তাবলিগের চলমান সংকট নিরসন ও জনমন থেকে বিভ্রান্তি দূর করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে চলছে ওয়াজাহাতি জোড়। স্থানীয় তাবলিগি সাথী ও উলামায়ে কেরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এসব ওয়াজাহাতি জোড়ে অংশগ্রহণ করছেন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ আলেমগণ। তারা সেখানে স্পষ্ট করার চেষ্টা করছেন তাদের অবস্থান ও বক্তব্য। এসব ওয়াজাহাতি জোড়ের উদ্দেশ্য, আয়োজন ও ফলাফল নিয়ে কথা বলেছেন বৃহত্তর ঢাকা জেলার উদ্যোগে আয়োজিত মিরপুর ওয়াজাহাতি জোড় বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ। ইসলাম টাইমসের পক্ষে তার সঙ্গে কথা বলেছেন আতাউর রহমান খসরু।
ইসলাম টাইমস : দেশব্যাপী ওয়াজাহাতি জোড় হচ্ছে। এই ওয়াজাহাতি জোড়ের উদ্দেশ্য কী?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : সাম্প্রতিক কালে মাওলানা সাদকেন্দ্রিক তাবলিগ বিষয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তা দূর করার জন্যেই ওয়াজাহাতি জোড়গুলো করা হচ্ছে। অনেকের কাছেই পরিস্কার না তাবলিগ বিষয়ে হুজুররা কেন পরস্পরের বিরোধিতা করছেন, মাওলানা সাদ-এর সমস্যাটা কী? এর সমাধানের পথ কী-এসব বিষয়গুলো পরিস্কার করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে জোড়গুলো করা হচ্ছে।
শুধু মাওলানা সাদ-এর অনুসারীগণ নয়; বরং আমাদের উদ্দেশ্য, অনুসারীদের মাধ্যমে বার্তা মাওলানা সাদ পর্যন্ত পৌঁছে যাক। তিনিও ভুল পথ থেকে তওবা করে সঠিক পথে চলে আসুন।
ইসলাম টাইমস : ওয়াজাহাতি জোড়গুলোতে আপনাদের মূল বক্তব্য কী থাকছে
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : আমরা বলতে চাচ্ছি আজ দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে যে সমস্যা হচ্ছে তা মূলত মাওলানা সাদ-এর জন্যই হচ্ছে। তিনি কুরআন-সুন্নাহবিরোধী কথা বলছেন। তাবলিগের তিন হজরতজির (পূর্ববর্তী তিন আমির) প্রদর্শিত পথ থেকেও সরে গেছেন। নিজের মনমতো সব কাজ করছেন। আমির হওয়ার শরয়ি যে পদ্ধতি আছে এবং যে পদ্ধতি তাবলিগ জামাতে প্রচলিত ছিল, তিনি তা অমান্য করেছেন। তার এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তার অনুসৃত তাবলিগ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে।
ইসলাম টাইমস : মাওলানা সাদের বিভ্রান্তি বা আপনাদের বক্তব্য পরিস্কার করার কেন দরকার? এতে উভয় পক্ষের দূরত্ব বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে!
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : মাওলানা সাদের বিভ্রান্তিগুলো বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং মানুষের ঈমান রক্ষা করতেই হবে। মানুষকে সচেতন না করলে মানুষ অজ্ঞতাবশত তাতে জড়িয়ে যাবে। তাবলিগের কাজ বিশ্বব্যাপী, সুতরাং এ বিভ্রান্তি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। সাধারণ মানুষ যারা মাওলানা সাদের বক্তব্যের বিভ্রান্তি ধরার মতো জ্ঞানগত প্রজ্ঞা নেই তাদের ঈমান; বরং স্বয়ং দাওয়াত-তাবলিগের কাজকে রক্ষার জন্যই এ জোড়গুলোর অনুষ্ঠান প্রয়োজন।
আমি মনে করি না এতে দূরত্ব বাড়ছে। আমার মনে হয় মাওলানা সাদের অনুসারীরা যখন প্রকৃত বিষয়টা জানতে পারবে তখন দূরত্ব আরও কমে আসবে। আপনি খেয়াল করবেন, এক সময় যারা পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্য দিয়ে পৃথিবীতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এখন তারা মারামারি হাতাহাতি পর্যন্ত করছেন। যখন বিরোধিতার কারণ জানতে পারবেন তখন বিরোধ আর থাকবে না।
ইসলাম টাইমস : জোড়গুলোতে সাধারণ মুসল্লিদের অংশগ্রহণ এবং সাড়া কেমন পাচ্ছেন?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : আল-হামদুলিল্লাহ! সাধারণ মানুষ বিপুল পরিমাণে অংশগ্রহণ করছেন এবং তাদের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। অনেকেই ভুলটা বুঝতে পারছেন। তারা বুঝতে পারছেন মাওলানা সাদ তাবলিগের নামে যা করছেন তা আগে ছিল না এবং শুদ্ধও নয়। যদিও তাদের একটি অংশ সরকার ও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসলাম টাইমস : আপনাদের কাজের মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের আশা কতোটুকু?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : সারা পৃথিবীতে মাওলানা সাদের অনেক অনুসারী আছেন। তারা বুঝে না বুঝে তার অনুসরণ করছেন। সুতরাং মাওলানা সাদ যতদিন সঠিক বিশ্বাসে ফিরে না আসবে ততদিন সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না।
তবে আমরা আশা করি, আমরা যদি মানুষের সচেতনতা বাড়াতে পারি তবে বহু মানুষ তার থেকে বিমুখ হবে এবং তাতে উনি কিছুটা হলেও হতাশ হবেন, তার মনোবল ভেঙে পড়বে।
ইসলাম টাইমস : এসব জোড়ে মাওলানা সাদের অনুসারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোনো চেষ্টা করা হচ্ছে কি?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : শুধু তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ কেন হবে? সাধারণ মানুষেরও জানা দরকার কেন আজ বিরোধের সৃষ্টি হল। তারাও তো বুঝতে পারছে না। আমাদের পক্ষ থেকে তাদের পৃথক কোনো দাওয়াতের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু আমরা আয়োজনগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রাখি যেন তারাও আসতে পারে। প্রোগ্রামের আগেও প্রচার করি, প্রোগ্রামের বক্তব্যগুলোও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়। তারা ইচ্ছে করলেই তা দেখতে পারেন। তাদের কৌতূহল কম নয়। আমরা জেনেছি, মাওলানা সাদের অনুসারীদের মাঝামাঝি পর্যায়ের কেউ কেউ জোড়ে অংশগ্রহণ করছেন এবং তাদের অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে।
ইসলাম টাইমস : বর্তমান সমস্যা নিরসনে ওয়াজাহাতি জোড় ছাড়া আপনাদের আর কী কী কার্যক্রম রয়েছে?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : ওয়াজাহাতি জোড়ের বাইরে আলেমদের কেউ কেউ লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।
ইসলাম টাইমস : জোড় নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী? তা কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : সারা দেশের প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি থানায় জোড় করার ইচ্ছে আছে আমাদের। সম্ভব হলে প্রতিটি ইউনিয়নেও করবো। উলামায়ে কেরামের সহযোগিতায় জোড়গুলোর বাস্তবায়ন করছেন তাবলিগের সেসব সাথী যারা মাওলানা সাদকে পছন্দ করেন না। তাদের সাথে রয়েছে সাধারণ মুসল্লিগণ।
ইসলাম টাইমস : অভিযোগ উঠেছে, ওয়াজাহাতি জোড়ে অনেকে তাদের বক্তৃতায় এমন ভাষা ব্যবহার করেন যা তাবলিগি মেজাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : এটা হচ্ছে না তা বলব না। তবে জোড় বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিটি বৈঠকেই আমরা বার বার বলি যেন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী ও আক্রমণাত্মক কোনো বক্তব্য দেয়া না হয়। তারপরও কিছু মানুষ এমন কথা বলে ফেলেন। আসলে বড় আয়োজনে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। আবার আপনি যদি সবগুলো বক্তব্য শোনেন গরম-নরমের একটা ব্যালেন্স হয়ে যায়। তবুও আমরা বলব এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।
ইসলাম টাইমস : কিছুদিন আগে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটা পরিপত্র জারি করা হয়। আবার তা বাতিলও করা হয়। ব্যাপারটা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মাওলানা শাহরিয়ার মাহমুদ : হ্যাঁ, কয়েকদিন আগে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয় এবং পরবর্তীতে তা বাতিলও করা হয়। চিঠি দেখেই বুঝেছিলাম এটা কোনো নিরপেক্ষ মানুষের কাজ নয়। পরে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান এ কাজের নেপথ্যে রয়েছেন। তিনি এর আগে মন্ত্রিসভার একটি চিঠিকে পূঁজি করে এ কাজ করেন। আলেমদের তৎপরতায় কর্তৃপক্ষ বিষয়টির বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারেন এবং পরে তা বাতিল করেন। ■
















