করোনা প্রাদুর্ভাব : মুমিনের বোধ ও কর্ম

মুহাম্মদ আবদুস সালাম ।।

আজ পুরো বিশ্ব করোনা প্রাদুর্ভাবে কঠিন সময় পার করছে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের পিলে চমকানো খবর আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। মাস তিনেক ধরে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য যেমন চলছে বিশ্বময় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, তেমনি তা নিয়ে সব ঘরানা থেকে ভাবনা, বিশ্লেষণ আর পর্যালোচনাও কম হচ্ছে না। তবে একজন মুমিন উদ্ভূত এই সংকটকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে ? কেমন হবে তার চিন্তা, বিশ্লেষণ আর বোধ ? কি হবে তার করণীয় ও দায়িত্ব ?

এই করোনাকালে ইসলাম তাকে কি তাসাওউর তথা চিন্তাবোধ, শিক্ষা, নির্দেশনা ও সমাধান প্রদান করে ? সর্বোপরি এই প্রেক্ষাপটে বোধ ও কর্মের মধ্য দিয়ে একজন মুমিন ও মুসলিমের কি পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পাবে? সে কথাই ইসলামের শরীয়ত ও শিক্ষার মৌলিক কিছু দিক থেকে দেখার প্রয়াস পাবো।

করোনা প্রসঙ্গ : মুমিনের ঈমান

মুমিনের জীবনে সবকিছুর আগে তার ঈমান, ইসলাম। জীবন ও জগতের সবকিছু কে সে মূল্যায়ন করে ঈমানের নিক্তিতে, ইসলামের মাপকাঠিতে। আর ঈমানেরই অন্যতম রোকন তাকদীরের বিশ্বাস। তাকদীর মানে, সৃষ্টি জগতে যা কিছু ঘটবে তা আল্লাহ পূর্ব থেকেই জানেন। তিনি তা নির্ধারণ করেছেন এবং যথাসময়ে তার হুকুমে তা ঘটবে।

বিপদাপদ, রোগ-মহামারিও তার বাইরে নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

পৃথিবীতে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যেই বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। সূরা হাদীদ, আয়াত, ২২

তিনি আরো ইরশাদ করেন,

হে নবী আপনি বলে দিন, আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্দিষ্ট করেছেন তা ব্যতীত আমাদের অন্য কিছু হবে না। তিনি আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর উপরই মুমিনদের নির্ভর করা উচিত। সূরা তাওবা, আয়াত, ৫১

অতএব একজন মুমিন খুব স্বাভাবিকভাবে মন থেকে এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, করোনা মহামারি আল্লাহর সৃষ্টি এবং একমাত্র তাঁরই করায়ত্তে। চাই তা বিশেষ কোনো কারণ সম্পৃক্ত হোক বা না হোক। আর তা দূর হবে কেবল তখনই যখন ইচ্ছে করবেন মহান আল্লাহ। এই বিশ্বাস অপরিহার্য। বিপরীত বিশ্বাস কুফর ও শিরক।

করোনা প্রসঙ্গে এই যে মুমিনের বিশ্বাস, তা তাকে স্থবির, হতাশ ও কর্মহীন করে দেয় না। বরং তা নানান দিক থেকে জাগিয়ে তোলে তার চিন্তাবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ।  তাকে ঈমানি শক্তির সাথে সচেতন করে তোলে আপন কর্তব্য সম্পর্কে  এবং তাকে সন্ধান দেয় উক্ত সংকট সমাধানের সর্বোৎকৃষ্ট পথ ও পন্থার।

করোনা প্রাদুর্ভাব : মুমিনের চিন্তাবোধ

সাম্প্রতিক এই মহামারিকে মুমিন আর দশ জনের মত ভাবে না। বরং এখানেও রয়েছে তার স্বাতন্ত্র। বিশ্বাসের মত তার চিন্তাবোধও বড় বাস্তবমুখী। তার চোখে এই প্রাদুর্ভাবের একমাত্র কারণ ভাইরাস সংক্রমণ নয়। বরং তার আসল কারণ আল্লাহ তাআলার ইচ্ছে। দ্বিতীয়ত তা আল্লাহর বিধিমতে সংক্রমণ, পাপাচার বা অন্য কোন এক বা একাধিক কারণ সম্পৃক্ত।

