ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অযৌক্তিক রায় : কে কী বললেন

শিহাব সাকিব  ।।

গত শনিবার ৯ নভেম্বর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত তাদের  দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের রায় ঘোষণা করেছে । এই রায়কে ঘিরে নানা মহল থেকে ওঠছে নৈতিকতা ও সুবিচারের প্রশ্ন। হিসেব মিলাতে পারছেন না অনেকেই।

ভারতের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার বলেছেন, “কিসের ভিত্তিতে আজ মন্দির তৈরির নির্দেশ? বিশ্বাসের ভিত্তিতে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলল, অনেক হিন্দুর বিশ্বাস যে, ওখানে রামের জন্ম হয়েছিল। বিশ্বাস বা আস্থার মর্যাদা রাখতে ওই বিতর্কিত জমি রামলালা বিরাজমানের নামে দিয়ে দেওয়া হল। এটা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত হল? রামচন্দ্র আদৌ ছিলেন কি না, কোথায় জন্মেছিলেন, সে সবের কোনও প্রামাণ্য নথি কি রয়েছে? নেই।”

“রাম শুধু মহাকাব্যে রয়েছেন। সেই সূত্রে অনেক মানুষের মনে একটা বিশ্বাসও রয়েছে।কিন্তু সেই বিশ্বাসের বলে একটা মসজিদের জমি মন্দিরের নামে হয়ে যেতে পারে না। কালকে যদি আমি বলি, আপনার বাড়ির নীচে আমার একটা বাড়ি রয়েছে, এটা আমার বিশ্বাস, তা হলে কি আপনার বাড়িটা ভেঙে জমিটা আমাকে দিয়ে দেওয়া হবে?”

অশোক কুমার আরো বলেন, “ভারত সংবিধান তৈরি হওয়ার সময় এখানে মসজিদ ছিল। এবং সংবিধান হিসাবে সেটি রক্ষা করা সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব। সংবিধানের আগে কী ছিল, সেটা রক্ষা করার দায়িত্ব ‍সুপ্রিম কোর্টের নয়। গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের আগে কোথায় কী ছিল সেটা দেখতে গেলে কত মন্দির মসজিদই তো ভাঙ্গা পড়বে।”

তাছাড়া আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার মামলা চলছে আজ ২৭ বছর ধরে। ইতিমধ্যে এই মামলায় অভিযুক্ত বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অশোক সিঙ্ঘল, গিরিরাজ কিশোরের মতো অনেকই মারা গিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই নানাজনের মনে সেই মামলা রায় নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে। বিশেষত ভারতের শীর্ষ আদালত যখন এই হামলাকে আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছে, তখন এ মামলায় অভিযুক্তদের শাস্তি কবে হবে?

এদিকে বাবরি মসজিদের রায়কে কেন্দ্র করে কোন ধরণের নাশকতা বা অরাজকতা যেন তৈরি না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন মুসলিম নেতৃবর্গ। সাথে সবাইকে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।

মাওলানা আরশাদ মাদানি ভারতের মুসলিমদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, এ রায়কে পরাজয় ও বিজয় হিসেবে না দেখে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুসলিমদের নিরাপত্তার বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের মুখপাত্র ও সেক্রেটারি মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রাহমানী বলেন, বাবরি মসজিদ বিষয়েকোর্টের ফায়সালা মেনে নিবো। কিন্তু আমাদের ন্যায় বিচার হয়নি এটাও আমরা বলছি।

মুসলিম উম্মাহ পুরো পৃথিবীব্যাপী অনেক জুলুম নির্যাতন ও নিপীড়ন সহ্য করেছে। কত ঘরবাড়ি মসজিদ মাদরাসা ধ্বংস হয়েছে জালিমদের হাতে, এর ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। সেই ধারাবহিকতায় বাবরি মসজিদও আমরা হারালাম!

এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় হল, মুসলিম উম্মাহর জন্য বেশি বেশি দুআ করা। নিজের সাধ্যমত সব ধরণের অন্যায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের চেষ্টা করা। আপন দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়া। দাওয়া ও তাবলিগের নানামুখি কর্মকাণ্ডে শরিক থাকার চেষ্টা করা। ন্যায় ও নৈতিকভাবে প্রতিবাদ করতে থাকা।

সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এই মুহূর্তে আমাদের হাতে যা কিছু আছে তা সংরক্ষণের ব্যাপারে পূর্ণ চেষ্টা করা। এসব যেন হাতছাড়া না হয় সেই মেহনত অব্যাহত রাখা। এ প্রসঙ্গে মুফতি তকি উসমনি হাফিযাহুল্লার একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে এই নিবন্ধের ইতি টানব।

স্পেন সফরের বেদনাবিধুর ও আবেগাপ্লুত স্মৃতিচারণকরে তিনি লিখেন, আমার সফরসঙ্গী ও বন্ধু সায়ীদ আহমদ স্পেনের মুসলিম ইতিহাস ঐতিহ্য মন্থন ও বর্তমান হালত দেখতে দেখতে আবেগপ্রবণ হয়ে এক পর্যায়ে বলে ওঠলেন, কখন মুসলিমরা এই অঞ্চলে আবার ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলিত করবে!

আমি জবাবে বললেন, এই সময়ে যদি মুসলিমরা তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের স্বাধীনতা আগলে রাখতে পারে এবং এসব অঞ্চলে স্পেনের নির্মম ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই ব্যবস্থা নিতে পারে, এটাই অনেক কিছু। -দুনিয়া মেরে আগে, ৬৩।

পূর্ববর্তি সংবাদতূর্ণা চালকের সিগনাল অমান্য করাই ট্রেন দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী
পরবর্তি সংবাদ৭ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ শুরু