ইসলাম টাইমস ডেস্ক: ‘ভারতের পক্ষ থেকে সম্প্রতি পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা হলেও তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নরেন্দ্র মোদিকে বিনয়ের সঙ্গে জানানো দরকার, রোহিঙ্গা সমস্যা যেমন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়, তেমনি ভারতের নাগরিকত্ব আইন এবং নাগরিকপঞ্জি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়’।
‘মিয়ানমারও প্রথমে দাবি করেছিল এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। গণহত্যার বিষয়টি তো তারা অস্বীকারই করেছিল। পরে বিশ্ব আদালতে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অং সান সু চিকে তাঁর সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের কথা স্বীকার করতে হয়েছিল। আর এই বর্বরতার মাসুল গুনতে হচ্ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশকে। আশ্রিত ১১ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা এখন দরিদ্র বাংলাদেশের কাঁধে’।
কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী ভারতের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে লেখা তার এক কলামে এসব কথা বলেন।
আবদুল গাফফার চৌধুরী লেখেন, ভারতের সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের ফলে কোণঠাসা বিজেপি সরকার এখন বলছে, তারা কারো নাগরিকত্ব হরণ করবে না। বিশেষ করে মুসলমান নাগরিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তাই যদি হবে, তাহলে তারা কী করে আইন করে যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কোনো হিন্দু ভারতে গিয়ে তাদের নাগরিকত্ব চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তা মঞ্জুর করা হবে। এটা একদিক থেকে বর্ণবৈষম্যমূলক আইন। অন্যদিকে সরাসরি পাকিস্তান ও বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে দেশ ত্যাগে উসকানি প্রদান। এটা কী করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয়?
তিনি আরও বলেন, ‘ভারত নাগরিকত্ব আইন বহাল হলে একমাত্র হিন্দু ছাড়া মুসলমান, খ্রিস্টান, দলিত সম্প্রদায় এবং উপজাতিসমূহের লোকের নাগরিকত্ব হারানোর ভয় আছে। আসামে আবার বাঙালি বিতাড়ন শুরু হতে পারে। দেখাদেখি মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডেও। প্রকাশ্যে গোমাংস খেলে কিংবা গোমাংস বিক্রি করলে বজরং গোষ্ঠীর সদস্যরা ভিন্নধর্মের মানুষকে হত্যা করবে। এরই মধ্যে তা করেছে। রাস্তায় চলতে গিয়ে কোনো মুসলমান নাগরিক জয়রাম জয় সীতারাম ধ্বনি উচ্চারণ না করলে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীরা তাঁকে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করবে। এর মধ্যেই কয়েক স্থানে করেছে। তার কোনো প্রতীকার নেই। কোনো কোনো রাজ্যে মসজিদ অতীতে মন্দির ছিল দাবি করে তা ভেঙে মন্দির করা হয়েছে। গেরুয়াধারী হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচারে সারা ভারত আজ জর্জরিত’।
‘বিজেপি যে আজ সারা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় তা স্পষ্ট। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুসলমান নামে যেসব শহর, বন্দর, রাস্তাঘাট আছে, যেমন উরুঙ্গাবাদ, আহমেদাবাদ, আফজালনগর প্রভৃতির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঠ্য ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। মুসলমান শাসকদের নাম বাদ দিয়ে কল্পিত হিন্দু বীরদের গালগল্প ইতিহাস বলে সাজানো হচ্ছে। ডাকটিকিটে নেহরু-গান্ধীর ছবি বিলুপ্ত হচ্ছে। উঠে আসছে শিবাজি, সাভারকরের ছবি।
‘ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং গুজরাট দাঙ্গার পর এরশাদের আমলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরীহ হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর চরম নির্যাতন হয়েছিল। সরকারকে তার ক্ষতিপূরণ করতে হয়েছিল। এবার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও নাগরিক গণনার ফলে আসামে ১৯ লাখ নর-নারী ভারতের নাগরিক তালিকার বাইরে থাকে। এরা ঘরছাড়া হলে বাংলাদেশেই আশ্রয় গ্রহণ করতে চাইবে। ১১ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর আরো কয়েক লাখ ভারতীয় মুসলমান বাংলাদেশে ঢুকলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা কী দাঁড়াবে? অবিভক্ত আসামে সাদুল্লা বরদৌলাই গভর্নমেন্টের আমলে ‘বঙ্গাল খেদাও’ আন্দোলনের সময় অনেকেই বাংলাদেশে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে শুধু আসামে নয়, সারা ভারতেই যদি সংখ্যালঘু—বিশেষ করে ‘মুসলমান খেদাও’ নীতি অনুসৃত হয়, তাহলে তারা কি পাকিস্তান ও বাংলাদেশমুখী হবে না? যদি হয়, তাহলে বিজেপি সরকার কী করে দাবি করে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়?
















