মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ।।
আজকের এ আয়োজনটা মূলত ছাত্রদেরকে লক্ষ করে। এ ছাত্ররা জীবনের একটা স্তর ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছে। আমাদের দেশের হিসেবে মাধ্যমিক। পরিক্ষাটার নামও এসএসসি- সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট। অনেক দেশে অবশ্য হায়ার সেকেন্ডারিসহ সেকেন্ডারি ধরা হয়। আমরা যেটাকে বলি, ইন্টারমিডিয়েট বা উচ্চমাধ্যমিক। দুটো স্তরই থাকে। সেকেন্ডারি স্তরের পরে ইউনিভার্সিটি স্তরটা শুরু হয়। এমনিভাবে মানুষের বয়সের একটা স্তর থাকে, শিশু বয়স; একেবারে কোলে কোলে বড় হয়। এরপরে কৈশর; দৌড়ঝাঁপ দিয়ে, লাফ-ফাল দিয়ে বড় হয়। আরেকটা বয়স থাকে তখন চলার বয়স শুরু হয়। ওই স্তরটার সমাপ্তি ঘটে মাধ্যমিক স্তরে এসে।
কাজেই আমরা শুধু একটা পরীক্ষাই দেইনি বরং আমরা জীবনের একটা দিকের পরিপূর্ণতায় পৌঁছেছি। গাছে যেমন ফল ধরলে কিছু ঝরে ঝরে পড়ে যায়। এই যে এখন আমের মুকুল এসেছে। কিছু ঝরে নষ্ট হয়ে যায়। কিছু টিকে থাকে। এরপরে যখন একটু বড় হয়ে ওঠে, তুফান আসলে কিছু পড়ে যায়। মানুষের জীবনটাও এরকম। শিশুরাও এরকম ঝরে যায়। একটা স্তরে গিয়ে আমটা বড় হয়। তখন চাইলে কেউ কাঁচাও খেতে পারে। কিন্তু পাকার পরেই সাধারণত খায়। ওই পাকাটাই ইউনিভার্সিটি লেভেল। আর কাঁচা থাকা একটু বড় হওয়া সেটা হল এই বর্তমান লেভেলটা। এ স্তরেও ফলটা উপকারী হয়, যদি ফলটা খুব বেশি টক না হয়। মানুষ ওটা কাঁচাও খেতে পারে। আর যদি ফলটা ঠিকমত পাকতে পারে, তাহলে সে সবাইকে খুশি করে। মানুষের জীবনটাও এরকম। এভাবেই একটা স্তর থেকে আরেকটা স্তর তাকে অতিক্রম করতে হয়। আমাদের শরীয়তেও ঠিক একই অবস্থা। আমরা যে আল্লাহর বান্দা, আমরা যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত, সেখানেও মানুষকে এভাবেই একটার পর একটা স্তরে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমি আপনি যখন ছোট ছিলাম, তখন ছিলাম দায়-দায়িত্বমুক্ত। অন্যের কাঁধে আমাদের সব দায়-দায়িত্ব। তখন নির্দেশ- মা-বাবাসহ অন্যান্য যারা আছে তারা খাইয়ে দিতে হবে, অন্যান্য সবকিছু সাফ করতে হবে। বদলিয়ে দিতে হবে। গোসল করিয়ে দিতে হবে। সব অন্যের কাজ।
