করোনায় সম্ভাব্য খাদ্য সঙ্কট: উত্তরণে আলেম অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ওলিউর রহমান ।।

মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী দেখা দিয়েছে নানাবিধ সঙ্কট। সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট হলো খাদ্যের। উন্নত, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল এবং দরিদ্র পৃথিবীর সকল দেশেই পড়বে এর প্রভাব। তবে কম জিডিপির দেশগুলোতে এ সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্রাকের করা এক জরিপে দেখা গেছে করোনা পরিস্থিতিতে চলমান সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশের ১৪ শতাংশ মানুষের ঘরে খাবার নেই। মহামারীর কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় সামনের দিনগুলিতে বাড়বে এ সঙ্কট।

সাময়িকভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদী হলে বিপাকে পড়বেন এসব মানুষ। বাংলাদেশের একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষের দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস। করোনা সঙ্কটের কারণে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথাও উঠে আসছে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে। ফলে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসলে এর ফলে সৃষ্ট অর্থ এবং খাদ্য সঙ্কটে ভূগতে হবে দীর্ঘদিন।

করোনার কারণে সম্ভাব্য অর্থ এবং খাদ্য সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সরকার এবং জনগণ দুই দিক থেকেই সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন বলে ইসলাম টাইমসকে জানিয়েছেন রাজধানীর বাইতুল উলূম ঢালকানগর মাদরাসার নাযেমে তালিমাত এবং অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মুফতি শাব্বীর আহমদ।

করোনা পরবর্তী সময়ে আমদানি রপ্তানিতে নানা জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করে উৎপাদনে স্বনির্ভরতার প্রতি এখন থেকেই সরকার ও জনগণের মনযোগ আকর্ষণের কথা জানান তিনি।

এর সাথে যুক্ত করে রাজধানীর জামিয়া শারয়িয়্যাহ মালিবাগ মাদরাসার মুহাদ্দিস ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম ইসলাম টাইমসকে বলেন, সরকার কৃষি খাতে প্রনোদনা দিয়ে এ খাতটিকে আরও উৎপাদনমুখী করে তুলতে পারে। উৎপাদনে নির্ভরশীলতা অর্জন করতে পারা চলমান সঙ্কট উত্তরণের প্রধান মাধ্যম।

মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাযি.-এর উদাহরণ দিয়ে বলেন, হযরত উমর রাযি. কৃষিখাতে নির্ভরশীলতা অর্জনের জন্য কৃষকদেরকে প্রনোদনা দিতেন। এ প্রনোদনা হতো কৃষিকাজের জন্য অনুকূল পরিবেশ এবং কৃষকদেরকে জমি, অর্থ ও উপাদান সরবরাহের মাধ্যমে।

পাশাপাশি যারা সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত তাদের সঙ্কটময় এ মুহূর্তে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ এবং সাধারণ জনগণকে মিতব্যায়ীতার পরামর্শ দেন মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম।

এ বিষয়ে মুফতি শাব্বির আহমদ বলেন, স্বাভাবিকভাবেই তো সবার অপব্যয় থেকে বেঁচে থাকা উচিত। সঙ্কট উত্তরণে দেশের সকল বাসিন্দার মিতব্যয়ীতার কোনো বিকল্প হতে পারে না। অপব্যয় থেকে বেঁচে সংযমি হলে আল্লাহ তাআলাও বরবত দিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের উপস্থিত সঙ্কট দূরীকরণে সামর্থবানদের আরও সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া কর্তব্য বলে মনে করেন মুফতি শাব্বীর আহমদ। পাশাপাশি সরকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেছে তার বিতরণে স্বচ্ছতা এবং নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢালকানগর মাদরাসার এ সিনিয়র মুহাদ্দিস।

সঙ্কট উত্তরণে জনগণ খাদ্যপণ্য সঞ্চয় করে রাখবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি আবদুল্লাহ মাসুম বলেন, সঙ্কটকাল উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় এবং আবশ্যিক পরিমাণ খাদ্য সঞ্চয়ে তো কোনো বাধা নেই। তবে মুশকিল হচ্ছে, খাদ্য সঙ্কটের কথা শুনে মানুষ অনুমানের উপর নির্ভর করে পণ্যের মজুদ গড়ে তুলে। ফলে সঙ্কট উত্তরণের জন্য এই সঞ্চয়ই ভয়াবহরকম সঙ্কটের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়। এটা সরাসরি সিন্ডিকেট এবং হাদিসে নিষিদ্ধ মজুদের মধ্যে না পড়লেও প্রকারন্তরে এবং উদ্দেশ্য বিবেচনায় এক প্রকার সিন্ডিকেটই। তাই অনুমানের উপর নির্ভর করে পণ্যের অধিক মজুদ গড়ে তোলার প্রতি নিরুৎসাহিত করা উচিত। যেন একজনের অধিক পণ্য ক্রয়ের কারণে অন্য কেউ বঞ্চিত না হয়। তবে লকডাউন পরিস্থিতি এবং হোম কোয়ারান্টাইনের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য পন্য সঞ্চয়ে কোনো সমস্যা নেই বলে মত দেন রাজধানীর মালিবাগ মাদরাসার এ মুহাদ্দিস।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিখাতকে সচল ও উর্বর রাখা এখন সবচেয়ে জরুরী বলে মনে করেন উভয়জনই।

পূর্ববর্তি সংবাদএলাকাবাসী না আসায় করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়ালেন ইউএনও
পরবর্তি সংবাদদিল্লি এবং পাশ্ববর্তী এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প