আলী হাসান তৈয়ব।।
আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ। নবীরা ছিলেন মহান আল্লাহর মিডিয়া। মিডিয়া মানে মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা নবীদের মাধ্যমে মানুষকে নিজের বার্তা পাঠিয়েছেন। শেষ নবীর পর তাঁর ওয়ারিশ তথা আলেমরাই আল্লাহর মিডিয়া। আল্লাহর নবীর (সা.) মিডিয়া। আলেমরাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। এটাই তাদের দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দীন হলো কল্যাণকামিতা’। কল্যাণের বিস্তার ও অকল্যাণের প্রতিরোধই মিডিয়ার দায়িত্ব। যে মিডিয়া এ ভূমিকা পালন করে ইসলাম তাকে পূর্ণ সমর্থন করে। বরং উৎসাহ যোগায়। মিডিয়ায় এখন অকল্যাণপন্থীদের আধিপত্য। কল্যাণপন্থীরা মিডিয়ামহল তাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে রাখতে পারেন না।
তৃতীয়ত, ইসলাম তাবলিগনির্ভর ধর্ম। তাবলিগ মানে পৌঁছে দেওয়া। মিডিয়ার কাজও তথ্য পৌঁছে দেওয়া। তাই তাবলিগ ও দাওয়াতের লক্ষ্য পূরণে আধুনিক মিডিয়া কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। নবী (সা.) তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় মিডিয়া হাট-বাজার ও পাহাড়কে বেছে নিয়েছিলেন আল্লাহর পয়গাম বা বার্তা তুলে ধরতে। বর্তমানের মিডিয়া তারই পরিবর্তিত রূপ। তাই মিডিয়াকে দীনের প্রচারে কাজে লাগানো সময়ের অন্যতম ফরজ।
মোদ্দাকথা, ইসলাম মিডিয়ার সহায়ক। মিডিয়াও ইসলামের সহায়ক। ইসলামপন্থীরা মিডিয়াকে গুরুত্ব না দেয়ায় আর মিডিয়ার লোকেরা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে ওঠাবসা না করায় পরস্পর সহায়ক দুই শক্তি একে অপর থেকে অনেক দূরে। এটা বড় দুঃখজনক। আলেমদের মধ্যে যারা মিডিয়ায় সামান্য পদচারণা করছেন, এ দূরত্ব ঘুচাতে কাজ করার বড় দায়িত্ব তাদেরই।
সুখের কথা, বর্তমানে বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন- সবধারার মিডিয়ায় আলেমদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে তাদের অধিকাংশই মূলত একটি নির্দিষ্ট বিভাগ বা পাতার দায়িত্ব পালন করছেন। মূলধারার সাংবাদিকতায় এখনও আলেমদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। যে দুচারজন এ চ্যালেঞ্জ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, তারা নিজেদের আলেম পরিচয় মুছে কিংবা গোপন করে সেটা করছেন। এতে কোনো কৃতিত্ব নেই। আত্মবিস্মৃত হয়ে কেউ অন্যের জন্য উপমা হতে পারে না।
মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকতা এবং বার্তা বিভাগে মজবুত অবস্থান তৈরির প্রত্যয় দরকার কিছু আলেম-সাংবাদিকের। মূলধারার সব বিভাগে কাজ করার টার্গেট ও প্রত্যয় নিয়ে নিজেদেরকে যোগ্য করে তোলা উচিত। এককথায় সব ধারার মিডিয়াতে আলেমদের যুক্ত হতে হবে। এ অভিযান সহজেই আমরা শুরু করতে পারি প্রথমে অনলাইন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। আওয়ার ইসলাম, ইসলাম টাইমস ও ফাতেহসহ ইসলামি ঘরানার নিউজ পোর্টালগুলো এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত করেছে।
সব ধারার মিডিয়ায় আমাদের সম্ভাবনা বিশাল, আছে সংকটও। প্রথমে সংকটের কথা বলে নিই : একটি সংকট নৈতিক। আলেম-উলামা যে পরিবেশে লালিত-পালিত হন, মিডিয়ার পরিবেশ তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে পর্দার মতো ফরজ বিধান রক্ষা কিংবা নামাজের মতো ফরজ বিধানের হক নিয়মিত আদায় কথা ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা অক্ষুণ্ন রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় জানি, এ অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ জয়ের জন্য নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, পূর্বসুরী পুণ্যাবানদের জীবনী ও রচনাসম্ভার পাঠ এবং নিজেদের দরদি ও আমলি উস্তাদদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা বেশ সহায়ক।
কাজের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আমাদের পোশাক ও লাইফস্টাইল। আত্মপ্রত্যয় ও নৈতিক বল থাকলে এই চ্যালেঞ্জ জয় করা কঠিন কিছু নয়। বরং নিজে যদি সততা ও নৈতিকতার সত্যিকার অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এটি হবে দাওয়াতের সেরা একটি উপায়। আপনাকে দেখে খোদ মিডিয়ার লোকেরাই উঠবে হেদায়েতের পথে।
