ইসলামি শাসনও সেখানে নেই, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছিল ইসলামি অনুশাসন । ইসলামি অনুশাসন ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা। যেমন: পর্দার বিধান, প্রকাশ্যে অশ্লীল গানবাদ্যের অনুমতি না থাকা, নারীরা দূরে কোথাও গেলে সাথে মাহরাম থাকার আইন, ইসলামি দণ্ডবিধির উপস্থিতি ইত্যাদি। এজন্য বাদশাহ আবদুল আযীয ও তার পূর্ববর্তী কারো কারো শাসনামলে বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমানদের তাদের প্রতি নীরব সমর্থন ছিল। এ বিষয়গুলোতে তাদেরকে অনেকে রোলমডেল হিসেবেও দেখতো। অনেকেই তাদের বিভিন্ন পদক্ষেপের উদাহরণও দিত।

এমবিএসের আবির্ভাব

কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরবের প্রশংসার বিষয়গুলোতে অধঃপতনের বিভিন্ন আলামত ফুটে ওঠে। হঠাৎ করেই বর্তমান বাদশাহ সালমান প্রথমে তার ভাই,পরে তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে সরিয়ে তার নিজের ৩০/৩২ বছরের ছেলেকে যুবরাজ বা ভবিষ্যত ক্ষমতাধর হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে বাদশার ছেলেকেই যুবরাজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অনেকের কাছে অসুন্দর লাগলেও প্রথমে তাকে দেখে কিছু মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। শশ্রুমণ্ডিত এক যুবক। সৌদির ভবিষ্যত বাদশাহ। অনেকের সুধারণা ও প্রত্যাশা হয়, ইসলামের অনেক খেদমত হয়তো করবে এ যুবক। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিশ্বের মুসলমানদের মোহভঙ্গ ঘটে যায়।

এমবিএস খ্যাত মুহাম্মদ বিন সালমান ক’দিন পার হতেই নতুন কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন,তার পূর্বপুরুষরা ইসলামের খেদমত হিসেবে যা যা করেছিল, সেগুলো ছিল ভুল। বিশ্ব মুসলিমের কাছে পূর্ববর্তী সৌদি বাদশাহদের প্রশংসিত পদক্ষেপগুলোকে ভুল সাব্যস্ত করে তিনি ‘মডারেট’ ইসলাম চালু করার চেষ্টা শুরু করেন। সংস্কারের নামে সৌদিআরবে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষয়গুলোকে একের পর এক বৈধতা দিতে থাকেন। ইতিমধ্যেই সিনেমা হল চালু করা, নারী-পুরুষ একত্র হয়ে খেলা দেখা,নারীদের কনসার্টের আয়োজনসহ আরও অনেক হারাম বা নিষিদ্ধ কাজকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আর এগুলো করে তিনি বিদেশিদের আনুকূল্য অর্জনেরই চেষ্টা করেছেন।

 

বিদেশিদের আনুকূল্য অর্জন

তথাকথিত সংস্কার কর্মকাণ্ড বা কথিত আধুনিকতা প্রষ্ঠিার মাধ্যমে এমবিএস বাহ্যত বিদেশিদের আনকূল্য লাভে সক্ষম হয়েছেন। শুধু আমেরিকা,চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যই তার লাভ হয়নি, বরং আমেরিকার প্রধান চলচ্চিত্র- বিনোদন কেন্দ্র- হলিউডেও তাকে সংবর্ধনা দিতে দেখা গিয়েছে।  সংবাদ মাধ্যম সূত্রে গেছে, হলিউডে এত জমকালো সংবর্ধনা না কি অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে দেওয়া হয়নি।

 

অবশ্য এমবিএসের এমন রমরমা অবস্থার মধ্যে দৃশ্যত কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছিল তুরস্কে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশুগজির হত্যাকাণ্ডের পর। যদিও এমবিএসের বিশেষ বন্ধু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেছিলেন,”খাশুগজি হত্যার বিচার চলতে থাকুক। আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। তাদের সঙ্গে আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অস্ত্র বিক্রির চুক্তি রয়েছে।”

সৌদি যুবরাজ হতে পারে এসব প্রতিকূলতা কাটানোর জন্যই মুসলমানদের শ্রদ্ধা ও আবেগের বিপক্ষে নিজের অবস্থানটাকে দিন দিন জোরালো করছেন। ইসরায়েলের সাথে সখ্য,ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে ইসরায়েলের দাবি মেনে নিতে মৌখিক চাপ প্রয়োগ,চীনের জিনজিয়ানে উইঘুর মুসলমানদের প্রতি চরম নির্যাতন সত্ত্বেও জাতিসংঘে চীনকে সমর্থন দিয়েছেন এবং চীনের পক্ষে কথা বলেছেন। যেখানে লাখ লাখ নির্যাতিত অসহায় উইঘুর মুসলমানকে চীন জঙ্গি বলে চিত্রায়িত করতে চেষ্টা করছে, সেখানে সৌদি সরকারও তাতে সমর্থন দিয়েছে।

 

এদিকে বেহায়াপনার সর্বশেষ ঘোষণা এসেছে  জেদ্দায় নাইটক্লাব খোলার খবরে। আবার বৈধকরণের জন্য সেটার নামের শুরুতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘হালাল’শব্দ। তাছাড়া হজ্বের মাসে ১৮ জুলাই নিকি মিনাজের গানের অনুষ্ঠান আয়োজন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। যদিও গায়িকা কর্তৃক তার উপস্থিতি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এ লেখা তৈরি করার সময় খবর পাওয়া গেছে, একই জায়গায় একই তারিখে পশ্চিমা দেশ থেকে একদল গায়ক-গায়িকা এনে কনসার্ট বহাল রাখা হচ্ছে। কিন্তু আয়োজকদের মনোনীত প্রধান ওই গায়িকা তাদের ঠিকই প্রত্যাখ্যান করেছে। এ ঘটনায় একজন উর্দু কবির একটি বিখ্যাত একটি পংক্তি মনে পড়ে গেলো,

نه خدا هي ملا، نه وصال صنم.
نه ادهر كى رهي، نه إدهر كي هويى.

