মুখমন্ডলের পর্দা সম্পর্কে সহজ কয়েকটি কথা

মাহমুদা বিনতে কুতুবুদ্দীন ।।

আমাদের মা-বোনদের কেউ কেউ শুধু বোরকার নীচের অংশটি পরে মাথায় স্কার্ফ বা ওড়না ব্যবহার করেন।  মুখমন্ডল ঢেকে রাখাকে জরুরি মনে করেন না।  এটা ভুল। মুখমন্ডল হচ্ছে দেহের সুন্দরতম অঙ্গ। এটিই যদি পর পুরুষের সামনে আবৃত রাখা না হয় তাহলে পর্দার উদ্দেশ্য কীভাবে পূরণ হবে? এই ভুল ধারণার বিস্তারের পিছনে প্রধানত দায়ী কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রচার-মাধ্যম।

মুখমন্ডলের পর্দা সম্পর্কে গবেষক আলেমগণ বিশদ আলোচনা করেছেন। এখানে সহজ ভাষায় কয়েকটি কথা আরজ করছি।

ক) সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন-

হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, তোমার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের চাদরের একাংশ নিজেদের (মুখের) উপর নামিয়ে দেয়।-সূরা আহযাব : ৫৯

এ আয়াতের অর্থ আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. ও মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন রা., আবীদা সালমানী রাহ. দের মতে চোখ ব্যতীত পুরো চেহারা ঢেকে রাখা।

ইমাম আবু বকর রাযী আলজাসসাস রাহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন- এই আয়াত থেকে প্রমাণ হয়, বাইরে বের  হওয়ার সময় পর পুরুষের দৃষ্টি থেকে নারীর মুখমন্ডল আবৃত রাখা এবং পর্দানশীন পবিত্র নারীর বেশ গ্রহণ করা অপরিহার্য। যাতে দুষ্ট লোকেরা তাদের ব্যাপারে উৎসাহী না হয়।-আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/৩৭২ আরো দেখুন : আলকাশশাফ, যামাখশারী ৩/৩৭৪; তাফসীরে বায়যাবী ২/২৮০; তাফসীরে জালালাইন ৫৬০; তাফসীরে গারাইবুল কুরআন ওয়া রাগাইবুল ফুরকান ৫/৪৭৬; আযওয়াউল বয়ান, মুহাম্মাদ আলআমীন শানকীতী ৬/৫৮৬

২. হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইহরামের হালতে মেয়েরা যেন নেকাব ও দস্তানা ব্যবহার না করে।’-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৮৩৮

এ থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরামের যুগে মেয়েরা তাদের হাত ও মুখ আবৃত রাখতেন। এ কারণে ইহরামের সময় নেকাব ও দস্তানা না পরার আদেশ করতে হয়েছে।

৩. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. তাঁর হজ্বের বিবরণে বলেছেন, সফরের হালতে ইহরামের কারণে তারা নেকাব খোলা রাখতেন, কিন্তু যখন পুরুষরা নিকট দিয়ে অতিক্রম করত তখন তারা মুখমন্ডল আবৃত করে ফেলতেন। তারা চলে যাওয়ার পর নেকাব তুলে ফেলতেন।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ১৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ১৭৫৭

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন-সঠিকতর সিদ্ধান্ত এই যে, নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে দুই হাত, দুই পা ও মুখমন্ডল খোলা রাখার অবকাশ নেই।-মাজমূআতুল ফাতাওয়া ২২/১১৪

এসব বিবরণ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, পর পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুখমন্ডল আবৃত রাখতে হবে। ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেন, নারী নামায আদায়ের সময় দুই হাত ও মুখমন্ডল খোলা রাখতে পারেন, কিন্তু এভাবে বাজারে ও লোকের সমাগমস্থলে যাওয়ার অবকাশ নেই।-ই’লামুল মুয়াক্কিয়ীন ২/৪৭

বর্তমান সময়ের আরব শায়খদের মাঝে শায়খ ইবনে বায রাহ., শায়খ উছাইমীন ও শায়খ ইবনে জিবরীনও একই ফতোয়া দিয়েছেন। দেখুন : রিসালাতুন ফিলহিজাবি ওয়াসসুফূর, পৃ.১৯; ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম পৃ. ১১৬৯

বোরকা যেহেতু বাইরে বের হওয়ার সময়ই পরা হয় তাই বোরকা এমনভাবে পরা চাই যা দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত থাকে।

সারকথা এই যে, আমরা যারা আল্লাহর বিধান পালনের জন্য পর্দা করি তাদেরকে অবশ্যই পূর্ণ পর্দা করতে হবে।

হিজাব-নিকাবের যে বিধান কুরআন-সুন্নাহয় আছে তা সমর্পিত চিত্তে মেনে চলতে হবে। এক্ষেত্রে নিজস্ব খেয়ালখুশির কোনো সুযোগ নেই।

সবশেষে এ পর্দার বিষয়ে আমাদের পূর্বসূরীদের একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে আলোচনা সমাপ্ত করব।

উম্মে খাল্লাদ নাম্নী একজন সাহাবিয়ার পুত্র জিহাদে গিয়ে শহীদ হলেন। তার সংবাদ জানার জন্য শহীদ জননী আল্লাহর রাসূলের দরবারে হাজির হলেন। বলাবাহুল্য, মায়ের জন্য

সন্তানের মৃত্যুর চেয়ে কঠিন বিষয় আর কিছু নেই। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন, এই কঠিন অবস্থায়ও তিনি পর্দার বিষয়ে পূর্ণ সচেতন। পরপুরুষের সামনে নেকাব দ্বারা মুখমন্ডল আবৃত রাখতে ভুলেননি। জনৈক সাহাবী বিস্ময় প্রকাশ করলে ঐ সাহাবিয়া জবাব দিলেন, আমি আমার পুত্র হারিয়েছি, তবে আমার লজ্জা হারাইনি।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৪৮০

আল্লাহ রাববুল আলামীন আমাদের সকলকে লজ্জা হারানোর বিপদ থেকে রক্ষা করুন আমীন।

পূর্ববর্তি সংবাদ‘আযাদি’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে নববর্ষ বরণ দিল্লীবাসীর
পরবর্তি সংবাদবছরের প্রথম দিনেই রক্তাক্ত কাশ্মীর, স্বাধীনতাকামীদের গুলিতে ২ ভারতীয় সেনা নিহত