তাই এই দুর্যোগে মুমিনের দৃষ্টিতে সর্বাগ্রে আসে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, পূর্ণ ভরসা ও ধৈর্যধারণ। মুমিন হতাশ, হতোদ্যম ও আতঙ্কগ্রস্ত হয় না। হা পিত্যেশ করে না। বরং তাকদীরে সন্তুষ্ট থেকে তাওয়াক্কুলের সাথে শক্ত মনোবল নিয়ে উদ্ভূত সংকটকে কোরআন সুন্নাহর আলোকে উপলব্ধি করে, মূল্যায়ন করে। অতপর সে অনুযায়ী তা থেকে মুক্তির প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। সূরা শূরা, আয়াত, ৩০

তিনি আরো বলেন,  মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে। যেন তিনি তাদেরকে তাদের কোন কোন কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান। যাতে তারা ফিরে আসে। সূরা রুম, আয়াত, ৪১

আবার হাদিসে অশ্লীলতার সয়লাবে ব্যাপক আকারে মহামারি ছড়িয়ে পড়ার কথাও এসেছে। অতীতে আল্লাহ তাআলা কোন কোন জাতির উপর তাদের অবাধ্যতা, অশ্লীলতা ও যুলুমের কারণে আযাব গযব হিসেবে মহামারি অবতীর্ণ করেছেন।

 

তাই এহেন পরিস্থিতিতে মুমিন প্রথমেই নিজের কৃতকর্মের হিসাব নিকাশ ও সব ধরণের পাপ থেকে নিজেকে শুদ্ধ করবার কথা ভাববে এবং এই মহামারি যেন আল্লাহর পরীক্ষা, ক্রোধ ও আযাব না হয় সেই ভয় মনে পোষণ করবে। সাথে সাথে মহামারির প্রেক্ষিতে মুমিনের জন্য হাদিসে যে সুসংবাদ এসেছে তাও হৃদয়ে জাগরুক রাখবে। ভাববে ইনশাআল্লাহ এটি আমার জন্য প্রভুর রহমত, দয়া, ক্ষমা, পাপমোচন ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। আর মৃত্যুবরণ করলে শহীদের মর্যাদা লাভের উপায়।

করোনা প্রতিরোধে মুমিনের প্রথম করনীয়

করোনা প্রতিরোধে মুমিনের কর্মপন্থা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা থেকে শুরু হয় না। বরং তারও আগে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি ধাপ। যা মুমিনের ঈমান ও ঈমানি বোধের অপরিহার্য দাবি। আর তা হচ্ছে, এই মহামারি যার সৃষ্টি ও যার করায়ত্তে তার দিকে মনোনিবেশ করা এবং এই সংকটের যে নেপথ্য কারণ রয়েছে তা থেকে অবমুক্তির চেষ্টা করা।

যেহেতু পাপ, অন্যায়, অশ্লীলতা, ফাসাদ ও যুলুমের কারণে এসব মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে তাই সর্বপ্রথম কর্তব্য হল, নিজেকে অন্যায় অশ্লীলতা ও যুলুম ইত্যাদি থেকে ছাড়িয়ে নেয়া। আল্লাহ তাআলার যত ধরনের অবাধ্যতা হতে পারে সবকিছু থেকে নিজেকে শুদ্ধ করে নেয়ার চেষ্টা করা। তিনি ইরশাদ করেন,

আল্লাহ তাদের শাস্তি দানকারী নন যখন নাকি তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে। সূরা আনফাল, আয়াত, ৩৩

তিনি আরো ইরশাদ করেন, অতপর যখন তাদের উপর আমার আযাব আসলো তখন কেন তারা কাকুতি-মিনতি করলো না। সূরা আনআম, আয়াত, ৪৩

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তুমি আল্লাহকে  তার সকল বিধি বিষয়ে- হেফাযত করো তাহলে তিনি তোমাকে হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহকে -তার সকল বিধি বিষয়ে- হেফাযত করো তাহলে তাকে তোমার সামনে পাবে। সুনানে তিরমিযী, হাদিস, ২৫১৬

সুতরাং মুমিন এই করুণ পরিস্থিতিতে প্রথমে নিজেকে সকল প্রকার অন্যায় ও অবাধ্যতা থেকে ফিরিয়ে আনবে। তাওবা ইস্তেগফার করবে এবং অনুনয় বিনয়ের সাথে আল্লাহর নিকট এই কঠিন বিপদ থেকে আশ্রয় চাইবে। তা উঠিয়ে নেয়ার প্রার্থনা করবে। সাথে সাথে তাকওয়া ও তাকওয়ার সকল দাবি অনুযায়ী নিজেকে পরিশুদ্ধ করবার সংকল্প নিয়ে চেষ্টা করে যাবে। নীতি-নৈতিকতা ও আখলাক বিষয়ে সতর্ক হবে। হুকূকুল্লাহ ও হুকূকুল ইবাদ সম্পর্কে সচেতন হবে। নামায রোযা সহ সকল ফরয ওয়াজিব ও সুন্নত ইবাদতের প্রতি পাবন্দি বাড়িয়ে দেবে। সর্বপ্রকার নফল ইবাদত, তেলাওয়াত, যিকির, দরূদ  ও মাসনূন দোয়ার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেবে। সব ধরনের  নেক আমল বাড়িয়ে দেবে। উদ্ভূত এই ভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য বেশি বেশি মোনাজাত করবে। রোগ ও বিপদ  থেকে মুক্তি সম্পর্কিত দোয়াগুলো বারবার পড়তে থাকবে এবং দান সদকা বাড়িয়ে দেবে। এটা বিপদমুক্তির এক মহা উপায়।

করোনা প্রতিরোধে মুমিনের পদক্ষেপ

একজন মুমিন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, ইসলামে রয়েছে মানবের পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। রোগবালাই ও মহামারির প্রতিকার ব্যবস্থাও তার বাইরে নয়। ইসলাম এই সংকটকালে মুমিনকে তাওয়াক্কুল, সবর, তাওবা ইস্তেগফার ও দোয়ার সাথে সাথে তার প্রতিষেধক ও প্রতিকারের উপায় উপকরণ গ্রহণ করবার আদেশ করেছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

আল্লাহ যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন তেমনি তার ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। মুসনাদে আহমদ, হাদিস,১২৫৯৬

করোনার মত সংক্রামক ভাইরাস ও মহামারির এই দুঃসময়ে প্রতিকারমূলক যেসব মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য তার সুস্পষ্ট বিবরণ সুন্নাহ ও ইসলামি জ্ঞান সম্ভারে বিবৃত হয়েছে। রোগবালাই থেকে নিরাপদ থাকবার জন্য ইসলাম গোড়া থেকেই পর্যাপ্ত শিক্ষা, নির্দেশনা ও সতর্কতা প্রদান করেছে। স্বাস্থ্য সচেতনতার জোর তাগিদ করেছে। ইরশাদ হয়েছে, তোমার উপর তোমার শরীরের হক রয়েছে। সহিহ বুখারি, হাদিস, ৪৯০৩

এমনকি ইসলাম তো জীবন রক্ষা কে শরীয়তের একটি মৌলিক লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছে এবং সেই স্বার্থে কখনো কখনো অনেক অবৈধ বিষয়কে বৈধও ঘোষণা করেছে।

শুরু থেকেই যেন রোগ স্পর্শ না করে সেই প্রতিরোধব্যবস্থায় ইসলামের নির্দেশনা বড় অনন্য। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা, জীবনাচার, পানাহার সামগ্রী ও আহার বিহারের সংযমিতা সহ যাপিত জীবনের ইসলামি আদব-শিষ্টাচারে এমন অনেক অনেক শিক্ষা বর্ণিত হয়েছে যা সুস্থ ও সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলামের শিক্ষা থেকে একথা স্পষ্ট যে, সতর্কতাই মহৌষধ এবং রোগমুক্তির মূল।

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও নানানভাবে বলে গেছেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই যেমন কালোজিরা, মধুপান ও শিঙ্গা লাগানো ইত্যাদির কথা।

আর যখন রোগাক্রান্ত হয়ে যাবে তখন অবহেলা না করে চিকিৎসা গ্রহণের আদেশ করেছে ইসলাম। প্রিয় নবীজি যেমন নানান প্রকার রোগের সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বাতলে দিয়েছেন, তেমনি সংক্রামক মহামারির প্রতিকারমূলক মৌলিক পদক্ষেপের কথাও বলে গেছেন। তিনি বলেন,

যখন তোমরা জানতে পারবে যে, কোন এলাকায় তাউন -এক প্রকারের মহামারি- বিরাজ করছে তখন তোমরা সেখানে যাবে না। আর তোমাদের অবস্থিত এলাকায় তা আপতিত হলে তোমরা সেখান থেকে পলায়নের নিয়তে বের হবে না। সহিহ বুখারি, হাদিস, ৫৭৩০,  সহিহ মুসলিম, হাদিস, ২২১৯

মহামারি যেহেতু সংক্রামক রোগ তাই এ ক্ষেত্রে সর্তকতা ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই মূল এবং যেহেতু তা এক বা একাধিক সমাজ ও অঞ্চলকে ঘিরে বিরাজ করে তাই এক্ষেত্রে সমাজ, পরিবেশ ও এলাকার হক ও সুরক্ষার প্রশ্নটিও এসে যায়। আর এইসব স্বার্থেই আক্রান্ত জায়গা থেকে কাউকে বের হতে এবং বাইর থেকে কাউকে সেখানে ঢুকতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ ইসলামে নিজের বা অন্য কারো ক্ষতি করবার কোনো অবকাশ নেই।

