আল মাহমুদ দুই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি : সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: এ বছরের ফেব্রুয়ারী মাসের ১৫ তারিখে মৃত্যুবরণ করা কবি আল মাহমুদকে দুই বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম লেখক প্রয়াত সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ।

গতকাল ১১ নভেম্বর সংবাদমাধ্যম বিডি নিউজে ১৯৯০ সালে নেওয়া লেখক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের একটি অগ্রন্থিত সাক্ষাতকার প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সাক্ষাতকারে তিনি মরহুম কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে এ মন্তব্য করেছিলেন। মুস্তাফা সিরাজের  অগ্রন্থিত সাক্ষাতকারটিতে দুই বাংলার সাহিত্য –সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, মানস-চিন্তা এবং জীবনবোধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

লেখক মুস্তাফা সিরাজ ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজারে তিনি দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। ১৯৯০ সালের ১৩ অক্টোবর  সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছিলেন মাহমুদ হাফিজ।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিয়ে আমার ভীষণ কৌতূহল আছে। অনেকে বইপত্র পাঠিয়েও থাকেন। বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক বইপত্র আসে না। নিজের আগ্রহে যতোটুকু জানতে পারি এই আর কি! তবে একই ভাষায় যেহেতু দুটি দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা হয়, সেহেতু জানার প্রবল আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। সে আগ্রহ আমার সবসময়ই ছিল, আছে।

 ঢাকা ও কলকাতার লেখকদের মনস্তত্ব নিয়ে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বলেন, বাংলাদেশের লেখকেরা কলকাতা বা কলকাতার লেখকদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন। ঠাট্টা করে আমি একে বলি, বাংলাদেশের লেখকদের ‘কলকাতা জ্বর’। এটা কাটিয়ে ওঠা দরকার।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের পাঠক সম্ভবত বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে ততোটা আগ্রহী নন। কারণটা বলতে হলে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করতে হয়। তাহলো ধর্ম সম্প্রদায়ঘটিত ব্যাপার। বাঙালি মুসলিম পাঠক হিন্দু জীবন সম্পর্কে যতোটা আগ্রহী, বাঙালি হিন্দু পাঠক (তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি) স্বাভাবিক মুসলিম জীবন সম্পর্কে ততোটা আগ্রহী নন।

ধর্ম, ভাষাগত ও উচ্চারণগত ভিন্নতা, জীবনযাত্রার মান-এরকম বহুবিধ কারণে ঢাকার সাহিত্য, কলকাতার সাহিত্য থেকে আলাদা-এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বলেন,  সে তো হবেই। আমেরিকার ইংরেজি, বৃটেনের ভাষাও ইংরেজি। তাই বলে দু’দেশের সাহিত্যের ভাষা (আক্ষরিক অর্থে নয়) কখনোই এক নয়।

‘আর বিশেষ করে ঢাকা, কলকাতার ক্ষেত্রে ধর্ম ব্যাপারটা একটা বড় সমস্যা। মুসলিম জীবনের আচার, আচরণ, ধর্মচর্চা ও নিয়ম-নীতি, খাদ্যাভ্যাস আর জীবনের সমগ্রতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত ঢাকার সাহিত্য। কলকাতার হিন্দু জীবন ও সনাতন ধর্ম সংস্কৃতি বা সামগ্রিক জীবনের বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে কলকাতার সাহিত্য। তবে সাহিত্যবিচারে ধর্ম বাধা হওয়া বা বিবেচ্য হওয়ার কোন কারণ নেই।’

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বলেন, মনে করি, বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের ‘কলকাতা জ্বর’ কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে। নিজেদের হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কলকাতার সাহিত্যের প্রতি তোষামোদপ্রিয়ভাব কাটাতে হবে। বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের মনে রাখতে হবে, যে জাতি মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করে একে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের সাহিত্যও স্বাধীন। সে সাহিত্য মূল্যায়ণপ্রশ্নে কারো মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

শামসুর রাহমান না আল মাহমুদ- কে বড় কবি এ নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক আছে- এ ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,  কে বড় কে ছোট শিল্প সাহিত্যে এ ধরনের প্রশ্ন বোকামি বলে মনে করি। তবে আমার ব্যাক্তিগত মত বলতে পারি, জীবনান্দ দাশের পর তাকে স্থান দিই।

‘আল মাহমুদ জীবনের খুব গভীরে যান। জীবনের শেকড় থেকে তিনি কাব্যমসলা সংগ্রহ করেন। তাঁর কবিতায় হিন্দু-মুসলমান এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা দেখতে পাই। তিনি প্রাচ্যীয় মিথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসাম্প্রদায়িক ও উদার। এ গুণ তাঁর কবিতাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। আজকাল তাঁকে বদনাম করা হয়, তিনি খুব ধার্মিক হয়েছেন ইত্যাদি। তিনি হজ্জ্ব করেছেন কিনা, ধার্মিক হয়েছেন কিনা-সাহিত্য বিচারে আমাদের জানার প্রয়োজন নেই। তাহলে তো বাংলা সাহিত্যের বহু রথী-মহারথীকে নস্যাৎ করে দিতে হয়।

পূর্ববর্তি সংবাদধর্ম প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানাল জাতীয় ইমাম সমাজ
পরবর্তি সংবাদকসবার ট্রেন দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করলেন আল্লামা বাবুনগরী