দুঃখের স্মৃতি: জাগতিক শিক্ষিতদের জন্য আমাদের করণীয় কিছু কি নেই?

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। জাগতিক শিক্ষা ও দ্বীনী শিক্ষা। জাগতিক শিক্ষার যাবতীয় কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো যাতে বাস্তবিক অর্থে দ্বীন শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। দ্বীনী শিক্ষার কারিকুলামও সাজানো এমনভাবে যাতে জাগতিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। এই ধারা-ই চলেছে আমাদের দেশে দীর্ঘদিন।

এখন দ্বীনী শিক্ষার কারিকুলামে জাগতিক শিক্ষার অতি প্রয়োজনীয় বেশকিছু বিষয়ের সংযুক্তি হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে জাগতিক শিক্ষার কারিকুলামে দ্বীন শেখার বিষয়টি এখন আগের চেয়ে আরও অনেক নিচে নেমে এসেছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।

গত কিছুদিন আগে এক যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং পরে বেশ ঘনিষ্ঠতা। সেই সূত্রে তিনি শোনাচ্ছিলেন তার পড়াশোনার খবর ও পারিবারিক নানা বিষয়। হঠাৎ তার একটি তথ্য যেন আমাকে সজাগ করে তুলল। তিনি বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছেন এবং বাস্তবেও হয়তো বিষয়টি তার কাছে খুব স্বাভাবিকই, কিন্তু আমার কাছে এর চেয়ে অস্বাভাবিক বিষয় খুব কমই আছে। বিষয়টি ছিল তার পড়াশোনা সংশ্লিষ্ট।

তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা সমাপ্ত করেছেন এ দেশেই, ইংলিশ মিডিয়ামে। উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে পড়াশোনাকালীন গল্প শোনাচ্ছিলেন তিনি। তার ভাষায়- ‘‘বিদেশে থাকা তেমন কষ্টের ছিলো না। কারণ, প্রতি তিন মাসে একবার দেশে আসতাম। সপ্তাহ, দশদিন থেকে আবার চলে যেতাম। তাছাড়া প্রতিদিন ফোনে কথা হতো আব্বু আম্মুর সাথে। ভিডিও চ্যাটে বাবা মা ভাই বোন ঘরদোর আঙিনা ও নিজের হাতে লাগানো ফুলের টব পর্যন্ত দেখা হতো…. ’’

এভাবে পড়াশোনা শেষ করে সেদেশেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাবা-মায়ের নির্দেশে চলে আসতে হয়েছে। এখন আর্থিক লেনদেনের বড় একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন।

বিভিন্ন শাস্ত্রের প্রতি তার আগ্রহের কথা তিনি শোনাচ্ছিলেন। পরম আবেগে শোনাচ্ছিলেন তাঁর পছন্দের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের কথা। দেশ-বিদেশের অসংখ্য স্মৃতি-গল্প সারাক্ষণ তার বুকে প্রজাপতির মতো ওড়োওড়ি করে, বলছিলেন। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একজন যুবকের জন্য যা খুবই স্বাভাবিক।

আমি তার জীবনের সঙ্গে আমার জীবনকে মিশিয়ে গল্প করছিলাম। আমার মাদরাসা জীবনের প্রসঙ্গে তার নানা কৌতূহলের জবাব দিয়ে যাচ্ছিলাম একের পর এক। এর মধ্যেই তার দ্বীন শেখা ও কোরআন শেখার প্রসঙ্গ উঠল। তিনি কিছুটা আফসোসের স্বরে বললেন, আরবি পড়া আর হয়ে উঠেনি। তবে ইচ্ছা আছে,  কোরআন শরীফ পড়াটা (!) শিখব।

জিজ্ঞেস করলাম, নামায তো পড়েন?

– মাঝেমধ্যে পড়ি। তবে বাদ যায়।

– সুরা, কেরাত কিছু তো মনে হয় আপনার আম্মুর কাছেই শিখেছিলেন, নাকি?

– না। শেখার সুযোগ হয়নি। তবে শিখব। ইচ্ছা আছে।

– মানে, আমি নামাযের সুরাগুলোর কথা বলছি।

– না ভাই। আরবি পড়ার একেবারে সুযোগই হয়নি। ছোটবেলা থেকেই ইংলিশ মিডিয়ামে। তারপর অস্ট্রেলিয়ায়। তারপর এই তো এক বছর হলো দেশে এসেছি।

তিনি একটু দ্রুত এই প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে অন্য প্রসঙ্গে ঢুকে গেলেন। আমি তার যৌবনদীপ্ত বিপুল সম্ভাবনাময় চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম। ভেতরে ভেতরে কী এক ভাবনা, কী যেন ব্যর্থতা, কী অন্যায় ও অসহায়ত্ব অনুভব করে অন্যজগতে চলে গেলাম। এ আমার দেশ। এই আমার দেশের সন্তান। এই আমার মুসলিম ভাই। কাছাকাছি বয়সের আমরা দুজন কত দূরে। কত দূরে আমাদের জীবন জগত।

হঠাৎ কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাকে বললাম, আমি আপনাকে সুরা-কেরাত শেখাতে চাই। চলুন আপনার সারাদিনের রুটিন থেকে একটা সময় বের করি। তিনি একটু মুচকি হাসলেন। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, দুষ্টুমি না এবং কথার কথা না। আমি সত্যি সত্যিই আপনাকে সুরা-কেরাত শেখাতে চাই।…

এখন তিনি আমার অবস্থানের জায়গা থেকে বেশ দূরের একটি অফিসে চাকরি করেন। আর দেখা হয় না। কথাও হয় না। দুজনের ব্যস্ততা দুজনকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে। কে জানে কবে ‘আরবি’ শেখা হবে তার! কবে পূরণ হবে সুরাগুলো শেখার নিভু নিভু উজ্জ্বল ইচ্ছা?

