‘তুরাসে ইসলামী’ ও ‘তাহকীকুত তুরাস’ বলতে বোঝায় মূলত আকাবির-আসলাফের মুদ্রিত-অমুদ্রিত বিভিন্ন কিতাবের পাণ্ডুলিপি কিংবা তার অনুলিপি উদ্ধার, তাহকীক-সম্পাদনার পর সেগুলো যথার্থ যত্নে প্রকাশের মহা কর্মযজ্ঞকে। এবিষয়ে মাসিক আলকাউসারের ২০০৭ সালের আগস্ট সংখ্যায় মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেবের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিলো। মাসিক আলকাউসারের পক্ষে সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছিলেন শরীফ মুহাম্মদ। কিছু দিন আগে লেখাটি টাইপ করে অনলাইনে প্রকাশ করেছেন মুহাম্মদ হোসাইন।
আল কাউসার: তুরাসে ইসলামী ও তুরাস বিষয়টি কী?
মাওলানা আবদুল মালেক: সালাফ বা ইসলামী মনীষীগণের রেখে যাওয়া ইলমী মীরাস বা উত্তরাধীকার, যা তারা কিতাবী আকৃতিতে রেখে গিয়েছেন। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে যে উলূমে নববী বা নববী ইলম সাহাবায়ে কেরাম অর্জন করেছেন এবং তাঁরা ও পরবর্তী সালাফগণ এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যা বলেছেন ও লিখেছেন তা বিভিন্ন আঙ্গিকে সংরক্ষিত রয়েছে সেসব আঙ্গিকের অন্যতম হল কিতাবী আকৃতি। প্রথমদিকে এগুলো ছিল মাখতুতাত বা পাণ্ডুলিপি আকৃতিতে, পরবর্তীতে মুদ্রিত (মাতবুআত) গ্রন্থে রূপান্তর করার কাজ শুরু হয়। এই প্রক্রিয়াটিতে সতর্কতা, যাচাই-বাছাই এবং পর্যাপ্ত তাহকীকের ব্যবস্থা করা হত। একারণে এক পর্যায়ে এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয় বা শাস্ত্রে পরিণত হয়ে গিয়েছে। এভাবেই ‘তুরাস’ নিয়ে তাহকীক করার একটি ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে যায়। ‘তুরাসে ইসলামী’ নিয়ে তাহকীক নীতি কী হবে? কোন একটি পাণ্ডুলিপি বা গ্রন্থকে কখন তুরাসের অর্ন্তভূক্ত করা হবে? তুরাসের মাপকাঠি কী? পান্ডুলিপি পর্যায়ের কোনো তুরাস মুদ্রণে নিতে হলে কী কী নীতি বা উসূল অনুসরণ করতে হবে? এই তুরাসটি যেই লেখকের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, আসলেও সেটি তার কিনা? এই কপিটি বাস্তবেই লেখকের মূল কপি বা তার অনুলিপি কিনা? অনুলিপি হলে তার নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে অনেক স্বতন্ত্র কিতাবাদী রচিত হয়েছে। তুরাসে ইসলামীর তাহকীক ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে ওই কিতাবগুলোতে বর্ণিত মূলনীতি অনুসরণ করতে হয়।
আল কাউসার: প্রাচীন কোনো পান্ডুলিপি পর্যায়ের তুরাস কি এখন যে কেউ মুদ্রিতরূপে প্রকাশ করতে পারেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: ইলমী গভীরতার পাশাপাশি তুরাসের বিষয় ও মূলনীতি জানা থাকা, দীর্ঘ অধ্যবসায়, যাচাই-বাছাই ও গবেষণা করা এবং আমানতদারী বজায় রেখে এ কাজ করার চেষ্টা যারা করেন তারা সফল হন। যেকোনো প্রকাশক ইচ্ছা করলেই এটা করতে পারেন না। করলে তাতে প্রচুর ভুল-ত্রুটি ও অসামঞ্জস্য থেকে যায়। মূলত: ইলমী গভীরতা ও আমানতদারী ছাড়া একাজ হুট করে করা উচিৎ নয়।
আল কাউসার: আমরা শুনেছি প্রাচ্যবিদদের হাতে ইসলামী উলূমের বহু পান্ডুলিপি মুদ্রিত হয়ে গ্রন্থে রূপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কতটুকু?
মাওলানা আবদুল মালেক: প্রাচ্যবিদরা ইসলামী তুরাস নিয়ে কিছু কাজ করেছেন। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারণা যে, তুরাসে ইসলামী নিয়ে তাহকীকের সূচনা তাদের হাতে হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাদের দেখাদেখি মুসলিম গবেষকরাও সেপথে গিয়েছেন। মিশরের বিখ্যাত গবেষক আলেম আহমদ শাকের এরকম ভুল ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন। ইয়াহইয়া ইবনে আদম (২০৩ হি.) সংকলিত ‘কিতাবুল খারাজ’- এর ভূমিকায় আহমদ শাকের প্রাচ্যবিদ বা মুস্তাশরিকদেরকে ‘তাহকীকে তুরাসের সূচনাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তীতে ‘জামে তিরমিযী’ তাহকীক করে প্রকাশ করার সময় তুরাসের তাহকীক বিষয়ে ঐতিহাসিক বাস্তবতা তার কাছে উদ্ভাসিত হলে তিনি তার পূর্ব মত থেকে ফিরে আসেন। আসলে তাহকীকের তুরাসের কাজ মুসলিম মনীষীগণই আগে শুরু করেছেন। আর এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। কারণ, তুরাস তো মুসলমানদের। সুতরাং এর প্রতি তাদের আগ্রহ অমুসলিমদের চেয়ে বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাহকীকুত তুরাসের বেশ কয়েকটি দিক রয়েছে-
১. তাওসীকুন নস ও তাসহীহুহু (ভাষ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই ও সম্পাদনা)
২. যাবতুন নস ( বিশুদ্ধ পাঠের বিবরণ)
৩. আল মুরাজাআ ওয়াততাখরীজ (উৎসের বিবরণ)
৪. তালীক (টীকা লিখন)
৫. তারকীম (যতি চিহ্নের ব্যবহার)
৬. ফাহরাসা (নির্ঘন্টায়ন/ইনডেক্সিং)
এসব কটিরই সূচনা হয় মুসলিম মনীষীদের হাতে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হল প্রথম চারটি, যেগুলোতে প্রাচ্যবিদদের কোনো স্বাতন্ত্র্যই নেই। তাদের কাছে ভালোকিছু যদি থাকে তবে তা মুসলিম মনীষীদের কাছ থেকেই ধার করে নেওয়া।
থাকলো তারকীম ও ফাহরাসার কথা। এগুলোরও সূচনা হয় মুসলমানদেরই হাতে। তারকীমের মূল ভিত্তি হল ইলমূল আওকাফ’ এবং ‘ইলমূল ফাওয়াসেল।’ যা ইস্তেশরাক অস্তিত্বে আসার হাজার বছরেরও বেশি আগে মুসলিম মনীষীদের হাতেই সূচিত হয়। এমনিভাবে ফাহরাসার ভিত্তি হল আইয়াম্মায়ে হাদীসের আসমায়ে রিজালের ওইসব গ্রন্থের উপর যেগুলো আরবী বর্ণমালার বর্ণনাক্রমানুসারে বিন্যস্ত। আর এধরনের গ্রন্থগুলোর সংকলন শুরু হয়েছে হিজরী তৃতীয় শতাব্দী বা তারও কিছু আগ থেকে। তুরাসে ইসলামী নিয়ে তাহকীক করার মূলনীতিগুলো আয়ত্ব করে নেওয়ার কারণে তারা এবিষয়ে কিছু কিছু কাজ করতে পেরেছে।
তুরাসের তাহকীক যে প্রাচ্যবিদদের বহু আগে মুহাদ্দিসীনদের হাতে হয়েছে এ তথ্য ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনাটি আহমদ শাকের যে ভূমিকাটিতে লিখেছেন সেই ভূমিকাটির তাহকীক করেছেন শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.
আল কাউসার: তুরাসের প্রয়োজনীয়তা ইলমী ক্ষেত্রে কতটুকু?
মাওলানা আবদুল মালেক: এর প্রয়োজনীয়তা তো প্রশ্নাতীত। দ্বীনের উৎস কুরআন ও সুন্নাহকে আল্লাহ তা’আলা যেমন হেফাযত করেছেন তেমনি এ দু’উৎসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে উলামায়ে সালাফ যে মহান খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন সেগুলোও আল্লাহ তা’আলা হেফাজত করেছেন। দ্বীনের বাহক বা মাধ্যম দু’ধরনের। ১. রিজালে দ্বীন-ইসলামী মনীষীগণ ২. কুতুবে দ্বীন- দ্বীনী বিষয়ে লিখিত কিতাবসমূহ। সুতরাং এটা পরিষ্কার তুরাসে ইসলামী যাকে বলা হয় তার প্রয়োজনীয়তা এবং ইলমে দ্বীনের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা প্রায় সমান।
আল কাউসার: দ্বীনের বহু প্রয়োজনীয় ও প্রামাণ্যগ্রন্থ মুদ্রিত অবস্থায় বিদ্যমান। এ অবস্থায় পূর্বযুগে পান্ডুলিপি (মাখতুতাত) নিয়ে তাহকীক করা ও মুদ্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
মাওলানা আবদুল মালেক: পাণ্ডুলিপি নিয়ে তাহকীক ও গবেষণার এ প্রক্রিয়াতেই বর্তমানে প্রাপ্ত কিতাবগুলো আমরা পেয়েছি। এগুলোও সেভাবেই এসেছে। এখনকার কিতাবগুলো অবশ্যই প্রয়োজন পূরণ করছে। কিন্তু এগুলোকে এমনভাবে যথেষ্ট মনে করার প্রয়োজন নেই যে, আমাদের সামনে পূর্বযুগের বহু নির্ভরযোগ্য কিতাবের পান্ডুলিপি উদ্ধার ও তা নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকলেও তা করা যাবেনা। এছাড়া তুরাস নিয়ে তাহকীক ও গবেষণার যে বিষয়টি রয়েছে তা মুদ্রিত কিতাবাদী নিয়েও তো চলছে। তাহকীকে তুরাস মানেই কেবল অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা নয়। মুদ্রিত-অমুদ্রিত উভয় পর্যায়ের তুরাস নিয়েই তাহকীক চলে এবং এর প্রয়োজনও রয়েছে এবং এসব তাহকীকের দ্বারা বহু ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত হয়। বহু ফায়দা হয়।
আল কাউসার: তাহকীকুত তুরাসের বিষয়টি তো সম্ভবত একারণেও উদ্ভাবিত হয়েছে যে, আগের যুগের লেখকগণ তাদের হাতে কিতাব মুদ্রণ করে যেতে পারেন নি। পরবর্তীতে একশ-দু’শ বা আরো শত-শত বছর পরে সেই পান্ডুলিপি কেউ উদ্ধার করে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তখন প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও তাহকীকের কাজ করেছেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: তাহকীকুত তুরাসের এ কাজ লেখক নিজে তার পান্ডুলিপি প্রকাশ করে গেলেও চলেছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেমন তাহের আল জাযায়েরী (মৃত্যু ১৩৩৮ হিজরী) ১৩২৮ হিজরীতে তার লিখিত ‘তাওজীহুন নযর’ কিতাবটি ছেপেছিলেন। পরবর্তীতে ১৪১৬ হিজরীতে সেই কিতাবটিকেই তাহকীক করে দু’খন্ডে প্রকাশ করেছেন শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.। সে কাজে শায়খের হেদায়াত ও নির্দেশে কিছু কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রায় শতাধিক ভুল তাতে সংশোধিত হয়েছে এবং বহু জায়গায় হাশিয়া ও টিকা-টিপ্পনী যুক্ত করা হয়েছে। তাই লেখক নিজে প্রকাশ করে যেতে পারেন নি বলেই তাহকীকের এ ধারার উদ্ভব এমন নয়।বরং সত্য হচ্ছে এই যে, ইসলামী উলূমের সংকলন-রচনাকর্ম বা তাসনীফ যেদিন থেকে শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই তাহকীক বা গবেষণা শুরু হয়েছে। আর এ তাহকীক মুদ্রিত কিতাব ও অমুদ্রিত পান্ডুলিপি উভয় ক্ষেত্রেই চলেছে। আর এটা জরুরীও ছিল।