দ্বিতীয়ত পূর্বে নবীজির একটি অমোঘ বাণী উল্লেখিত হয়েছে যে, তিনি বলেন,

আল্লাহ যেমন রোগ সৃষ্টি করেছেন তেমনি তার ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।

এই হাদিস ও চিকিৎসা বিষয়ক ইসলামি শিক্ষার আলোকে একথা স্পষ্ট যে, বর্তমানে এই সংকট উত্তরণে মুসলিম উম্মাহর উপর ফরয ও অপরিহার্য হল, তারা অভূতপূর্ব এই করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং এক্ষেত্রে কোনরকম অবহেলা ফরয লঙ্ঘনের নামান্তর।

তো সারকথা হলো, সংক্রামক মহামারি প্রতিরোধে ইসলাম যেই ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ প্রদান করেছে একজন মুমিন বর্তমান এই সংকটে তা মেনে চলবে এবং শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন যেসব প্রতিষেধক ও প্রতিকার-ব্যবস্থা সরকার ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলগণ পেশ করে তা গ্রহণ করবে। এটা আবশ্যক ও অপরিহার্য। কারণ তা তার নিজের ও অন্যের হক-অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত। যার খেলাফ করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই এবং এক্ষেত্রে কোন প্রকারের বাড়াবাড়ি শিথিলতা ও আবেগ গ্রহণযোগ্য নয়।

করোনা সংকটে মুমিনের সামাজিক দায়িত্ব

মানুষ সমাজবদ্ধ সৃষ্টি। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রয়োজনে কোনো না কোনোভাবে অন্যের সম্পৃক্ততা থেকে যায়। আর সেখান থেকেই প্রতিটি মানুষের উপর আরোপিত হয়ে থাকে অনেক সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। ইসলাম সমাজ  ও সামাজিকতাকে অনেক গুরুত্বের চোখে দেখে। তাই সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গঠন নিশ্চিত করতে প্রদান করেছে সামাজিক অনেক মূলনীতি ও ব্যবস্থাপনা। যার বিস্তারিত বিবরণ কোরআন সুন্নাহয় সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়, আরও আবশ্যক হয়ে পড়ে। এই যেমন বর্তমান প্রেক্ষাপটে। আজ কোভিড ১৯ এর প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুবরণ করছে হাজার হাজার মানুষ। আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ। দেশের পর দেশ লকডাউন। মানুষ সব ঘরবন্দী। জনজীবন বিচ্ছিন্ন ও স্থবির হয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। খেটে খাওয়া দিনমুজুরেরা পড়েছে কঠিন বিপাকে। আর চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা তো আছেই। এই সমূহ সংকটের সময়ে একজন মুমিন সহজেই বুঝতে পারে নানান দিক থেকে তার মানবিক ও ঈমানি দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ার কথা।

এই মুহূর্তে করোনার আঘাতে মৃত্যুবরণকারীর কাফন দাফন সহ তার স্বজনদের সমবেদনা, সহায়তা করা ও পাশে দাঁড়ানো যেমন আবশ্যক, তেমনি আক্রান্ত অসুস্থদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করাও আবশ্যক। আর যারা আক্রান্ত নন তাদেরকে আল্লাহমুখী করা, তাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শিক্ষা দেওয়া এবং তার ব্যাপক প্রচার করাও সময়ের বড় দায়িত্ব। এই মহামারি প্রতিরোধে সরকার, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের প্রেরণা, চিন্তা-গবেষণা, ও অর্থ ইত্যাদির মাধ্যমে সর্ব প্রকার সহযোগিতা করাও একটি স্বাভাবিক কর্তব্য। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত সব মিডিয়া প্লাটফর্মের মাধ্যমে করোনার গুজবমুক্ত সঠিক খবরা-খবর, বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন, এ সংক্রান্ত ইসলামের শিক্ষা, ইতিহাস এবং ঈমানি বোধ ও দায়িত্ব প্রচার করে মানুষের মাঝে সঠিক মানস ও মূল্যবোধ তৈরি করাও কর্তব্যের অংশ।

আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে নব উদ্ভূত শরঈ মাসায়েলের ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি না করে বরং তা নিজ দেশের ফকীহ ও আলেমদের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়াই ইসলামের নীতি ও শিক্ষা।

পরিবার, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব ও সাধারণ্যের খোঁজ খবর রাখা সব সময়ই একটি সাধারণ দায়িত্ব। তবে সংকটাপন্ন এই সময়ে তার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। তাই সবার খোঁজ খবর নেওয়া ও প্রয়োজন অনুপাতে তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও ঈমানী দায়িত্ব।

অঘোষিত লকডাউনে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের লোকেরা অভাবের কঠিন কষাঘাতের শিকার হয়ে পড়েছে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে ব্যক্তি, সমাজ, সংগঠন, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক তাদের পাশে দাঁড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। হাদিয়া ও সাধারণ দানের সাথে সাথে অগ্রিম যাকাত প্রদানের মাধ্যমেও এই মুহূর্তে এগিয়ে আসা কাম্য।

আরেকটি প্রসঙ্গ হল, বর্তমানে যেহেতু কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং পরিবারের অভিভাবক পিতা-মাতা ও সন্তান সহ সবাই এক সাথে দিনযাপন করছে তাই অভিভাবকদের জন্য সন্তানের শিক্ষা দীক্ষা ও নৈতিক উন্নতির খোঁজ খবর নেয়া ও সে ব্যাপারে সচেষ্ট হওয়ার এটি একটি মোক্ষম সময়। আর স্বামী-স্ত্রীর একের অপরের হকের বিষয়ে সচেতন হওয়ারও এটি একটি সুযোগ।

কর্মহীন এই অবসর যেন অলসতা বা কোন ধরনের পাপের মধ্যে ব্যয় না হয় সেদিকে খেয়াল রাখাও অপরিহার্য।

বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ ঘরবন্দী হয়ে পড়লেও ভার্চুয়াল জগতে তারা আবদ্ধ নন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মীয় নসিহত মূলক বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সময়ের দাবি ও প্রয়োজন। আরব ও ইউরোপ বিশ্বে যা অনেকটা স্বাভাবিক ভাবেই চালু রয়েছে।

সর্বোপরি এই কঠিন মুহূর্তে সবাইকে রাজনৈতিক অরাজনৈতিক ও মতাদর্শিক সব ধরনের   ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে একসাথে কাজ করতে হবে। আল্লাহমুখী হওয়ার সাথে সাথে সব ধরনের উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

শেষ কথা

মহামারি প্রাদুর্ভাবের ইতিহাস অনেক পুরনো। প্রাক ইসলাম যুগে কোন কোন জাতির উপর তাদের পাপের কারণে এটি আযাব হিসেবে নেমে এসেছিল। আর নববী যুগেও এর বিস্তার ঘটে। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিপদকালে একজন মুমিনের বোধ বিশ্বাস ও মূল্যায়ন কেমন হবে এবং তার কর্ম ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা কি হবে তা স্থির করে গেছেন। তারপর এই মহামারি সাহাবী  যুগে আবারও ছড়িয়ে পড়ে। আর তখন আক্রান্ত অঞ্চল ও তার বাইরে থাকা সাহাবীগণ আপন আপন ক্ষেত্রে ঈমানি বিশ্বাস, চেতনা ও কর্মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নববী শিক্ষা ও নির্দেশনার আদর্শ ও অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ইতিহাসের এই পাঠত্রয়ে রয়েছে আমাদের জন্য এই করোনাকালে অনেক অনেক শিক্ষা। ইতিহাস সামনে এগিয়ে যাওয়ার ও  উদ্ভূত সংকট সমাধানের অন্যতম সোপান।

আজ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির স্বর্ণশিখরে বিরাজমান পৃথিবী অতিক্ষুদ্র এক অনুজীবের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিশ্বায়নের এই পৃথিবী। তখন বারবার মনে পড়ছে এই সৃষ্টি জগতের মহান স্রষ্টা অধিপতি আল্লাহ তাআলার এক শাশ্বত বাণী, আলা লাহুল খালকু ওয়াল আমর -শোন, সৃষ্টি তার, হুকুমও তার। সূরা আ’রাফ, আয়াত, ৫৪

রাব্বুল আলামিন কে আবারও নতুন করে চিনবার এই সময়ে যদি তাকে চিনতে না পারি। তার মনোনীত দীন ও শরীয়ত মতে চলবার সুযোগ না হয়। জাহান্নামের ভয় ও আখেরাতের স্মরণ অন্তরে না জাগে এবং রাব্বে কারীমের দিকে মনোনিবেশ করতে না পারি তবে আর কবে ? কখন ?

পূর্ববর্তি সংবাদবঙ্গবন্ধুর খুনীর নাতি উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক
পরবর্তি সংবাদস্কার্ফ মাস্কের ভালো বিকল্প : ট্রাম্প