আরেকটু বড় যখন হয়, যখন অবুঝ থাকে, কিন্তু দৌড়ঝাঁপ দেয়, পাঁচ-সাত-নয় বছর তখনও অন্যদের দায়িত্ব। কিন্তু যখন বুঝ হয়ে ওঠে, দশ -বার বছর হয়ে গেছে তখন একটা নির্দেশ শরীয়তের পক্ষ হতে আসে। হাঁ, নামায পড়া শুরু করো। আল্লাহকে চেনা এবং বুঝা শুরু করো। আর যখন শাবাবের বয়স আসে তখন সে একটা স্পেশাল স্তরে পদার্পণ করে। শাবাব মানে যৌবনের বয়স। পনের-ষোল-সতের থেকে যৌবনের বয়স। কিছু নতুন নতুন শব্দ আছে। তরুণ, তারুণ্য একটা শব্দ আছে, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশেও তারুণ্য থাকে অনেকের। বলে আমি তরুণ। হাঁ, তারুণ্য মরণ পর্যন্ত থাকা ভালো। কাজের দিক থেকে। কিন্তু তরুণ অর্থ যদি হয় তুমি যাচ্ছেতাই করবে, সে সুযোগ শরীয়ত রেখেছে বুঝ-বুদ্ধি হওয়ার আগ পর্যন্ত। যখন বুঝ হয়ে যাবে তখন যৌবনের বয়স শুরু হল। ইসলামের ভাষায় এটাকে ‘শাবাব’ বলা হয়। শাবাব মানে যৌবন। এ যুবক বয়সে যখন মানুষ উপনীত হয়, তখন যেভাবে তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, দাড়ি-মোচ গজায়, আরো অনেক বিষয়ে পরিবর্তন আসে, নতুন নতুন চিন্তা আসে, সেভাবে তার দায়-দায়িত্বের মধ্যেও নতুনত্ব আসে।
পড়াশোনার চর্চাও অনেকটা এরকম। পড়াশোনার স্তর ঠিক এখন মাধ্যমিক স্তর অতিক্রমের পরে উচ্চস্তর। দু’বছর পর উচ্চমাধ্যমিকে গেলেই জীবনের একটা বিষয়কে বাছাই করে নেওয়া লাগে। আমাদের এভাবে একত্রিত হওয়া এভাবে বসার উদ্দেশ্যটা হল সবাই সবাইকে বুঝা। সবাই সবার কাছে আসা। কাছাকাছি হয়ে যাওয়া। মুসলমান বলতেই একগোষ্ঠী। এক গোষ্ঠী না? সবার বাবার নাম কী? আদম। আদম আলাইহিস সালাম থেকেই তো আমার আপনার সবার গোষ্ঠী এসেছে। সবার মা? হাওয়া আলাইহাস সালাম। এটা একটা মিল। দ্বিতীয় মিল হল, আমাদের সকলের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
তাহলে আমি মাদরাসায় পড়ি আর কলেজে পড়ি বা লেখাপড়া নাই করি, শিল্প কারখানায় চাকরি করি, কৃষি কাজ করি, যেটাই করি- আমি মুসলিম। এখানে আমরা ঐক্যবদ্ধ; এটি সবার একটা যোগসূত্র। সবাই এক হয়ে যাওয়ার একটা জায়গা। এক হয়ে যাওয়া মানে শুধু শব্দে এক হওয়া নয়; বরং যে যোগসূত্র দিয়ে আমি আপনি মিলে আছি সেগুলোর দিক থেকে এক হওয়া। সে যোগসূত্রগুলোর চাহিদা কী? যেমন আমরা সবাই একটা কালিমা পড়ি, লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। আমার আপনার কালিমার মাঝে কি কোনো বেশকম আছে? না। সবার কালিমা এক, অভিন্ন। টাকা পয়সা যখন হয়, তো হজে¦ যায়। হজে¦ যেতে জেনারেল শিক্ষিত, স্কুলপড়ুয়া, জমিদার লোক আর মাদরাসার লোকের কি ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম আছে, না এক নিয়ম? এক নিয়মে জুমার দিন আমরা মসজিদে যাই নামায পড়তে, নামাযের মধ্যে কোনো ভিন্ন নিয়ম আছে? নেই। আচ্ছা, অফিসে তো বস এক চেয়ারে বসে, আর তার কর্মচারী একটা সাধারণ চেয়ারে বসে। কিন্তু নামাযে? বস আর কর্মচারীর কি ভিন্ন ভিন্ন জায়গা আছে? নেই। আল্লার দরবারে সবাই সমান।
ইসলাম মানুষকে এগুলোই শেখায়। সাম্য, সৌন্দর্য এবং শান্তিপূর্ণ মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান। তুমি জীবনের যে স্তরেই থাক, যে পেশাই তুমি অবলম্বন কর, সবাই সবাইকে সম্মান করবে। সকলেই সকলের ইজ্জত বুঝবে, মূল্যায়ন করবে এবং সবাই কাছাকাছি থাকবে। অবস্থানগত দিক থেকে নিকটে না থাকলেও মনের দিক থেকে কাছাকাছি থাকবে। সবাই যখন মনের দিক থেকে কাছাকাছি থাকবে তো একে অপরের থেকে উপকার নেওয়ার সুযোগ হবে।
আপনি এখন মেট্রিক পড়েছেন, সামনে আরো পড়বেন। আল্লাহ তাআলা নিলে আরো বেশি পড়বেন। আপনি একসময় হয়ত ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাবেন, মাদরাসার লোক আপনার কাছে যাবে। আমি একটি বিল্ডিং বানাব, মসজিদ বানাব, আপনি মসজিদটার একটু ডিজাইন করে দিন, এটা দ্বীনের কাজ। মাদরাসা-মসজিদের উপকারে আসলেন কি আসলেন না? আসলেন।
এই যে, মসজিদ বানাতে যিনি টাকা দিলেন, মসজিদে যিনি ইমামতি করবেন, মসজিদে যিনি আযান দিবেন, তারা যেমন সওয়াব পাবেন যিনি এই মসজিদের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করবেন তিনি সওয়াব পাবেন না? নিশ্চয়ই পাবেন। শুধু উদ্দেশ্যটা ভালো হতে হবে। উদ্দেশ্যটা ভালো হতে হবে যে, আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, মানুষের সেবা করার জন্য। মানুষ যেন ভুল বিল্ডিং বানিয়ে অর্থ নষ্ট না করে, ভেংগে না পড়ে। মানুষের যেন টাকা নষ্ট না হয়, ক্ষতি না হয়- এ মানসিকতা থাকতে হবে।
আমি চিকিৎসা বিষয়ে পড়তে চাচ্ছি, এখন তো এসব বিষয়ে পড়ার কথা বেশি বলে না। আগে ছেলেরা বলত, আমি ইঞ্জিনিয়ার হব, আমি ডাক্তার হব, এখন আর এগুলো বলে না। এখন বলে, আমি এমবিএ করব। বিবিএ করব। তাহলে একটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়ে যাবে। হোক! এমবিএ, বিবিএ করলেও সমস্যা না। এমবিএ করল, কোনো প্রতিষ্ঠানের এইচআর সেকশনে সে যোগ দিল, ওই প্রতিষ্ঠান হয়ত কোনো সেবা দেবে, না হয় কোনো প্রোডাক্ট তৈরি করবে, সে পণ্য দিয়ে মানুষ উপকার পাবে। সে সেবা দিয়ে মানুষ উপকার পাবে। যদি ওটা নাজায়েয কিছু না হয়, তার উদ্দেশ্য যদি ভালো থাকে তো সওয়াব পাবে।
এখন আমি যদি আলেমদের কাছাকাছি না যাই তাহলে তো আমি এ বিষয়টা জানতে পারব না। সারা জীবন কাজ করে গেলাম শুধু দুনিয়ার ক’টা পয়সা পেলাম। শুধু বেতন পেলাম, কিন্তু এটা যে আখেরাতেও কাজ দিতে পারে তা জানলাম না। সৎ উদ্দেশ্য কীভাবে হবে তাও হাসিল করতে পারলাম না।
আর যদি আমরা পরস্পর কাছাকাছি থাকি, তাহলে আপনার ভালোটা আমি বুঝব, আমার ভালোটা আপনি বুঝবেন। এজন্য মুসলমান হিসেবে সবাই কাছাকাছি আসা- এটা আমাদের দাওয়াত। আমরা এটা বলতে চাই সবাইকে।
এ কাছাকাছি আসার যে দাওয়াতটা দিচ্ছি, আমি গতবারও মেট্রিকের ছেলেদের বলেছিলাম, এটা বলতে হচ্ছে সময়ের প্রয়োজনে। আসলে যদি যথাযথ পদ্ধতি থাকত তাহলে এটা বলার দরকার ছিল না। আমাদের এখানে শিক্ষাপদ্ধতির যে বৈষম্য; শিক্ষাপদ্ধতিতে যে সিলেবাস রাখা হয়েছে তা কোনোক্রমেই যুক্তিসংগত সিলেবাস না। বিশেষত একটা সময় ছিল -আপনারা ইতিহাসে পড়েছেন- এখানে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ছিল। বৃটিশদের শাসন ছিল দু’শ বছরেরও বেশি। তখন তারা তাদের নিয়মের শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেছে। এরপরে দেশ দু’ দু’ বার স্বাধীন হয়েছে। একবার পাকিস্তান হয়েছে, আবার পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার যে পদ্ধতি রাখা হয়েছে, তাতে আমাদের একটা ছেলে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়ে ফেলে, কিন্তু এমন ব্যবস্থা রাখা হয়নি যে, সে অন্তত আল্লাহ্ নাম শুদ্ধভাবে ভালো করে পড়তে পারে। ধর্মীয় শিক্ষার নামে দু’-একটা বই আছে। কোনো রকম পরীক্ষা দেওয়া হয়ে যায়। এমন কোনো পদ্ধতি রাখা হয়নি, যে পদ্ধতি থেকে সে জানতে পারে যে, একজন মুসলমান হিসেবে তার দিনটা কীভাবে শুরু হবে। এমন পদ্ধতি নেই, যেখান থেকে সে জানবে যে, বেচা-কেনা করতে গেলে সেখানে কোন্টা শুদ্ধ কোন্টা অশুদ্ধ?
সে যখন বাবার সাথে কৃষিকাজে সহায়তা করতে যাবে, সেখানে কোন্টা শুদ্ধ, কোন্টা অশুদ্ধ? সে যখন খাবার কিনবে ওই খাবারের মধ্যে কোন্টা শুদ্ধ, কোনটা অশুদ্ধ; কোনটা হালাল, কোনটা হারাম? সবচেয়ে বড় যে বিষয়, সে যখন তার পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন; বন্ধু-বান্ধবের সাথে তার জীবন যাপন করবে, তখন সেখানে তার কোন্টা করা উচিত, কোন্টা উচিত নয়- এটি সে জানতে পারছে না।
আপনি বলতে পারেন যে, ছেলে তো শিক্ষিতই হচ্ছে, এগুলো না জানলে কী হবে? শিক্ষা-দীক্ষা তো সে হাসিল করছে। বরং মডার্ন শিক্ষা-দীক্ষা হাসিল করছে। যে শিক্ষা দিয়ে আজকের পৃথিবী উন্নতি করে যাচ্ছে, সে শিক্ষাই তো সে হাসিল করছে। অবশ্যই হাঁ, সে শিক্ষিত হচ্ছে। তার বুদ্ধি হচ্ছে। জ্ঞান হচ্ছে। এ শিক্ষা জীবনে কাজ দিবে। সবকিছুই ঠিক; কিন্তু এ শিক্ষাটা যথাযথ উপকারে আসার জন্য এবং শিক্ষাটাকে ভালোভাবে দ্বিগুণ, বহুগুণে কাজে লাগাবার জন্য এ জিনিসগুলো যদি সাথে যোগ হত তাহলে শিক্ষা আরো অনেক বেশি ফলপ্রসূ হত। শিক্ষা বেশি কাজ না করার কারণ এটাই।
আমরা দুআ করি, সামনে আপনাদের লেখাপড়ার সময় পার হবে, আরো বড় হবেন, আরো ভালো পড়বেন এবং ভবিষ্যতে ভালো অফিসার হবেন, সৎ অফিসার হবেন, ভালো ব্যবসায়ী হবেন, সৎ ব্যবসায়ী হবেন, দেশ-বিদেশে যেখানেই চাকরি করবেন, নিজেদের নাম, মা-বাবার নাম, দেশের নাম উজ্জ্বল হবে এবং আখেরাতেও এটার দ্বারা যেন ফায়দা হয় এটাই আমাদের কামনা।
আমরা তা-ই চাই। আপনাদের ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের ভালো আশা। শিক্ষা দিয়ে মানুষ ভালো হতে পারে, ভালো হয়, কিন্তু তারপরও শিক্ষিত লোকদের কারণে বড় সমস্যাগুলো হচ্ছে কেন? দেশের মধ্যে একটা সংস্থা আছে। যদিও তার নামে অনেক বদনামও আছে। তারপরও দেখুন এ দুদক- দুর্নীতি দমন কমিশন এ পর্যন্ত যাদেরকে ধরেছে, কোনো অশিক্ষিত লোক ধরেছে? না। কোনো কৃষক, শ্রমিক ধরেছে? না! সবাই উচ্চশিক্ষিত। ভালো ভালো শিক্ষিত! তাহলে আপনি কি বলবেন, শিক্ষার দোষ? না। শিক্ষার দোষ নয়। শিক্ষার কমতি। শিক্ষা ছিল কিন্তু সেই শিক্ষার সাথে আরো কিছু জিনিস থাকা দরকার ছিল। ওই যে রেসিপিতে সমস্যা; রেসিপিতে যা যা উপাদান দেওয়ার দরকার ছিল, উপাদান সবগুলো দেওয়া হয়নি। উপাদান কিছু কম থাকার কারণে গোস্ত রান্না করেছে বটে, কিন্তু লবণ কম দেয়ায় ওটা পানসে পানসে থেকে গেছে। নাইলে লবণ বেশি হয়ে গেছে। দামী জিনিস কিন্তু খাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা হাসিল করেছে ঠিক কিন্তু সেই শিক্ষার সাথে তার আরো কিছু শিক্ষার দরকার ছিল। এ শিক্ষাটা কার্যকর হওয়ার জন্যে, এ শিক্ষাটা তাকে বেশির চে’ বেশি উপকার দেয়ার জন্যে তার আরো কিছুর দরকার ছিল। কিন্তু সেটা সে পায়নি। সিস্টেমের কারণে পায়নি।
আমাদের সমস্যাটা হল, -আপনারা বড় হলে আরো জানবেন, যখন নিজেরাই অনার্স, মাস্টার্স করবেন তখন নিজেরাও ভালো বুঝবেন- শিক্ষার জন্য যে সিলেবাস তৈরি হয়, তার জন্য অনেক খাটুনি হয়। দেশের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিদেশে গিয়ে -অনেক দেশেই যায়- ধারণা এনে তারপরে এখানে শিক্ষানীতি তৈরি হয়। সিলেবাস তৈরি হয়। কিন্তু আসলে শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য তো শুধু বিদেশ দেখলে হবে না। প্রত্যেক জাতি এবং প্রত্যেক দেশের নিজস্ব কৃষ্টিকালচার আছে। যেমন, এখানে আপনারা এসেছেন অনেকের বাপ-চাচা সাথে আছে। আপনার বয়সের কেউ ধরুন ২০-২১ বছর হয়ে গেলে যে সব রাষ্ট্রকে আমরা উন্নত রাষ্ট্র বলি, সেখানে বাবা মা’র সাথে সন্তানদের দেখা হয় না। তারাও উচ্চশিক্ষিত। তারপর? গত বছর পড়েছিলাম বিদেশী একটি পত্রিকায়। এখন আমেরিকাতে মেডিকেলে লাশ দিয়ে দেওয়ার পরিমাণ অনেক হারে বেড়েছে। জীবনের শেষের কথা বলছি। মানুষ তো ছোট বড় সব বয়সেই মরে। বেশিরভাগই বয়স হলে মরে। সেখানে মেডিকেলে লাশ দিয়ে দেওয়া অনেক হারে বেড়েছে। কেউ যদি এ সংবাদের শুধু শিরোনাম পড়ে এবং যদি সে মডার্ন ব্যক্তি হয়, বলবে যে, এ তো ভালো। তারা রিসার্চের জন্য অবদান রাখছে। কিন্তু আপনি যদি খবরের ভেতরের অংশ পড়েন, তো আপনার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে। ভেতরে লেখা আছে, কারণ হল, ওখানে সৎকার করতে যত টাকা খরচ হয়, ছেলেমেয়েরা মা-বাবার জন্য অত টাকা খরচ করতে চায় না। পাঁচ হাজার ডলার, দশ হাজার ডলার খরচ হয়ে যাবে তা তারা মেনে নিতে পারে না। এখানে যে রকম দাফন করতে অল্প টাকা খরচ হয়, এত অল্প টাকায় ওখানে পারে না। কয়েক হাজার ডলার খচর হয় সৎকারের জন্যে। আমাদের ভাষায় দাফন করার জন্যে। ছেলে-মেয়ে তো মৃত্যুর আগে এমনিতেই বয়স্ক মা বাবার কাছে ধারে থাকে না। কোথায় থাকে? মা-বাবারা তো যখন চাকরির বয়স শেষ হয়ে যায় বেশিরভাগ সময়ই নার্সিং হোমে বা ওল্ড কেয়ার হোমে থাকে। বয়স্কদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে থাকে। আর ছেলেমেয়ে বিভিন্ন জাগায় যে যার মত থাকে, চাকরি-বাকরি করে। দু’-এক সময় হসপিটালে এসে দেখে যায়। তারপর যখন মৃত্যু হয়, তাকে হয়ত জানানো হয় ফোনের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে, তোমার বাবা মারা গেছেন। ওরা বলে যে, মেডিকেলে দিয়ে দাও! কেউ কেউ আসে। এসে লাশ নিয়ে সৎকার করে। আবার কেউ কেউ বলে যে, আমি টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি ব্যাংকে, তোমরা সৎকার করিয়ে দাও!
এরা কিন্তু শিক্ষিত জাতি! এবং উন্নত জাতি!! আপনি হয়ত বলবেন, আমাদের জওয়ানদের তো অসুবিধা নেই। বুড়োদের সাথেই না এ আচরণ করা হয়। তাহলে কি এ জওয়ানগুলো বুড়ো হবে না? একসময় তাদের ছেলেমেয়ে হবে না? তারা বুড়ো হবে না? এখন তারা তাদের মা-বাবার সাথে যে আচরণ করছে, তাদের সাথে তখন সে আচরণ হবে না?
শিক্ষা আছে, তবে শিক্ষার মধ্যে কমতি আছে। শিক্ষাতে কিছু কিছু জিনিস যদি যোগ করা হয়, তাহলে এ শিক্ষা বহুগুণ কাজ দেবে।
আমরা চাই মুসলমানের সন্তানেরা শিক্ষিত হোক। শিক্ষিত সমাজ হোক। এটা একটা লম্বা বিষয়। আমি শুধু সংক্ষেপে বলছি যে, কাছাকাছি চলে আসা। শিক্ষার মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়া হল, কিছু জিনিস বাকি রয়ে গেল, সেগুলো যেহেতু আমাদের স্কুলে পড়া হয়নি, সামনেও হয়ত আর পড়া হবে না। সেগুলো আমাদের শিখতে হবে তাই শিখব। আলেমদের কাছাকাছি যাব। আল্লাহর কুরআন শিখতে চেষ্টা করব। আমাদের সামাজিক জীবনটা কেমন হওয়া চাই তা শিখতে চেষ্টা করব। আমাদের জীবনটা যেন অর্থবহ হয়। যেন আমরা পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে সুন্দর হয়ে থাকতে পারি। কেউ যেন এরকম না হয় যে, আমাকে আমার পাওয়ারের কারণে ভয় করছে। ক্ষমতাবান লোকেরা কেউ গ্রামে থাকে, কেউ শহরে থাকে। যেখানের ক্ষমতাই বলেন, এদের মধ্যে দু’ধরনের লোক দেখবেন, সবাইকে মানুষ ভয় করে। কিন্তু কাউকে ভয় করে ইজ্জত সম্মান করে আর কাউকে ভয় করে মানে হল তাকে বাঘের মত ভয় করে। দেখলে পালায়। এ আমাকে মারবে- এ কারণে ভয় করে। আরেকজনকে তাঁর মর্যাদার কারণে ভয় করে। আমরা এমনভাবে জীবনটাকে গড়ব, যেন আমার শিক্ষা, আমার ক্ষমতা, আমার পাওয়ার, আমার চলা-ফেরা সব দেখে সমাজের সবাই জানে, এ ছেলেটা সৎ ও ভালো। ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি, এ কারো সাথে ঝগড়া করে না। এ মানুষকে দেখলে সালাম দেয়। এ মুরুব্বীদেরকে ইজ্জত করে চলে। এ মারামারি করে না। একে কোনো সময়ই কারো জিনিসে বিনা অনুমতিতে হাত দিতে দেখা যায়নি। এ ছেলেটাকে কিন্তু কোনো সময়ই দেখিনি সিগারেট টানতে। এটা যেন মানুষের মুখে মুখে থাকে। যেগুলো স্বীকৃত ভালো কাজ সেগুলো যেন আমরা করি। যেগুলো স্বীকৃত মন্দ সেগুলো থেকে দূরে থাকি। আজকাল তো আরো খারাপ জিনিসের সয়লাব হয়ে গেছে- মাদক। বলা লাগবে না, আপনারা নিজেরাই বোঝেন। গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সেগুলোর তো নামও ধরা যাবে না। ধূমপানের অভ্যাসও যদি কারো থেকে থাকে, আস্তে আস্তে তা থেকে দূরে সরে যাওয়া। নিজের মধ্যে গুনাহের চাপ সৃষ্টি না করা। এভাবে আমরা ভালো কাজগুলো করব। মন্দ কাজগুলো থেকে বাঁচবো এবং কাছাকাছি থাকব।
আপনারা জানেন, এখানে প্রতি মাসের প্রথম সোমবার মাহফিল হয়। আপনাদের জন্য হয়, সেখানে আসার চেষ্টা করব। ওটা ছাড়াও আমাদের যে মাওলানা সাহেবরা এখানে আছেন- ছাত্ররা, তারা আপনাদের বড় ভায়ের মত। এরা গ্রাজুয়েট লেভেল শেষ করে এখানে পড়তে এসেছে। এখন হাদীসের উপর, ফিক্হের উপর, দাওয়াহ্র উপরে হায়ার স্টাডি করছে। উপরের পড়া এরা পড়ছে। তো এরা এখন আপনাদের খেদমতে আছে। এরা সারা বছর আপনাদের খেদমত করতে প্রস্তুত থাকবে। আপনারা আসলে দ্বীনী কথা শিখিয়ে দেওয়া, কুরআন শিখিয়ে দেওয়া, হাদীস শিখিয়ে দেওয়া এবং আপনাদের প্রয়োজনীয় মাশওয়ারা দেওয়া, পরামর্শ দেওয়া- এগুলো আপনারা ইনশাআল্লাহ নিতে পারবেন এখান থেকে। আমি লম্বা করতে চাই না। রাত হয়ে গেছে। এখন এ পর্যন্তই থাক।
( ১৯ জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৯/৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর হযরতপুর প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষা সম্পন্নকারীদের উদ্দেশে প্রদত্ত বয়ান)
