 

[ না পেল সে খোদার নৈকট্য, না পেল দেবতার সান্নিধ্য

হতে পারল না সে ওই দিকের, থাকলো না এই দিকেও।]

 

উর্দু এই কবিতাটি মর্মার্থের কারণে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। উর্দু জানে না-এমন অনেকেও ক্ষেত্র বিশেষে এই পংক্তিটা বলে থাকেন। কবি এখানে ওইসব লোককে ইঙ্গিত করেছেন, যারা নিজে একটি বিশেষ অবস্থানে থেকেও কিছুলোকের মনোতুষ্টির জন্য তাদের অনুকরণ করে, তাদের মতো হতে চেষ্টা করে। ফলে নিজের অবস্থানও হারায়, আবার অন্যদের ঠিকমতো খুশি করতে পারে না। নিজের পক্ষের লোকদের কাছেও সে বিরাগভাজন হয়, অন্য পক্ষের লোকেরাও তাকে আপন করে নেয় না।

 

  এই ঘটনা যে বার্তা দেয়

 

পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি দেখা যায় সেটি হলো, একজন গায়িকা- নর্তকী তো টাকার জন্যই তার কাজ করে। নিকি মিনাজও এর ব্যতিক্রম নয়। সৌদিআরবে তার নির্ধারিত প্রোগ্রাম যদি সে কোনো কারণ না দেখিয়ে এমনিতেই বাতিল করে দিত তাহলে হয়তো অন্য কথা বলা যেত। কিন্তু সে যে কারণ দেখিয়েছে  তাতে সৌদি সরকারের অধীনে সে নারীবাদী ও সমকামীদের ‘অধিকার’ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তুলল।  সে তো এমবিএস তথা সৌদি সরকারের কথিত সংস্কারকেও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ছাড়ল। তাকে তো খুশি করা গেলই না, প্রকারান্তরে  তার আরও অশ্লীল ও অবৈধ দাবির চাপে পড়ল সৌদি সরকার।

 

আল্লাহ মাফ করুন। ইসলাম থেকে সরে গিয়ে কত ‘সংস্কার’ কাজ এমবিএস চালাবেন? কতটা নিচে নামলে তিনি বা তার মতো লোকেরা বিদেশিদের খুশি করতে পারবেন? তাহলে কি বিদেশিদের খুশি করতে একসময় সৌদিআরবে সমকামিতাকেও বৈধতা দেয়া হবে? কথিত নারী অধিকার বলতে যা যা বুঝানো হয় সবকিছুই কি সেখানে বাস্তবায়ন করা হবে? তাদের চাওয়া মতো সবকিছু করেও কি সৌদি শাসকরা তাদের খুশি করতে পারবেন?

 

কুরআনে কারীমের সুস্পষ্ট ঘোষণা:
ولن ترضى عنك اليهود و لاالنصاري حتى تتبع ملتهم

[যতক্ষণ না কোনো মুসলিম ইয়াহুদি বা খ্রিস্ট ধর্ম অনুসরণ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না।–সূরা বাক্বারা:১২০]

দেশে দেশে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের বিজাতিদের প্রতি নতজানু অবস্থা দেখে বারবার আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই অমোঘ বাণী সামনে চলে আসে। নিজেদের ধর্ম অর্ধেক অথবা ৭০% কিংবা ৮০% ছেড়ে দিলেও যে তাদের পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট করা যাবে না- এর জন্য আর কত প্রমাণ তাদের দেখতে হবে?

 

গোটা দুনিয়ার মুসলমানের অন্তরের দাবি, সৌদি সরকার তাদের পূর্বসূরীদের দেওয়া খেতাবের ( খাদেমুল হারামাইন), যা তারা এখনও ধরে রেখেছে, লাজ রক্ষা করুক এবং ‘সংস্কারের’ নামে ইসলাম বিরোধী যেসব কর্মকাণ্ড সেখানে চালু করা হয়েছে ও হচ্ছে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করা হোক। একইসঙ্গে রাবেতায়ে আলমে ইসলামিসহ অন্যান্য সৌদি সংস্থার মাধ্যমে الوسط/ الاعتدال ইত্যাদি নামে তথাকথিত যে ‘মডারেট ইসলাম’ ( ইসলামের মনগড়া,একপেশে, ‘আধুনিক’ ব্যাখ্যা) প্রচারের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন শিগগিরই সেসব বন্ধ করা হোক।

এসব তথাকথিত সংস্কার একে তো অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার সুযোগ করে দিয়ে আল্লাহর নাফরমানিতে ডুবে যাওয়ার পথ সুগম করছে,  অন্যদিকে রাবেতা ও তাদের নিয়োগ করা কিছু ‘ধর্মীয় ব্যক্তির ’ মাধ্যমে ইসলামকে বিকৃত করার জঘন্যতম কাজও আঞ্জাম দেওয়া হচ্ছে। তাদের এসব পদক্ষেপের দ্বারা সাধারণ মুসলমানদের বিচ্যুত ও বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুমতি দান করুন।

 

পূর্ববর্তি সংবাদশিবগঞ্জে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতাকে গণধোলাই
পরবর্তি সংবাদরাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃদু ভূকম্পন