আমি আমার একজন মুরুব্বির সঙ্গে তার বিষয়ে কথা বললাম। তিনি বললেন, এমন মুসলিম যুবক কি মনে করেছো এই দেশে একজন? অসংখ্য। তাদের জন্যে কে মেহনত করবে বলো? তোমরা মাওলানা হয়ে গেলেই তো মনে করো বড় বড় কিতাব পড়াতে হবে। দ্বীনের বড় বড় খেদমত করতে হবে।  জাগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা স্কুল কলেজে শিক্ষারত মুসলিম যুবকদের জন্যে মেহনত করাকে তোমরা ছোট খেদমত মনে করো। বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী মানুষদেরকে কোরআন ও দ্বীন শেখানোর মেহনতকে ছোট কাজ মনে করো। আমাদের মাওলানা ছাত্র ও আলেম সমাজ এসব বিষয়ে ফিকির না করলে ভবিষ্যত কেমন হবে ভেবে দেখ। আল্লাহর কাছে কী জবাব দিবে সেটাও ভাবো।

আমার আরেকজন উস্তায এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, প্রত্যেক অফিসে এবং সবধরণের কর্মক্ষেত্রে কমপক্ষে একজন করে আলেম থাকা দরকার যিনি তাদেরকে দ্বীন শেখাবেন, কোরআন শেখাবেন। ফরযে আইন ইলম শেখাবেন। মরতে তো হবে সবাইকেই। মুসলমান হয়েও দীন না শিখে এবং দীন না শিখিয়ে মরে গেলে আল্লাহর কাছে পেশ করার মতো কোনো জবাব তো নেই।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ঘটনার দ্বিতীয় পর্বটি ওদিকে।

জাগতিক শিক্ষার সাথী-সহকর্মী ও হিতকামী আত্মীয়স্বজনেরা আমাদেরকে নিয়ে কী ভাবেন?  অতীতে এবং বর্তমানে আমার মতো আরো অনেকেই হয়তো তাদের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলে দেখেছেন যে, আমাদের সম্পর্কে তাদের ধারণা ও বক্তব্য কী।

আমাদের ব্যর্থ জীবন ও অর্থহীন বোকামি(?) দেখে তারা তো রীতিমতো অবাক! বেশ কয়েক বছর আগে এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি আমার শিক্ষাজীবন, ব্যক্তিজীবন ও স্বপ্ন-আকাক্ষার কথা শুনে বলেছিলেন, তুমি এবং তোমার মতো প্রতিভাবান ছেলেদের জন্য আমার অনেক আফসোস হয়। এই বিপুল মেধা, প্রতিভা ও সম্ভাবনা নিয়ে তোমরা পড়ে আছো মাদরাসায়। তোমাদের ভবিষ্যত কী? পড়াশোনা সমাপ্ত হলে সুদূর পল্লী গ্রামে কিংবা শহরেরই কোনো মসজিদে ইমামতি করবে। কিংবা হয়তো কোনো মাদরাসায় পড়াবে। ব্যস্ এর মধ্যেই তোমার জীবন শেষ। দেশ জাতি তোমার থেকে কী পাবে?! প্রতিভাবান মেধাবী সন্তানেরা দেশের বড় সম্পদ। তাদের সম্ভাবনা কাজে না লাগা মানে দেশের উন্নতি-অগ্রগতির বিপুল সম্ভাবনা বিনষ্ট হওয়া।’

সেদিনও আমি প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম। মাদরাসা ও দ্বীনী ইলম শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের ধারণার কথা শুনে খুবই বিচলিত হয়েছিলাম। কিন্তু সত্য কথা হলো, আমি সেদিন তার সবকথার যথাযোগ্য উত্তর দিতে পারিনি। ফলে নিজের মধ্যে খুবই অস্থির এক অবস্থা অনুভব করেছি। একই দেশের বাসিন্দা আমরা। একই পরিবারে, একই সমাজে একত্রেই আমাদের জীবনচলা। কিন্তু আমাদের চিন্তা-ভাবনার দূরত্ব কত! একের প্রতি অপরের ধারণা ও অভিব্যক্তি কেমন দুঃখজনক!

এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আরো অগ্রসর পদক্ষেপ কী হতে পারে? একে অপরের আরও কাছে আসার, আরও আপনত্ব ও মহব্বতের সঙ্গে কাজ করার কী পদ্ধতি হতে পারে? এ বিষয়ে ভাববার তীব্র প্রয়োজন কি এখন হয়ে যায়নি?

লেখক: আলেম-প্রাবন্ধিক

 

পূর্ববর্তি সংবাদঅনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিমের বাসা থেকে বিপুল টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ও মদ উদ্ধার
পরবর্তি সংবাদজামিনে মুক্তি পেলে খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন