সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ।।
পৃথিবী বাহ্যিকভাবে বস্তুর অনুগত। উপায়-উপকরণ তার মধ্যে কাজ করতে থাকে। এটা মূলত সৃষ্টিজগতের সেই শক্তি, যা তার ব্যবস্থা ও পরিচালনারীতির অধীন ও অন্তর্ভুক্ত। যে শক্তি বা কার্যকারিতা প্রতিটি বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। জাগতিক এ সব বস্তু কখনো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও গুণকে ছেড়ে দেয়। কখনো নিজস্ব উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনাকে ভুলে যায়।
একদল লোক আছে, যাদের দৃষ্টি বস্তু ও উপায়-উপকরণের বাইরে যে কুদরতি শক্তি রয়েছে, সে দিকে যায় না। বরং তাদের ভাবনা-চিন্তা বস্তুবাদ ও উপকরণের মধ্যেই আটকে থাকে। তারা মনে করে, ফলাফল সব সময় জাগতিক বস্তু ও উপকরণ থেকেই আস। বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ছাড়া নতিজা ও ফলাফলের কল্পনা তাদের কাছে অসম্ভব। তাদের দৃষ্টিতে এমন কোনো শক্তি নেই, যা উপায়-উপকরণ ও ফলাফলের মাঝে বাধা হতে পারে। এবং নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় এর মধ্যে কোনো পরিবর্তন সাধন করতে পারে। কিংবা বস্তু ও উপায়-উপকরণ ছাড়া কোনো নতিজা ও ফলাফল অস্তিত্বে আনতে ও প্রকাশ করতে পারে!
এক কথায় ওই সব লোকের ভাবনা হলো, বস্তু ও উপকরণের মাধ্যম গ্রহণ করা ছাড়া কোনো কিছু হয় না, হতে পারে না।
এমন চিন্তার ফলাফল দাঁড়িয়েছে, এ শ্রেণির লোকেরা জাগতিক বস্তু ও উপায়-উপকরণের মধ্যেই আটকে রয়েছে। এর মধ্যেই নিজেদের স্থির ও দৃঢ় করে নিয়েছে এবং এগুলোর মধ্যেই মজে ও ডুবে আছে। তারা বস্তু ও উপায়-উপকরণের সঙ্গে মাবুদ ও উপাস্যের মতো আকিদা ও আচরণ শুরু করে দিয়েছে। বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুন এবং উপায় ও উপকরণের বাইরে অন্য সব বিষয় ও জগতকে অস্বীকার করছে। তারা সেই শক্তি ও সত্তাকেও অস্বীকার করছে, যিনি এ বিশাল সৃষ্টিজগতের একক মালিক ও বিচারক। যাঁর আদেশ সারা দুনিয়ায় কার্যকর হয়। যাঁর ইচ্ছাই কেবল সমগ্র দুনিয়ায় বাস্তবায়িত ও প্রতিফলিত হয়।
তারা মৃত্যুপরবর্তী জীবন এবং হাশর-নাশরকেও অস্বীকার করছে। তারা তাদের সমস্ত যোগ্যতা ও সক্ষমতাকে বস্তুর আবিষ্কার ও অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, ব্যাপক ও সহজকরণের মধ্যে ব্যয় করছে। এগুলোকে নিয়েই ভাবনা-চিন্তা, যাচাই-বাছাই করার মধ্যে লেগে ও ডুবে আছে। ফলে বস্তুর মহত্ব ও মহব্বত তাদের রগ-রেশায় মিশে একাকার হয়ে গেছে। এবং তারা সেগুলোকে তাদের মাবুদ ও উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে।
তারা জাগতিক বস্তু ও উপায়-উপকরণ ছাড়া অন্য সবকিছুকে অস্বীকার করছে। যখন মাকসাদ ও লক্ষ্যের পূর্ণতা তারা দেখতে পেয়েছে এবং কিছু জিনিসকে নিজেদের ইচ্ছার অনুগামী করে নিতে পেরেছে এবং সেগুলোকে নিজেদের কর্তৃত্বে ও অধীনে নিয়ে এসেছে, তখন তারা কখনো অবস্থার ভাষায়; আবার কখনো শব্দের ভাষায় নিজেদের খোদায়ি ও প্রভুত্বের এলান করতে শুরু করেছে।
তারা তাদের মতো মানুষকে নিজেদের গোলাম ও দাস হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের জানমাল, ইজ্জত-সম্মানকে খেল-তামাশার বস্তু বানিয়ে নিয়েছে। তাদের সঙ্গে যেমন খুশি আচরণ করছে। এবং নিজেদের উদ্দেশ্য ও বাসনা, কুমতলব ও খাহেশাত এবং নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিংবা জাতিগত ঐতিহ্য বৃদ্ধির নামে, জন্মভূমির সম্মান বৃদ্ধির নামে, দল ও রাজনীতির নামে মযলুম মানুষের সঙ্গে যেমন খুশি তেমন আচরণ করে যাচ্ছে।
এর বিপরীতে দ্বিতীয় আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। যা প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ উল্টো। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির একীন ও বিশ্বাস হলো- দুনিয়ার সমস্ত উপায়-উপকরণের কার্যকারিতার উৎস ও ভিত্তি হলো অদৃশ্য ও অপ্রকাশ্য শক্তি মহান আল্লাহ। যাঁর কুদরতি হাতে রয়েছে এ সব জিনিসের কার্যকারিতা এবং বস্তুর যাবতীয় বৈশিষ্ট্যতা ও সক্ষমতা। তাঁর হাতেই রয়েছে সব বিষয় ও বস্তুর লাগাম। সবকিছুর তত্ত্বাবধান তিনিই করনে। যেমনিভাবে নতিজা ও ফলাফল বস্তুর অধীন ও অনুগত, তেমনিভাবে সব বস্তু ও উপকরণ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও আদেশের বাধ্য ও অনুগত এবং চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রিত।
আল্লাহ পাকের ইচ্ছার কারণইে অস্তিত্বহীন কোনো বস্তু অস্তিত্ব লাভ করে। তিনিই সেটিকে টিকিয়ে রাখেন। স্থায়িত্ব দেন। এবং যখন ইচ্ছা সেটিকে তার ফলাফল ও পরিণাম থেকে আলাদা করে দেন। কারণ বস্তু ও উপায়-উপকরণ এবং পরিণতি ও ফলাফল উভয়টি আল্লাহ পাকের ইচ্ছার অধীন। তিনিই সব বিষয়ের ফলাফল সংঘটক। উপায়-উপকরণ ও ফলাফলের সব ধারাবাহিকতা তাঁর মহান সত্তায় গিয়েই খতম ও সমাপ্ত হয়।
সমগ্র পৃথিবী সৃষ্টি করার এবং সমস্ত জিনিস অস্তিত্বে আনার পর দুনিয়া পরিচালনার লাগাম এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহ তায়ালার হাত থেকে ছোটে নি। এবং তাঁর নাগালের বাইরেও যায় নি। সৃষ্টিজগৎ তাঁর গোলামি ও বন্দিগি থেকে কখনো আযাদ বা মুক্ত হয়ে যায় নি। কোনো সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছার খেলাফ করবে না। করতে পারবেও না।
আসমান ও যমিনের কোনো সৃষ্টির আল্লাহ তায়ালাকে অপারগ করার ক্ষমতা নেই। তিনি তাঁর চূড়ান্ত হেকমত ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে বস্তু ও উপায়-উপকরণকে তার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে, ফলাফলকে তার উপায়ের সঙ্গে, সূচনাকে তার শেষের সঙ্গে অধীন করে দিয়েছেন। তিনিই জোড়াদানকারী। তিনিই বেজোড়কারী। তিনিই শুরু করেন। তিনিই শেষ করেন। তিনিই সব জিনিস অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্বে আনেন। এবং তাতে জীবন নামের পোশাক তিনিই পরিধান করান।
জগতের যে কোনো সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও মর্জির কথা কোরআন মাজিদ পরিষ্কার ভাষায় বলছে :
.إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
অর্থ : তাঁর ব্যাপার তো এই, কোনো কিছু সম্পর্কে তিনি যদি ‘হও’ বলতে চান, তখনই তা হয়ে যায়। (সূরা ইয়াসিন : ৮২)
ঈমানদাররা এ কথাটি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি ও বিশ্বাস করে নিয়েছেন, পৃথিবীতে যত যা কিছু আছে, যত বস্তু ও উপকরণ আছে, যত চেষ্টা ও সাধনা আছে, ব্যক্তি ও সমষ্টিগত কাজের ছোটবড় যত ফলাফল আছে, এ সব কিছুর মধ্যে বস্তুর বাহ্যিক ও স্বভাবগত ফলাফলের চেয়ে আসমানি ইশারা ও ইচ্ছাই চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়ে থাকে। ঈমান ও আমল, চেষ্টা ও সাধনা, আখলাক ও চরিত্র, ইবাদত ও আনুগত্য, আদল ও ইনসাফ, দয়া ও ভালোবাসা এমনিভাবে এর বিপরীত বিষয়গুলো ফেতনা-ফাসাদ, কুফুরি, নাফরমানি, যুলুমবাজি, নফসের তাবেদারি ও সীমালঙ্ঘনসহ যাবতীয় বিষয়ে যাহেরি ও বাহ্যিকতার বাইরে আসমানি ফয়সালা ও সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও কার্যকর হয়।
ঈমানদার ব্যক্তি যদি যাহেরি ও বাহ্যিক উপায়-উপকরণ না ছেড়ে বস্তুর ভালো দিকটা গ্রহণ করে তা হলে দুনিয়াবি আসবাব-উপকরণ তার সঙ্গে কল্যাণকামিতায় বাধ্য থাকবে। এবং জীবন প্রকৃত স্বাদ-মজা ও মিষ্টতাসহ তাকে সঙ্গ দেবে। আল্লাহ তায়ালা তার সব কাজ আসান ও সহজ করে দেবেন। কখনো বস্তুর প্রকৃতি ও ফলাফল মুমিনের অনুগামী ও অধীন করে দেবেন। তার জন্য সাধারণ নিয়মের বাইরে অলৌকিক ঘটনাও প্রকাশ করে দেখাবেন।
এর বিপরীতে যে ব্যক্তি শুধু বস্তু ও আসবাবের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, শুধু উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা-বিশ্বাস করবে এবং জীবনকে এই ভিত্তির ওপর কায়েম ও পরিচালিত করবে, তার সঙ্গে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ বিরুদ্ধাচারণ করবে। এগুলো পদে পদে তার বিরোধী হয়ে দাঁড়াবে। যে যোগ্যতা ও শক্তি সে অর্জন ও আয়ত্ত করেছিল, সেটাও তাকে ধোঁকা দেবে। ক্ষেত্র বিশেষ তাকে বোকা বানাবে। সে তার সারা জীবনে সব সময় শুধু বস্তু ও উপায়-উপকরণেরই মুহতাজ আর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে। সে বাঁচবে, কিন্তু আল্লাহ পাকের কুদরত ও নুসরত, শক্তি ও সাহায্য তার কামনার বিপরীত হবে। তার একমাত্র আশ্রয় ও অবলম্বন- বস্তু ও উপায়-উপকরণসমূহ তার চলার পথে কেবলই বাধা-বিঘ্নতা ও বিপদ সৃষ্টিকারী হবে। [মাআরেকায়ে ঈমান ও মা-দ্দিয়াত থেকে অনূদিত]
অনুবাদ : সাদ আবদুল্লাহ মামুন
