আল কাউসার: তাহকীকুত তুরাস নিয়ে ধারণা ও অবগতি আপনি কিভাবে পেলেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: করাচির ইউসুফ বিন্নেীরি টাউনে উলূমুল হাদীস নিয়ে তাখাসসুসে অধ্যয়নকালে এ বিষয়ে ধারণার সূচনা। আমাদের পাঠ্য একটি কিতাব ছিল হযরত মাওলানা আবদুল হাই লখনৌভির রহ. লিখিত। সে কিতাবে লেখা দেখলাম- হাক্কাকাহু, খাররাজা নূসূসাহু, ওয়া আল্লাকা আলাইহি’ এখানে শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ.-এর নাম। কিতাব লিখেছেন মাওলানা লখনৌভি। আর তাতে তাহকীক, তাখরীজ ও তা’লীক করেছেন শায়খ আবু গুদ্দাহ। বিষয়টি কী? প্রথমে কৌতূহলী হলাম। হযরত মাওলানা আবদুর রশীদ নুমানী রহ.- এর তত্ত্বাবধানে কাজ করা ও এবিষয়ে কিতাবাদী পাঠ করার সুযোগ হয়েছে। এরপর যখন শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. -এর তত্ত্বাবধানে রিয়াদে কাজ করার সুযোগ হয়েছে সেখানে এবিষয়ে শায়খ নছর আল হোরীনীর লেখা ‘আলমাতালিউন নাছরিয়্যা লিল মাতাবিই’ল মিসরিয়্যা’ কিতাবটি দেখার সুযোগ হয়েছে। একাজে শায়খ আবু গুদ্দাহর পূর্ববর্তী ছিলেন শায়খ আবদুস সালাম হারুন রহ. । এবিষয়ে তার লেখা দু’টি কিতাবও রয়েছে।
১. তাহকীকুননুসূস ও নাশরিহা ২. কুতুফুন আদাবিয়্যা ফী তাহকীকিততুরাস।
আল কাউসার: পান্ডুলিপি আকারে তুরাসে ইসলামী পৃথিবীর কোথায় কোথায় বিদ্যমান বলে আপনি জানেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: হিজায, মিশর, সিরিয়া, ইরাক, তুর্কিস্থান ও হিন্দুস্থানের কোনো কোনো কুতুবখানায় মাখতুতাতের যখীরা বা পান্ডুলিপির ভান্ডার বিদ্যমান। তুর্কিস্থানে পান্ডুলিপি আছে বেশি। ইসলামী দারুল খেলাফত বাগদাদ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে যাওয়ায় ওখানে বেশি পান্ডুলিপি জমা হয়েছে। এছাড়াও মাগরিবের দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো ও স্পেনেও বহু পান্ডুলিপি বিদ্যমান। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের প্রচুর পান্ডুলিপি রয়েছে। কিন্তু তাও মুসলিম দেশ থেকে নেওয়া। তাই কেন্দ্রীয় অবস্থান সেখানকার নেই।
এসব পান্ডুলিপির মধ্যে রয়েছে হাদীস, ফিকহ, সীরাত ও আদব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপি।
আল কাউসার: তাহকীকে তুরাস নিয়ে কাজ কাজ আপনি কোথায় কী কী করেছেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: হযরত শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. এ কাজ করেছেন বহু বছর যাবৎ। আড়াই বছর তার খেদমতে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। হযরত শায়খের হেদায়াত ও নেগরানিতে ২৩ টির মতো কিতাবের তাহকীকে আমার শামিল হওয়ার তাওফীক হয়েছে। যেমন- যাফারুল আমানী, আল ইনতিকা, ছালাছু রাসায়েল, আল ইবনু মাজাহ ওয়া কিতাবুহুম সুনান ইত্যাদি।
আল কাউসার: তুরাস নিয়ে তাহকীক বা গবেষণার কাজগুলো করার সাধারণ প্রক্রিয়া কী?
মাওলানা আবদুল মালেক: নির্ধারিত উসূল ও নীতিমালা রয়েছে। কিছু কিতাবের নাম ইতোমধ্যে বলেছি সেগুলো পড়তে হবে। তাসহীহুল কুতুব-এর হাশিয়ায় আরো ১৭ টি কিতাবের নাম রয়েছে। সেগুলোও দেখা যেতে পারে। আসলে এ বিষয়ে নিয়মনীতি জানাই বড় কথা নয়, নিয়ম তো বহু কিতাবেই পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে মূলত: গভীর ইলম ও প্রজ্ঞা থাকতে হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছেন এমন কোনো প্রাজ্ঞ শায়খের অধীনে ও সংশ্রবে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতাও লাগবে।
আল কাউসার: পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য কে কে এখন এ কাজে যুক্ত আছেন?
মাওলানা আবদুল মালেক: মদীনা মুনাওওয়ারায় শায়খ মাহাম্মাদ আওয়ামাহ এবং বৈরুতের মুয়াসসাতুর রিসালায় কাজ করছেন শায়খ শুয়াইব আরনাউত। ( এখন ইন্তিকার করেছেন)
আল কাউসার: এধরনের তুরাস যা পান্ডুলিপি পর্যায়ে রয়েছে, মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়া ঢাকায় কিছু কি আনতে পেরেছেন? এবং কোনো কোনোটার কাজ কি চলছে?
মাওলানা আবদুল মালেক: ইতোমধ্যে এখানে বেশ কিছু পান্ডুলিপির সিডি, ফটো এবং কিছু মূল পান্ডুলিপিও সংগৃহীত হয়েছে। আদদুররূল মুখতার-এর বিখ্যাত অথচ অমুদ্রিত একটি ষোল খন্ডের ব্যাখ্যাগ্রন্থের অনুলিপি (মূল পান্ডুলিপি থেকে) ও আমাদের হাতে আছে। আরো কিছু সংগ্রহ হচ্ছে ও হবে ইনশাআল্লাহ। এক্ষেত্রে তাহকীকের কাজ করার যে এরাদা আমাদের রয়েছে, তার জন্য বড় পরিসরের জায়গা, বড় ও স্বতন্ত্র কুতুবখানা দরকার। যেটা আমাদের এখানে আপাতত সংকুলানযোগ্য নয় এবং স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনাও নেই। যে বিষয়ের কিতাব বা পান্ডুলিপির তাহকীক চলবে, সেবিষয় ও তার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর শত শত কিতাব সংগ্রহ করে কাজে বসতে হবে। একাজের উপযোগী লোক দরকার। কারণ এটা এমন কাজ যে, আদদুররূল মুখতারের যে ব্যাখ্যাগ্রন্থের কথা উল্লেখিত হয়েছে এধরণের একেকটি কিতাবের যথাযথ তাহকীকের কাজ যোগ্যতাসম্পন্ন দশ-পনের জনের একটি পরিষদকে কাজ করতে হবে চার-পাঁচ বছর। ইতোমধ্যে মারকাযের শিক্ষা সমাপনকারী অনেকেই একাজের উপযুক্ত রয়েছেন। কিন্তু গভীর অধ্যবসায়পূর্ণ এ কাজে যাদের যুক্ত করতে হবে তাদেরও তো ফারেগ করে নেওয়ার মতো ব্যবস্থাপনা দরকার। আসলে আমাদের এখানকার এবিষয়ক কাজ এগিয়ে নিতে আল্লাহ তা’আলার খাস ফযল ও করম দরকার। এ ধরনের কাজের প্রতি উৎসাহী ও আগ্রহী সবার তাই দুআও চাই।
আল কাউসার: হালাকুখার আক্রমণে বাগদাদে বহু পান্ডুলিপি ধ্বংস হয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে।
মাওলানা আবদুল মালেক: হ্যাঁ, সে সময় বাগদাদে ও মা ওয়ারাউন্নাহার অঞ্চলে বহু কিতাব, বহু পান্ডুলিপি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলোর অনেক বিকল্প এখনো রয়ে গেছে। সেগুলোও থাকলে ভালো হত। কিন্তু না থাকায় ইসলামী উলূম ও প্রজ্ঞার জগতে মৌলিক কোনো দুরূহতা বা জটিলতা নেই। যেসব পান্ডুলিপি এখনো দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলো উদ্ধার ও যথাযথ তাহকীকের মাধ্যমে মুদ্রিত হলে ইলমী জগতের আরো অনেক ফায়দা হবে। আল্লাহ তা’আলা সহজ করুন, কবুল করুন।
















