শামসুদ্দীন সাদী ।।
গণমাধ্যম অর্থ মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম। ভাবগত চিন্তাগত সংবাদগত সব ধরনের যোগাযোগ এর অন্তর্ভুক্ত। শুধু যোগাযোগ মাধ্যম বলা ঠিক হবে না,গণমাধ্যমের রয়েছে বহুমুখী আবেদন। নিজের চিন্তা-চেতনা বিকশিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একে বিবেচনা করা হয় জাতির দর্পণ হিসেবে। এর মধ্য ফুটে ওঠে জাতির প্রতিচ্ছবি,সভ্যতা,কৃষ্টি কালচার। গণমাধ্যমকে বিবেচনা করা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে।
সভ্যতার লড়াইয়ের এই যুগে সবচেয়ে বড় অস্ত্র গণমাধ্যম। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সহায়তায় কোথাও যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করছে, জুজুর ভয় সৃষ্টি করে কোনো দেশের স্বাধীনতা স্বকীয়তা ভূলুণ্ঠিত করছে। সরকারগুলোকে করছে পদানত।
তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশই বৈশ্বিক গণমাধ্যমের প্রোপাগান্ডায় পরাশক্তিগুলোর তাঁবেদারে পরিণত হয়। বলা বাহুল্য,বিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সবই ইহুদি-খ্রিস্টানদের দখলে। সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে সুকৌশলে তারা মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে এবং অনেকটা সফলতাও লাভ করছে। দেশীয় প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতেও রয়েছে ইসলামবিদ্বেষী আন্তর্জাতিক চক্রের অঢেল বিনিয়োগ।
একটি গণমাধ্যম চালানোর জন্য যে আর্থিক সঙ্গতি প্রয়োজন তার সিংহভাগ আসে বিজ্ঞাপন থেকে। বিজ্ঞাপন ছাড়া একটি ছোটখাট পত্রিকা বের করাও কঠিন। বড় মিডিয়া হাউজ করার তো প্রশ্নই আসে না। নিকট অতীতে ইসলামী ঘরানার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রচারসংখ্যায় শীর্ষে উঠে এসেছিল। সারাদেশে বেশ দাপটের সঙ্গেই চলেছিল বছর খানেক। কিন্তু যতদূর জানি, প্রচারসংখ্যায় শীর্ষে থাকা সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার পেছনে বড় সংকট ছিল বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনদাতারা নিজেদের আদর্শ ও চিন্তাচেতনা লালনকারী মিডিয়া ছাড়া অন্যদের বিজ্ঞাপন দেয় না। ইসলামী চেতনা লালনকারী কোনো মিডিয়াকে তারা কখনো বিজ্ঞাপন দেয়নি,দেবেও না।
মিডিয়া করার স্বপ্ন যারা দেখেন তাদের সামনে আর্থিক সমস্যাটা সবচেয়ে বড় আকারে ধরা দেয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বর্তমান যে গতিপথ, ইসলামী ট্যাগ লাগা কোনো মিডিয়াই খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারছে না। নানা কৌশলে বিভিন্ন অজুহাতে তাদের চতুর্দিকে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে যে,তারা পিছু হটতে বাধ্য হয় অথবা নিভু নিভু অবস্থায় টিকে থাকে। প্রভাব বিস্তারী কার্যকর ভূমিকা রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এর পেছনে শুধু যে,আন্তর্জাতিক চক্রান্ত জড়িত তাই নয়,দেশের ভেতরেও ঘাপটি মেরে থাকা ইসলামবিদ্বেষী সুশীল সমাজও সমানভাবে জড়িত।
কিন্তু এর ভেতর দিয়েও আমাদের পথ আমাদেরই তৈরি করে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের খবরাখবর সত্যতার সাথে তুলে ধরার চেষ্টা করছে কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আল জাজিরা। বলা যায়, একচেটিয়া মিথ্যা প্রচারণার বিপরীতে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আল জাজিরা মুসলিম বিশ্বের অনেক সঠিক সংবাদ তুলে ধরছে বিশ্ববাসীর সামনে। কিন্তু প্রভাবশালী অনেকগুলো গণমাধ্যমের মোকাবেলায় তা খরকুটোর মতোই।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইন্টারন্যাশনাল গেমের একটি উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশ। এখানে প্রভাব বিস্তারে সাম্রাজ্যবাদীরা নানাভাবেই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাধীনতার ওপর নানা হুমকি সত্ত্বেও অনেক সময় আমাদের মিডিয়া থাকে নিশ্চুপ। কখনো প্রকাশ্যেই সাম্রাজ্যবাদের পক্ষ নেয়। বলা যায়, সাম্রাজ্যবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কোনো মিডিয়া আমাদের দেশে টিকতে পারে না। এর একটি জ্বলন্ত উদহারণ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা।
এতসব সমস্যা ও সীমিত সাধ্য নিয়ে এক-দুটি মিডিয়া ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিশেষত,অনলাইন মিডিয়ায় ইসলাম টাইমস ইতোমধ্যে সুধী মহলে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ততার সাথে নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করছে। ইতোমধ্যে তাদের এক বছর পূর্তি হচ্ছে। সামনের দিনগুলো আরো সমৃদ্ধ হোক এই কামনা করছি।
ইসলাম টাইমসের শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদক শরীফ মুহাম্মদ মিডিয়া জগতে আমাদের আইকন। আমাদের গৌরব। তিনি একটি দৈনিক করার স্বপ্ন দেখেন দীর্ঘদিন থেকে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সেই যোগ্যতাও দিয়েছেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের সাধ্য নেই। একটি দৈনিক পত্রিকার জন্য হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। আপাত দৃষ্টিতে ইসলামের পক্ষে এই বিশাল বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় না।
কিন্তু স্বপ্নবাজ শরীফ মুহাম্মদ হতাশ হতে চান না। হতোদ্যম হতে চান না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। আল্লাহ যেন তাঁর স্বপ্ন পূরণ করেন। বিত্তবান লোকদের এ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া উচিত। মিডিয়াকে বলা হয় বড়লোকের বাড়ির কুকুর। এর অর্থ হলো, মিডিয়া ছাড়া নিজের স্বার্থ,সম্পদ,আদর্শ ও অধিকার কিছুই রক্ষা করা যায় না।
মনে রাখতে হবে, এ যুগে যাদের হাতে মিডিয়া নেই, তাদের অবস্থা উদ্বাস্তু মানুষের মতোই। না তাদের অধিকার থাকে, না থাকে কথা বলার স্পেস। মার খেয়ে উহ্ শব্দ করার অধিকারও থাকে না তাদের; বরং ধন্যবাদ দিয়ে কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হয়। শত্রুর সাজানো ষড়যন্ত্রের মধ্যে ডুবে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকে না। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের নানা সংকট, দুর্যোগ ও মানবাধিকারহীনতা তারই বহিঃপ্রকাশ।
লেখক: আলেম-লেখক
প্রশিক্ষণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম
















