ওলিউর রহমান ।।
১৯ জুলাই। মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের দিন। ৭১১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই উত্তর আফ্রিকায় নিযুক্ত মুসলিম গভর্নর মুসা বিন নুসাইরের অধীনস্থ সেনানায়ক তারিক বিন যিয়াদ জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে ইরবিয়ান পেনিনসুলা অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করে আন্দালুসকে (আধুনিক স্পেন) মুসলমানদের করতলগত করেন। এরপর ৩ বছরের মাথায় ৭১৪ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র স্পেনে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। স্পেন ছিল মুসলিম সভ্যতা ও ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন মুসলমানদের অবদান নিয়ে কটাক্ষ করলে বৃটেনের পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক স্পেনের উদাহরণ টেনে বরিসকে মুসলমানদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ব্যাপারে ধারণা নিতে বলেন। আলহামরার প্রাসাদ, কর্ডোভার মসজিদ, সেভিলের বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বর্তমান যে উন্নতি মুসলিম স্পেন থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে স্বীকার করেন বৃটেনের বিশিষ্ট সেই পাঁচ নাগরিক।
স্পেন বিজয়ের প্রেক্ষাপটঃ মক্কা ও খায়বার বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের যে অগ্রযাত্রা রাসূল সাঃ-এর যামনায় শুরু হয়েছিল উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে তা এক বিস্তীর্ণ মালভৃুমি নিজের আওতাভূক্ত করে। মুসলিম সৈন্যরা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বে সমরকন্দ,কাশগড় এবং পশ্চিমে মরক্কো, আলজেরিয়ায় মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়।
মুসলমানদের আগমনে পূর্বে অন্যায় শাসনের কারণে স্পেনের তদানীং রাজা রডারিকের উপর জনগণ ছিল ক্ষুব্ধ। দেশব্যাপি গৃহযুদ্ধ চলমান থাকায় রডারিকের রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া স্পেনে বসবাসরত ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের উপর রডারিকের অব্যাহত জুলুমের কারণে মুসলিমদের স্পেন দখলে জোর সহযোগিতা করার আগ্রহ জানায় স্পেনের ইহুদিরা।
অপরদিকে রডারিক কর্তৃক স্প্যানিশ প্রদেশ ক্যিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ানের মেয়ে শ্লীলতাহানীর শিকার হলে জুলিয়ান এর বিচার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ন্যায় বিচার না পেয়ে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেন। রডারিককে চ্যালেঞ্জ করেন, ‘যখন আমি পুনরায় স্পেনে প্রবেশ করব, তখন এমন একদল শিকারি বাজপাখি সাথে আনব তোমার শাসন যাদের কখনও দেখে নি।’
এ ঘটনার পর কাউন্ট জুলিয়ান উত্তর আফ্রিকায় উমাইয়া খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নর মুসা বিন নুসায়েরের কাছে বিচার প্রত্যাশা করেন এবং রডারিকের অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানান।

গভর্নর মুসা বিন নুসাইর সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। তারিক বিন জিয়াদ রডারিকের অন্যায়ের বদলা নিতে স্পেন আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। চারটি যুদ্ধজাহাযে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে তারিক যে স্থানে ঘাটি স্থাপন করছিলেন তা জাবালুত তারিক (তারিকের পর্বত) নামে পরিচিত।
৭১১ সালের ১৯ জুলাই ৭ হাজার বার্বার, ৩ হাজার আরাব ও স্থানীয় এক হাজার মোট ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে তারিক রডারিকের একলাখ সৈন্যর মোকাবিলা করেন। ওয়াদী লাস্কের নিকটবর্তী সারিস বা জেরেখে মুসলিম ও রডরিক বাহিনীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ যুদ্ধ ইতিহাসে ওয়াদী লাস্কের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধ রাজা রডারিক শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত হন। কর্ডোভা ও টলেডো মুসলমানদের দখলে চলে আসে।
পরবর্তীতে তারিক বিন যিয়াদ ও মুসা বিন নুসাইরের যৌথ অভিযানে ফ্রান্স ও পর্তুগালের সীমান্ত পর্যন্ত মুসলমানদের শাসনক্ষমতা পৌঁছে। মুসলিম শাসনে স্পেন এমন উন্নততর অবস্থায় উপনীত হয় যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্থাপত্য ,কলা ও শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশ্ব প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
কিন্তু পার্থিব চরম উৎকর্ষ সাধন করে স্পেনের শাসকরা যখন ইসলাম থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে লাগল তখন তাদের উপর নেমে আসলো পতনের কাল। যে ভূখণ্ড প্রায় আটশত বছর মুসলমানরা শাসন করেছে সেখানে ইসলাম এখন এতটাই অপরিচিত; পাকিস্তানের আল্লামা তাকী উসমানী তার সফরনামায় লেখেন, ‘আমরা যখন বিমানবন্ধরের এক কোণে নামায আদায় করি তখন স্পেনের মানুষ জটলা বেধে আমাদের দেখতে থাকে। কী করছে এই দুই আগন্তুক!
