যে ধর্মপাতা বা ইসলাম ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন মিডিয়ায় আমাদের পদচারণার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে, সেখানেও আমাদের সংকট আছে। প্রথম সংকটটা তৈরি হয়েছে মালিক বা সম্পাদক পক্ষ থেকে। তারা ধর্মসংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে চান, ইসলামকে যেন তারা খণ্ডিত কিংবা কেবল ফজিলত সর্বস্ব একটা ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেন। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপনে বাধ সাধেন সম্পাদক বা মালিকেরা। ইসলাম যে সার্বজনীন, পূর্ণাঙ্গ ও চমৎকার একটা জীবনব্যবস্থা সে ব্যাপারে তাদের ধারণা না থাকায় এ সমস্যা।
আরেকটা সংকট আমাদের দিক থেকে। আমরা যারা ধর্মবিষয়ক দায়িত্বে থাকি বা ধর্ম নিয়ে মিডিয়ায় বিচরণ করি, তাদের অধিকাংশেরই পড়াশোনা বা গবেষণার লেভেল সন্তোষজনক নয়। গতানুগতিক আলেম হয়ে দু’কলম লিখতে বা বলতে পারার যোগ্যতা নিয়েই এখানে চলে আসি। ইলমি যোগ্যতাসম্পন্ন আমাদের বোদ্ধা অংশ খুব কমই মিডিয়ায় সম্পৃক্ত হন। এতে করে ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ও অবিকল্প জীবনব্যবস্থা সেটা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না। মালিকপক্ষকে ভালোভাবে বোঝাতে পারি না। গতানুগতিক আমল-ফজিলত সম্পর্কিত কিছু বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকি। যার দরুণ কেবল এইসব বিষয়েই ইসলাম সীমাবদ্ধ–এই ভুল ধারণার তৈরি হয়।
এই সংকট কাটাতে মিডিয়ায় আমাদের মেধাবী ও ইলমি যোগ্যতা সম্পন্ন বোদ্ধা শ্রেণির সম্পৃক্ততা অতি জরুরি। এটা করতে পারলে মালিকপক্ষ থেকে সংকট, সেটাও কেটে যাবে। কারণ তখন যোগ্যদের প্রভাব ও ইসলামের যথার্থ উপস্থাপন মালিকপক্ষকে প্রভাবিত করবে এবং ধর্ম বিষয়ে মালিকপক্ষ নিজেদের ভাবনা পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ হবেন। ধর্ম বিষয়ে যারা মিডিয়ায় কাজ করছেন, তাদেরকে গভীরভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে ভালো যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি যোগ্য যারা আছেন এই আওতার বাইরে, তাদেরও এদিকে নজর দেওয়া উচিত। মিডিয়ায় ইসলামের সঠিক চিত্র তুলে ধরা কিংবায় ইসলামে শিক্ষা-আদর্শ মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যোগ্য আলেমমিডিয়াকর্মী ছাড়া অসম্ভব।
এবার বলি সম্ভাবনার কথা। সম্ভবনার দিক আছে অনেক। প্রথমটি হলো ভাষাদক্ষতা। আমাদের তরুণ আলেমরা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কল্যাণে এমনিতেই তিন-চারটা ভাষা শেখার সুযোগ পান। মাদরাসায় শেখা ভাষাগুলোর মিডিয়াভাষা একটু বিশেষ যত্ন নিয়ে কিছুদিন চর্চা করলে, সঙ্গে একটু চেষ্টা করে যদি ইংরেজিটাও তাঁরা শিখে নিতে পারেন, তবে জাতীয় দৈনিকগুলোর আন্তর্জাতিক পাতাগুলোতে কাজের সুযোগ সুবিস্তৃত। কারণ, ওই ধারার সাংবাদিকদের কাছে আরবি-উর্দু-ফার্সির মতো অতিরিক্ত ভাষা নেই। অতিরিক্ত একটি ভাষা মানে আরও দুটি চোখ আপনার সঙ্গে। ছয়টি অতিরিক্ত চোখ যার আছে, তার কদরের অভাব নেই কোথাও। আন্তর্জাতিক পাতাগুলোর রিপোর্টার নিয়োগের সময় আপনি যেকোনো পত্রিকায় আবেদন করলে, আপনার অনুবাদের হাত মোটামুটি ভালো থাকলে পত্রিকা আলেম-ওলামাবিদ্বেষী হলেও আপনাকে নিতে বাধ্য। কারণ, আপনি ইংরেজি অনুবাদের পাশাপাশি যখন বলবেন সরাসরি আরবি আল-জাজিরা থেকে বা ফার্সি পারস টুডে কিংবা উর্দু জংগ থেকে নিউজ উদ্ধার করে দেবেন, তখন অন্যদের তুলনায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও আপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ তাদের দরকার কাজ। আরও দরকার প্রতিযোগিতার বাজারে এগিয়ে থাকা। এই প্রতিযোগিতার কারণে সবাই বাধ্য যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করতে। যোগ্যদের কেউ মূল্যায়ন না করলে সে নিজেই পিছিয়ে পড়ে।
তাই আমাদের আলেমশ্রেণীরর তরুণ যারা মিডিয়ার চ্যালেঞ্জিং জগতে আসার স্বপ্ন দেখেন, আমি তাদের বলব, আপনার শেখা ভাষাগুলোকে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি ভাষা হিসেবেও একটু চর্চায় রাখেন। অসংখ্য সম্ভাবনা আপনাকে উঁকি দিয়ে ডাকছে। নিত্যনতুন মিডিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটছে, সবাই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সংকল্প নিয়ে মাঠে নামছে। সুতরাং নিজের যোগ্যতা মেলে ধরতে পারলে আপনার স্বপ্ন পূরণ কঠিন কিছু নয়।
লেখক : সহসম্পাদক, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ
















