অ্যামাজনের আগুন : পৃথিবীব্যাপী ভোগবাদী মানসিকতার কুফল

আবু হুরাইরা ।।

আমাদের এই পৃথিবী  এমন এক স্থান, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়েই জৈব, অজৈব পদার্থ এবং বিভিন্ন জীবসমষ্টি পরস্পরের  একটি জীবনধারা গড়ে তোলে। তাই বন উজাড় করে জঙ্গলকে দখলে নিয়ে বাস্তু প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রচেষ্টা একটা উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আজকের ভোগবাদী সভ্যতা, মুনাফাবাজ করপোরেশন আর ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা এ সব বোঝে না। সে কারণেই ট্রাম্পের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন একটা ভুয়া ব্যাপার। সে কারণেই ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো অ্যামাজনকে বাণিজ্যের ক্ষেত্র বানাতে তৎপর।

গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ হিসাবে খ্যাত লক্ষ-কোটি প্রাণের আধার অ্যামাজন  ভয়াবহভাবে জ্বলছে মানুষের লাগানো আগুনেই। পরিবেশবাদীদের মতে, এই আগুন নেভাতে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দখলদার বনখেকো মানুষ আর খনি ব্যবসায়ীদের আধিপত্যই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে অ্যামাজনের ভবিষ্যৎকে। আর অ্যামাজনের ভবিষ্যতে হুমকি মানে বহু বহু প্রজাতি ধ্বংসের হুমকি, সঙ্গত কারণেই তা মানুষের ভবিষ্যতের জন্যও হুমকি।

অ্যামাজনকে বেসরকারিকরণের মধ্য দিয়ে একে কৃষি ও খনি সেক্টরের কাছে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীন উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। ক্ষমতায় আসীন হয়ে সেই প্রক্রিয়াই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। বলসোনারো দায়িত্ব নেওয়ার পরপর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে অ্যামাজন সোশিও-এনভায়রনমেন্টাল জানিয়েছিল, অ্যামাজনের অরণ্য বিনাশে বৈধ ও অবৈধ খনি বাণিজ্যেরও বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। ছয়টি দেশে বিস্তৃত অ্যামাজনের ২৪৫টি এলাকায় ২ হাজার ৩১২টি অবৈধ খনি রয়েছে। বলসোনারো নিজেও জানিয়েছেন, তিনি নিজেই ১৯৮০-র দশকে একটি অবৈধ সোনার খনিতে কাজ করেছেন এবং অবৈধ খনি ব্যবসায়ীদের সমর্থন পেয়েছেন। তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সম্মান ও নিরাপত্তার। এছাড়া সংরক্ষিত আদিবাসীদের এলাকায় খনন কাজকে বৈধ করার কথাও জানিয়েছিলেন।

জানা যায়, গোটা পৃথিবীর জন্য ২০ ভাগ অক্সিজেন সরবরাহ আর ২৫ ভাগ কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের কাজটি করে পৃথিবীর এই ফুসফুস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রচণ্ডতা ইতোমধ্যে যেখানে পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে হুমকিতে ঠেলে দিয়েছে, সেখানে অ্যামাজন বিপন্ন হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যে আরও ত্বরান্বিত হবে, সেটা বুঝতে কোনও গবেষণাও লাগে না।

গবেষকরা বলছেন, কৃষি, খনন ও অনুসন্ধানের কারণে এখন পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। গত অর্ধশতকে অ্যামাজনের যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সমান বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে। গত মাসে বনাঞ্চল হারিয়ে যাওয়ার হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতি মিনিটে তিনটি ফুটবল মাঠের সমান এলাকার বন হারিয়ে যাচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপকতার পর অ্যামাজনের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন ডে সৌজা। তিনি সাপ, গিরগিটি, করালসহ আরও ছোট প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন, যারা আগুন থেকে পালাতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘মারাত্মক ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র।’

ক্লার্ক ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অ্যামাজন খনি ও তেল, গ্যাস উত্তোলনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এছাড়া আগামী দুই দশকে এখানে বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

গত বছর ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যামাজন সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জাতীয় ও আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো গড়ে তোলার নীতিগত ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।

অ্যামাজনের আদিবাসী মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস নতুন কিছু নয়। ১৬ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা তাদের জমি লুট করার পর থেকে এই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে তাদের। বলসোনারোর অধীনে তাদের ভাগ্য আরও বিপন্নতায় পর্যবসিত হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় সার্বভৌমত্বের অজুহাত তুলে ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট বলসোনারো বলছেন, অ্যামাজনের ঘটনায় বিশ্বের অন্য কোনও দেশ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। যেন অ্যামাজনে যে মানুষের বাইরেও শত শত কোটি প্রাণ আছে, জঙ্গল-বনভূমি-নদীনালা-অসংখ্য অগণিত প্রাণ আছে, ব্রাজিল তাদেরও নাগরিকত্ব দিয়ে রেখেছে।

এ যে নব্য উদারবাদী পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে দুনিয়াজুড়েই উন্নয়নতত্ত্ব বাস্তবায়নের কুফল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।  বাজার অর্থনীতি আজ সবকিছুকে আজ ব্যবসায়ের উপজীব্য করতে করতে এখন এসে আঘাত তীব্র করেছে প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের ওপর। অসংখ্য-অগণন প্রাণের আধার জল-জঙ্গলকেও মুনাফার উপজীব্য করে তারা আজ পৃথিবীর ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিয়েছে হুমকির মুখে।

বিবিসি ও বাংলা ট্রিবিউনের কলাম অবলম্বনে

পূর্ববর্তি সংবাদসাভারে বাসের ধাক্কায় নিহত ২
পরবর্তি সংবাদচোখ দেখাতে এবার ১০ টাকার টিকেট কেটে লাইনে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী